ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

৮৭ বছর বয়সেও বায়োস্কোপ দেখান সর্বানন্দ মধু

মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল, কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ)
প্রকাশিত: ১৯:৪০, ৭ জানুয়ারি ২০২৫
৮৭ বছর বয়সেও বায়োস্কোপ দেখান সর্বানন্দ মধু
গ্রামীণ মেলায় বায়োস্কোপ দেখান সর্বানন্দ মধু।

কালের গর্ভে হারানো বহু ঐতিহ্যের মধ্যে এক অনন্য নিদর্শন ধরে রেখেছেন সর্বানন্দ মধু। বয়স এখন তার ৮৭ বছর। মানুষের মনে আনন্দ দিতে এই বয়সেও বায়োস্কোপ নিয়ে ছুটে বেড়ান গ্রাম-গঞ্জে।

বরিশাল জেলার আগলঝাড়া উপজেলার বাগদা গ্রামের নীলকান্ত মধুর ছেলে সর্বানন্দ মধু। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বায়োস্কোপ প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে আনন্দ দিয়ে আসছেন তিনি।

গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) থেকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পারকোনা শ্রী শ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রেমের বাৎসরিক মহোৎসব উপলক্ষে বসেছে ৩ দিনব্যাপী গ্রামীণ মেলা। মঙ্গলবার বিকেলে মেলার মাঠে ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গে কথা হয় বায়োস্কোপচালক সর্বানন্দ মধুর। আলাপচারিতায় উঠে আসে বায়োস্কোপ দেখানো নিয়ে নানা গল্প।

Advertisement

৩৩ বছর বয়সে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বানন্দ মধু বেনাপোল সীমান্ত ‍দিয়ে ভারতে যেতে ব্যর্থ হয়ে আশ্রয় নেন সীমান্তবর্তী এক গ্রামে। তখন সেখানেই তার পরিচয় হয় বায়োস্কোপচালক বৃদ্ধ অমল বৈদ্যের সঙ্গে। অমল মধু তখন ভারত চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ওই সময় তার পুরোনো বায়োস্কোপটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। বায়োস্কোপটি প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হন সর্বানন্দ বৈদ্য। ১৮ টাকায় তিনি সেটি কিনে নেন। একইসঙ্গে শিখে নেন বায়োস্কোপ চালানোর কৌশল।

ভারতে না গিয়ে সর্বানন্দ মধু নিজের গ্রামে ফিরে আসেন এবং সেই বায়োস্কোপ নিয়ে ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে, মেলা থেকে মেলায়। তার বায়োস্কোপে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের গল্প, রূপকথা, ঐতিহাসিক ঘটনা এবং সামাজিক বার্তা। তার কণ্ঠে জীবন্ত হয়ে ওঠে প্রতিটি গল্প, যা দর্শকদের নিয়ে যায় এক মুগ্ধকর জগতে।

সর্বানন্দ মধু বলেন, ‘বায়োস্কোপ আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়, এটি আমার জীবন। আমি চাই মানুষ আনন্দ পাক এবং আমাদের ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাক।’

গনেশ পাগল সেবাশ্রমে মেলার আয়োজক অধ্যাপক কার্তিক বিশ্বাস বলেন, দেশের বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে ও শহরে ঘুরে ঘুরে বায়োস্কোপ দেখিয়ে সর্বানন্দ মধু এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। তিনি আজও একনিষ্ঠভাবে মানুষকে আনন্দ দিয়ে চলেছেন, যা কালের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

সর্বানন্দ মধুর অবদানকে সম্মান জানিয়ে সহকারী অধ্যাপক কবি মিন্টু রায় বলেন, তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস। আমরা তাকে দেখলে আমাদের ঐতিহ্যের মর্ম বুঝতে পারি।

কোটালীপাড়ার পারকোনার মেলায় সর্বানন্দ বৈদ্যের বায়োস্কোপ ঘিরে শিশুদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। রঙিন কাঠের বাক্সটির চারপাশে বসে শিশুরা এক এক করে চোখ রাখে ছোট ছোট ছিদ্রে। তাদের সামনে ফুটে ওঠে রূপকথার গল্প, রাজা-রাণীর কাহিনী, প্রকৃতির ছবি আর গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য।

শিশুদের উচ্ছ্বাস দেখে আবেগাপ্লুত সর্বানন্দ মধু বলেন, ওদের হাসিমুখ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি যতদিন বাঁচবো, ততদিন বায়োস্কোপ দেখিয়ে ওদের আনন্দ দিয়ে যাব।

তিনি আরো বলেন, এক সময় এই বায়োস্কোপ দেখিয়ে যে আয় হতো তা দিয়ে সংসার চলতো। এখন ছেলেরা ভালো ভালো চাকরি করে। মেয়েদের ভালো জায়গায় বিয়ে দিয়েছি। সংসারে টাকার প্রয়োজন নাই। তারপরও বাড়িতে বসে থাকতে পারি না। বায়োস্কোপ দেখানোর নেশা আমায় ছাড়ছে না। এখন আর বায়োস্কোপ দেখিয়ে টাকা চাই না। যে যা দেয় তাই নিয়ে থাকি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
ট্যাগ: গোপালগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!