অতিথিকে পান দিয়ে আপ্যায়ন দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রীতি। প্রাচীনকাল থেকেই পান খাওয়ার অভ্যাস বাংলার সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। পান সাধারণত চুন, সুপারি, কখনো কখনো মশলা বা মিষ্টি উপকরণের সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠান, কিংবা কোনো উৎসবে পান-সুপারি পরিবেশনা একটি প্রচলিত ঐতিহ্য।
‘পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম বন্ধু ভাগ্য হইলোনা’ পান নিয়ে গানটি গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির গভীরতাকে আরো ফুটিয়ে তোলে। বর্তমান যুগে যদিও এর ব্যবহার কমে আসছে, তবে এটি এখনও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
.png)
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জানা যায়, পান চাষের জন্য বন্যামুক্ত, বেলে দো-আঁশ মাটি, আধো আলো আধো ছায়া এবং নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া উপযুক্ত। পানের উৎপাদন খরচ কম ও বহুবর্ষজীবী হওয়ায় পান চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। মাটিরাঙ্গার তবলছড়ি, গোমতী, ও তাইন্দং এলাকায় পান চাষ হয়।
সরেজমিনে তাইন্দং ইউনিয়নে একটি পানের বরজে গিয়ে দেখা যায়, প্রিয় লাল চাকমা নামে এক ব্যক্তি রাজশাহী জাতের পান চাষ করছেন। তিনি পুরো পরিবার নিয়ে এখানে কাজ করেন। প্রতিটা থোকায় থোকায় পান ধরে আছে। তিনি ৮০ শতক জমিতে দুটি পানের বরজ করেন। প্রিয় লাল চাকমার পূর্ব পুরুষরাও পান চাষ করেছিলেন, সে সুবাদে বংশপরম্পরায় তিনিও এর ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। দুটি পানের বরজে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে। পান পাতার অবস্থা ভালো বিধায় ফলন ভালো হবে আশা করা হচ্ছে।
তবে, পানের বরজে প্রবেশের সময় ‘গিলা’ পানির ছিটা নিতে হবে সবাইকে। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এই পানি পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। অপবিত্র অবস্থায় পান বরজে প্রবেশ করা উচিত নয়।
প্রিয় লাল চাকমা জানান, পান চাষে তিনি লাভের হিসাব করেন না। বংশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখতে পান চাষ করেন তিনি। এতেই দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে সংসার। মেয়ে বিয়ে দিয়েছি ও ছেলে লেখাপড়া করছে। পান চাষের পাশাপাশি আলু, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি এসব চাষাবাদ করেন। এসব নিয়েই বেশ ভালোভাবে দিন কেটে যাচ্ছে।
পান বেপারি আলী হোসেন বলেন, সমতলের তুলনায় পাহাড়ের ঢালু অংশে পান চাষ হওয়ায় পানের উৎপাদন বেড়েছে, মানও ভালো। পানের বরজ থেকে আমরা পান ক্রয় করে মাটিরাঙ্গা এনে বিক্রি করি।
নারী শ্রমিক শিল্পী রানী বলেন, আমি পাশের এলাকায় থাকি। এই পানের বরজে কাজ করি। পানের বরজে কাজ করে আনন্দ পাই। দিনপ্রতি ৪-৫শ’ টাকা মজুরি পাই। তা দিয়েই চলে যায় সংসার। আমি নিজেও পান খাই, পানের বরজে কাজ করলে পান কিনে খাইতে হয় না। নষ্ট ও ছেঁড়া পান নিয়ে যাই। সেগুলো বাছাই করে খাওয়া যায়।
মাটিরাঙ্গায় ৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ করা হয়েছে মন্তব্য করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সবুজ আলী বলেন, কৃষক উদ্বুদ্ধ হলে পান চাষ আরো বৃদ্ধি পাবে। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া পান চাষের উপযোগী। পানের পাতায় পাতায় দাম। সঠিক পরিচর্যা করলে কৃষক বেশি লাভবান হবে।
পান চাষের জন্য উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কোনো বীজ বা প্রণোদনা দেওয়া হয় না শুধু পরামর্শ সেবা দেওয়া হয়। পান চাষ বাড়লে নিজেদের পান দিয়েই অত্র উপজেলার পানের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে জানান তিনি।