ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

৪৫ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ, দামে খুশি কৃষক

দেলোয়ার হোসেন, জামালপুর
প্রকাশিত: ১৮:২৫, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪
৪৫ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ, দামে খুশি কৃষক
বিলের পতিত জমিতে পানিফলের চাষাবাদ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বিলের পতিত জমিতে পানিফলের চাষাবাদ হয়। উৎপাদন এবং ভালো দাম পেয়ে কৃষকরা খুশি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর আজাদের দাবি জামালপুর জেলার মধ্যে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় এটি একটি ব্যতিক্রমী ফসল। এ বছর এই উপজেলায় ৪৫ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ হয়েছে। এটি একটি লাভজনক ফসল। তাই জমি পতিত না রেখে পানিফল চাষ করে লাভবান হচ্ছে ওই এলাকার কৃষক।

নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি খেতেও অত্যন্ত সুস্বাদু। কাঁচা এবং সিদ্ধ করে দুইভাবেই খাওয়া যায়। পানির ওপর চাষ হয় বলে এই ফলের নাম ‘পানিফল’। একে স্থানীয় ভাষায় সিংড়া বলেও অবিহিত করা হয়।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদের পশ্চিমে অবস্থিত বিলগুলোতে বর্ষাকালে জমিতে যখন কোনো ফসল হয় না তখন সেসব জমিতে পানি ফলের চাষ করে লাভবান হচ্ছে কৃষকরা। অসময়ে যখন তাদের হাতে কোনো অর্থকড়ি থাকে না, তখন এই পানি ফল বিক্রি করে কৃষকরা দৈনন্দিন সংসার চালাতে সক্ষম হচ্ছেন। এবার উৎপাদন এবং দাম ভালো পাওয়াই কৃষকরা খুশি।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা প্রতি বছরই বোরোধান কাটার পর খাল, বিল, ডোবা এবং পতিত জমিতে পানিফল চাষ করেন। এই পানিফল চাষে প্রতি বিঘা জমিতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হলেও উৎপাদন খরচ বাদে প্রতি বিঘাতে লাভ থাকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। স্বল্প পরিশ্রমে অধিক লাভ হওয়ায় পানিফল চাষ দিন দিন জনপ্রিয়তা পেয়েছে এসব এলাকায়।

প্রতিদিন ভোর হতেই পানিতে নেমে পানিফল সংগ্রহ শুরু করেন কৃষকরা। বিল থেকেই কৃষকদের কাছে থেকে পানিফল কিনে নিয়ে যায় স্থানীয় পাইকাররা। পানিফলকে ঘিরে দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের পাশে গড়ে ওঠেছে পানিফল বাজার। এই বাজারে জামালপুরসহ পার্শবর্তী বিভিন্ন জেলার পাইকারদের দেখতে পাওয়া যায়।

পানিফল দেখতে অনেকটা সিঙ্গারার মতোই। তাই স্থানীয়রা এই ফলকে ‘সিঙ্গারা’ নামেই চিনে থাকে। তাছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় এই  পানিফলের বাহারি সব নামও রয়েছে। ওয়াটার কালট্রপ, বাফেলো নাট ইত্যাদি। আবার ইংরাজিতে একে ‘ওয়াটার চেস্টনাট’ ও বলা হয়। পানিফলের বৈজ্ঞানিক নাম ‘ট্রাপা নাটানস’। এ ফল কেবল হাঁটু বা কোমর পানিতেই জন্মায়।

চাষি রেজাউল করিম জানায়, পানিফল চাষে সার-কীটনাশকের তেমন প্রয়োজন হয় না। এর ফলে অন্যান্য ফসলের তুলনায় পানিফল চাষে চাষিদের খরচ অনেকটাই কম। পতিত জলাশয়ে পানিফলের চারা রোপণ করে শুধুমাত্র পরিচর্যা করলেইে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বিভিন্ন পতিত ডোবা, খাল, পুকুরের অল্প পানিতেই পানিফল চাষ করা সম্ভব। যার কারণে এই চাষে উৎসাহ পাচ্ছেন চাষিরা।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকার পানিফল চাষি মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, ১৫ বছর থেকে এই পানি ফল চাষ করে আসছি। এ বছর উৎপাদন ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভালো দাম পাচ্ছি। অভাবের সময়ে এই টাকা আমাদের অনেক উপকারে আসছে।

