ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

নেত্রকোণায় কিশোরী ধর্ষণ মামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন গ্রেপ্তার

নেত্রকোণা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:৩০, ৭ আগস্ট ২০২৬
নেত্রকোণায় কিশোরী ধর্ষণ মামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

নেত্রকোণায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. রিপন মিয়াকে (৩৩) গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১৪।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাত ১২টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার মহিষারন এলাকার অচিন্তপুরে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

র‌্যাব-১৪ জানায়, মামলা হওয়ার পর থেকেই রিপন মিয়া পলাতক ছিলেন। তাকে গ্রেপ্তারে র‌্যাবের গোয়েন্দা দল ছায়া তদন্ত ও নজরদারি শুরু করে। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নিতে তাকে নেত্রকোনা সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

Advertisement

নেত্রকোনা মডেল থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় র‌্যাব রিপন মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

এজাহারে যা বলা হয়েছে

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী কিশোরী ও অভিযুক্ত রিপন মিয়া একই এলাকার বাসিন্দা এবং প্রতিবেশী। রিপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে পরিচিত। এই পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তিনি কিশোরীকে বিভিন্ন সময় কনটেন্ট তৈরির কথা বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন এবং বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দিতেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহার অনুযায়ী, গত ৩০ জুলাই রাত ৮টার দিকে জরুরি কথা আছে বলে কিশোরীকে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এ ঘটনায় কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে গত ৫ আগস্ট নেত্রকোনা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর (সংশোধিত ২০২০) ৯(১)/৩০ ধারায় মামলা করেন।

পরিবারের অভিযোগ

ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে রিপন তাদের বাড়িতে যান। তখন কিশোরী বাড়ির উঠানে রান্না করছিল। তার বাবা স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকানে এবং মা বাইরে কাজে ছিলেন। এই সুযোগে রিপন কিশোরীকে জোর করে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে যান এবং সেখানে ধর্ষণ করেন বলে পরিবারের অভিযোগ।

পরে কিশোরীর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে রিপন পালিয়ে যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

পরিবারের আরও অভিযোগ, ভিডিও বানানোর কথা বলে রিপন আগে থেকেই কিশোরীকে উত্যক্ত করতেন। তবে লোকলজ্জার ভয়ে তারা প্রথমে বিষয়টি প্রকাশ করেননি। পরে ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয় একটি বাজারে বিষয়টি নিয়ে সালিশ বসে।

সালিশে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত

সালিশে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ওই বৈঠক হয়। সেখানে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

তাদের দাবি, সালিশে রিপন অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চান। পরে তাকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং এলাকাছাড়া করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সালিশের কয়েকটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে রিপনকে উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি ফজলুর রহমানের পায়ে ধরে ক্ষমা চান।

ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই ধর্ষণের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার সালিশের মাধ্যমে করার সমালোচনা করেন। এরপরই কিশোরীর পরিবার থানায় মামলা করে।

ফজলুর রহমানের বক্তব্য

ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, মেয়েটি দরিদ্র পরিবারের। বিষয়টি জানার পর মেয়েটির পরিবার ও গ্রামের লোকজন তাদের কাছে বিচার নিয়ে আসেন। পরিবারের মামলা চালানোর সামর্থ্য নেই জানিয়ে তিনি বলেন, পরে এলাকাবাসী মিলে সালিশে বসেছিলেন।

তার ভাষ্য, সালিশের পর পরিবারকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সালিশে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

অভিযোগ অস্বীকার স্ত্রীর

রিপন মিয়ার স্ত্রী চম্পা আক্তার বলেন, ঘটনার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। মানুষের মুখে বিষয়টি শুনেছেন। তার স্বামী নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে অভিযোগ আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।

চম্পা আরও বলেন, ওই কিশোরীর তাদের পরিবারের সঙ্গে আগে থেকেই যাতায়াত ছিল।

ভুক্তভোগীর মা জানান, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন না। পরে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর মেয়ের কাছ থেকে অভিযোগের বিস্তারিত শোনেন।

ফেসবুকে পরিচিতি

রিপন মিয়া পেশায় কাঠমিস্ত্রি। ২০১৬ সাল থেকে তিনি ফেসবুকে ভিডিও তৈরি করছেন। ‘হাই আই এম রিপন ভিডিও’ ও ‘আই লাভ ইউ, এটাই বাস্তব’—এ ধরনের সংলাপের ভিডিও দিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পান।

২০১৯ সালে ‘রিপন মিয়া’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলেন তিনি। বর্তমানে ওই পেজে ১৯ লাখের বেশি ফলোয়ার রয়েছে।

তবে ধর্ষণের অভিযোগটি এখন আদালতের বিচারাধীন বিষয়। গ্রেপ্তার হওয়া রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আইনগতভাবে অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!