ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
বন্যহাতির তাণ্ডব

দুই যুগ ধরে চলছে মানুষ-বন্যহাতির দ্বন্দ্ব

এম. সুরুজ্জামান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর) 
প্রকাশিত: ১৬:১৭, ২ মে ২০২৪
দুই যুগ ধরে চলছে মানুষ-বন্যহাতির দ্বন্দ্ব
গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির পালের তাণ্ডব- ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পোড়াগাঁও ইউপির গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির পাল তাণ্ডব চালিয়ে বসতবাড়ি তছনছ ও বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।

গত এক সপ্তাহ ধরে উপজেলার বাতকুচি টিলাপাড়া গ্রামে ঐ তাণ্ডব চালায়। তাণ্ডব চালিয়ে পাহাড়ের ঢালে বসবাসরত আব্দুল বছির, হাবিবুর রহমান, আব্দুর রেজ্জাক, ছুরতন বেওয়া, রহিমা বেগম, মহির উদ্দিন, হাফিজুর রহমান ও হাবি মিস্ত্রির বসতঘর ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে হারেজ আলী, উমর আলী, রহিম সওদাগর, শামিম মিয়া ও কবির হোসেনসহ বেশ কয়েকজন দরিদ্র কৃষকের পাহাড়ের ঢালে আবাদকৃত বোরো ধানক্ষেত খেয়ে ও পা দিয়ে মাড়িয়ে বিনষ্ট করেছে বন্যহাতির দল। ঘরবাড়ি ও ফসল নষ্ট করায় এসব পরিবার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। 

গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির পাল অব্যাহত তাণ্ডব।ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মহির উদ্দিন বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ৪০-৪৫টি বন্যহাতির পাল দিনের বেলায় মধুটিলা ইকোপার্কের পূর্ব দিকে বাতকুচি এলাকার হুকুমের টিলা নামক গভীর পাহাড়ে অবস্থান করে আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই খাদ্যের সন্ধানে বাতকুচি, সমেশ্চুড়া ও বুরুঙ্গা কালাপানি এলাকার ফসলি জমিতে নেমে এসে হানা দিচ্ছে। এ সময় হাতির পাল বোরো ধানক্ষেত খেয়ে ও পা দিয়ে মাড়িয়ে বিনষ্ট করে। আবার কোনো কোনো সময়ে বসতবাড়িতে রোপিত কলাগাছ, সুপারি গাছ ও নারিকেল গাছসহ সবজি আবাদ খেয়ে সাবাড় করে দিচ্ছে। এমনকি ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িতে স্থাপন করা পানির টিউবওয়েল শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে টেনে হিঁচড়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। 

Advertisement

গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির পালের তাণ্ডব।গ্রামের দরিদ্র কৃষকরা তাদের জানমাল রক্ষা করতে রাত জেগে মশাল জ্বালিয়ে ডাক চিৎকার করে ও পটকা ফুটিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। ক্ষুধার্ত হাতিগুলো কোনো বাধাই এখন আর মানছে না। গত ২৫ এপ্রিল একই এলাকার উমর আলী মিস্ত্রি নামের এক কৃষককে পা দিয়ে পিষে মেরেঝে বন্যহাতি। এরপর থেকে ঐ এলাকায় হাতি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষজন এখন বাড়িঘর ফেলে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে। 

গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির পালের তাণ্ডব।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুল বছির, হাবিবুর রহমান ও আব্দুর রেজ্জাক বলেন, ৪০-৪৫ টির বন্যহাতির দল এখন কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হয়ে একযোগে ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে ঘরবাড়ি ও বোরো ফসলের ক্ষতি করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেউ খোঁজ খবর নিচ্ছে না। বন্যহাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সরকারি ক্ষতিপূরণ কীভাবে পাবে তাও তারা জানেন না।

তারা আরো জানান, এই বন্যহাতিগুলো প্রায় দুই যুগ আগে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। বংশ বিস্তার করে এদের দল দিনদিন বড় হচ্ছে। এরা বাংলাদেশে অবাধে চলাচল করে গারো পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করছে। গ্রামবাসীরা হৈ-হুল্লোড় করে ঢাকঢোল পিটিয়ে শব্দ করে উত্তর দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের দিকে তাড়িয়ে দিলে ভারতীয় বিএসএফ তাদের কাঁটা তারের বেড়া ও গেট বন্ধ করে দেয়। তারা কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলায় বন্যহাতি আর ভারতে প্রবেশ তথা ফেরত যেতে পারছে না। ফলে বন্যহাতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে স্বাধীনভাবে চলাচল করে মাঝে মধ্যেই এলাকার জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করছে। এ নিয়ে প্রায় দুই যুগ ধরে মানুষ আর বন্যহাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। মানুষও মরছে হাতিও মরছে। কিন্তু এর স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না। 

গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির পালের তাণ্ডব।তারা বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের যৌথ বৈঠকের মাধ্যমে বন্যহাতির সমস্যা সমাধান করা দরকার। 

ময়মনসিংহ বন বিভাগের মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যহাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বিশেষ করে কেউ নিহত হলে ৩ লাখ, আহত হলে ১ লাখ ও ফসলের ক্ষতির জন্য ৫০ হাজার টাকা করে সরকার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। তাই বন্যহাতিকে উত্যক্ত না করে সবাই নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করার পরামর্শ দেন তিনি।

নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইলিশায় রিছিল বলেন, গারো পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে আবেদন নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে বন বিভাগের মাধ্যমে সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া হাতির কবল থেকে জানমাল রক্ষার জন্য রাতের বেলায় মশাল জ্বালাতে কেরোসিন তেল বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: শেরপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!