পানিফল চাষি আলতাব হোসেন বলেন, আমি একজন বড় পানিফল চাষি, দীর্ঘ ৪০ বছর থেকে এই ফল উৎপাদন করে আসছি। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো তিনি ১৫ বিঘা মাটিতে পানিফল চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা উৎপাদন খরচ ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। উৎপাদন ভালো হলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মতো ফল বিক্রি করা যায়। খরচের তুলনায় লাভের পরিমাণ বেশি। তাই পানিফল চাষে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি আরো জানান, পতিত জমিতে যখন কোনো ফসল হয় না ও মাছের চাষও করা সম্ভব হয় না সেসব জমিতে পানি ফলের চাষ করা হয়। এই ফলের চাষ করে সেই টাকা দিয়ে সারা বছর সংসার চালান তিনি।

পৌরসভার ঢালবাড়ীর বাসিন্দা পানিফল চাষি সহির উদ্দিন বিশু বলেন, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এসব জমিতে কস্তুরী জমে থাকে, পানিফল চাষ করলে আর কস্তুরী জমে থাকে না। পরে ইরি ধান রোপণ করা সুবিধা হয়। তাছাড়া এ সময় শ্রমিকদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। তারাও এই কাজে শ্রম দিয়ে দৈনিক ৫শ থেকে ৬শ টাকা মজুরি পায়।  তাদের সংসার ভালো চলে।

পানিফল ব্যবসায়ী নাদু মিয়া জানান, তিনি প্রতিদিন এখান থেকে পানিফল ক্রয় করে জেলার বিভিন্ন স্থানে এই ফল বিক্রি করেন। ৫০ টাকা কেজি পানিফল ক্রয় করে সিদ্ধ করে ৮০ টাকা কেজি বিক্রি করেন। ১ হাজার টাকার পানি ফল ক্রয় করে সিদ্ধ করে বিক্রি করলে ২ হাজার টাকা বিক্রি করা যায়। এই ব্যবসা করে ভালো সংসার চলছে বলে জানান তিনি। বর্তমান প্রতি মণ  পানিফল/সিংড়া ফল  বিক্রি হচ্ছে ১৪শ থেকে ১৬শ টাকা। কিছুদিন আগে ছিল দুই হাজার টাকা মণ।

নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফল কাঁচা এবং সিদ্ধ দুভাবেই খাওয়া যায়। তাছাড়া এই ফলের রুটি বানিয়ে খাওয়া যায়, আটা দিয়ে বিভিন্ন প্রকার সুস্বাদু খাবার তৈরি করা যায়। এই ফলের আটা শুকিয়ে রেখে বছরের অন্যান্য সময় ব্যবহার করা যায়।

এই ফল ত্বকের জন্য খুব উপকারী, এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে কোলেস্টেরল প্রতিরোধে, ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে। এই ফলকে মহৌষধ হিসেবে অবহিত করা যায়। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের খাল বিল জলাশয়ে এই ফলের উৎপাদন হলেও এখন উপজেলার নির্দিষ্ট চার-পাঁচটি বিলেই এই ফলের উৎপাদন হচ্ছে। সরকারি প্রণোদনা এবং ঋণ সহায়তা না থাকায় কৃষি বিভাগ থেকে আর্থিক সুবিধা না পাওয়ায় ধীরে ধীরে কৃষকরা এই ফল চাষাবাদ কমিয়ে দিয়েছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর আজাদ বলেন, এই উপজেলায় এটি একটি ব্যতিক্রমী ফসল অন্যান্য উপজেলায় এই ফসল উৎপাদন খুব বেশি হয় না। এ বছর এই উপজেলায় ৪৫ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ হয়েছে। এটি একটি লাভজনক ফসল। যেসব জমিতে জলাবদ্ধতা লেগে থাকে এবং কোনো ফসল উৎপাদন হয় না সেসব জমিতে এই ফসল উৎপাদন হয়। আমরা কৃষকদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি এবং আশা করছি আগামীতে এই ফলের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: জামালপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!