উপজেলার বিভিন্ন লিচু বাগান ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ গাছেই প্রচুর মুকুল এসেছে। মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণে চারপাশ ভরে উঠেছে। সেই সুবাসে মৌমাছি ও নানা জাতের পাখির আনাগোনা বেড়েছে; যেন তারা আনন্দে লিচু গাছের ডালে ডালে দোল খাচ্ছে। গাছগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, প্রকৃতির কাছে যেন তারা একফোঁটা বৃষ্টির জন্য নীরব প্রার্থনা জানাচ্ছে। আর সেই আকুতি শুনে আকাশও ধীরে ধীরে বৃষ্টিমুখর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চাষিদের আশা, অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হলে এ বছর লিচুর ভালো ফলন পাওয়া যাবে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় প্রায় ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ করা হয়েছিল। ওই বছর লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৩২০০ মেট্রিকটন।
.png)
অন্যদিকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে লিচুর আবাদ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫৩৫ হেক্টর জমিতে বিস্তৃত হয়েছে। এ বছর সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩২১০ মেট্রিকটন বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। কৃষি বিভাগের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব
স্থানীয় বাগান মালিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমি দুই একর জমিতে লিচু গাছ লাগিয়েছি। গাছে মুকুল অনেক ভালো এসেছে। গাছগুলো মুকুলে ভরে উঠেছে দেখে আমরা বেশ আশাবাদী। এখন যদি সময়মতো বৃষ্টি হয় এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, তাহলে ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সময়টায় ঝড়-বৃষ্টি বা পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে মুকুল ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নিয়মিত বাগানের পরিচর্যা করছি। সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর লিচুর ভালো ফলন হবে এবং আমরা চাষিরা কিছুটা হলেও লাভের মুখ দেখতে পারবো বলে আশা করছি।
আরেক বাগান মালিক মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি ৩ একর জমিতে বিভিন্ন জাতের লিচু গাছ লাগিয়েছি। গত বছরের তুলনায় এবার লিচু গাছে মুকুল অনেক বেশি এসেছে। গাছগুলো এখন মুকুলে ভরে আছে, যা দেখে আমরা বেশ আশাবাদী। শুরু থেকেই বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা করছি এবং কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিচ্ছি। তবে এই সময়টায় ঝড়, শিলাবৃষ্টি বা পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে মুকুল ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আমরা সবসময় বাগানের দিকে নজর রাখছি। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে এ বছর ভালো ফলন হবে বলে আশা করছি।
লিচু চাষি সোহাগ মিয়া বলেন, এ বছর লিচু গাছে প্রচুর মুকুল এসেছে দেখে আমরা বেশ আশাবাদী। বাগানে গিয়ে গাছগুলোর দিকে তাকালে মনটা ভরে যায়। তবে এই সময়টায় ঝড়-বৃষ্টি বা পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে মুকুল ঝরে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আমরা নিয়মিত বাগানের পরিচর্যা করছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধও ব্যবহার করছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর লিচুর ভালো ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।
আরেক চাষি মো. হানিফ বলেন, লিচুর মুকুল আসার পর থেকেই আমরা বাগানে বেশি সময় দিচ্ছি এবং নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করছি। মুকুলের সময়টায় একটু বেশি যত্ন নিতে হয়, তাই কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ ও বাগান পরিষ্কার রাখার কাজ করছি। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুকূল আবহাওয়া। যদি ঝড়-বৃষ্টি বা পোকামাকড়ের আক্রমণ না হয়, তাহলে আশা করছি এ বছর লিচুর ফলন ভালো হবে এবং আমরা চাষিরা লাভবান হতে পারব।
লিচু ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন, এ বছর লিচু গাছে মুকুল ভালো এসেছে বলে আমরা ব্যবসায়ীরাও আশাবাদী। লিচু কিছু টা পরিপক্ব হবার আগেই আমরা বাগন ক্রয় করে থাকি। সাধারণত মুকুল ভালো হলে পরে ফলনও ভালো হয় এবং তখন বাজারে লিচুর সরবরাহ বেড়ে যায়। এতে ক্রেতারাও সহজে লিচু পায় এবং ব্যবসায়ীরাও ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারে। যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে এবং ফলন ভালো হয়, তাহলে এ মৌসুমে লিচু ব্যবসা জমজমাট হবে বলে আশা করছি।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, পাহাড়জুড়ে এখন লিচুর মুকুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে। এতে পরিবেশও অনেক সুন্দর লাগছে। ভালো ফলন হলে এলাকার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, পাহাড়ি এলাকার আবহাওয়া লিচু চাষের জন্য উপযোগী। চাষিদের নিয়মিত বাগান পরিচর্যা, পোকামাকড় দমন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আমরা পরামর্শ সেবা দিয়ে থাকি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। লিচুর মুকুলে ভরে ওঠা পাহাড়ি বাগানগুলো এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। চাষিরা আশা করছেন, প্রকৃতি সহায়ক হলে এ মৌসুমে লিচুর বাম্পার ফলন হবে এবং এতে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।