ঢাকা,  সোমবার   ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

অচল ঘড়ি সচল করেই চলছে মনমোহনের জীবিকা

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশিত: ১৫:১৮, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অচল ঘড়ি সচল করেই চলছে মনমোহনের জীবিকা
রাস্তার পাশে বসে অচল ঘড়ি সচল করছেন মনমোহন

সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। একসময় সময় দেখার প্রধান মাধ্যম ছিল হাতঘড়ি। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে মুঠোফোন ও স্মার্টওয়াচ। ফলে ঘড়ির ব্যবহার কমার পাশাপাশি কমেছে ঘড়ি মেরামতের কাজও। তবু পুরোনো পেশা আঁকড়ে ধরে জীবিকার চাকা সচল রেখেছেন প্রবীণ কারিগর মনমোহন বিশ্বাস।

প্রায় ৫০ বছর ধরে ঘড়ি মেরামতের কাজ করছেন তিনি। দীর্ঘ পাঁচ দশকের কর্মজীবনে অসংখ্য নষ্ট ঘড়িকে দিয়েছেন নতুন প্রাণ। ঘড়ির ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ, কাঁটা, ব্যাটারি ও মেশিনের সূক্ষ্ম শব্দ এখন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের সড়ক বাজার এলাকায় ফুটপাতে বসে ঘড়ি মেরামত করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

মনমোহন বিশ্বাসের দেশের বাড়ি হবিগঞ্জের মনতলা এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আখাউড়া পৌর শহরের রাধানগর এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তার পরিবারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে।

Advertisement

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় মানুষের সময় দেখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল হাতঘড়ি। ঘড়ি নষ্ট হলেই মানুষ ছুটে যেতেন মেরামতের দোকানে। তখন ঘড়ির দোকানগুলোতে ছিল বেশ কর্মচাঞ্চল্য। কিন্তু প্রযুক্তির প্রসার ও মুঠোফোনের সহজলভ্যতায় সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। হাতের মুঠোয় থাকা ফোনেই সময় দেখা যায়। অনেকের হাতে এসেছে স্মার্টওয়াচও। ফলে সাধারণ হাতঘড়ির ব্যবহার ও ঘড়ি মেরামতের কাজ দুটিই আগের তুলনায় কমেছে।

এরপরও পুরোনো পেশা ছাড়েননি মনমোহন বিশ্বাস। অভিজ্ঞতা আর দক্ষতাকে সম্বল করে এখনো নষ্ট ঘড়ি সচল করার কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

মনমোহন বিশ্বাস জানান, অভাব-অনটনের কারণে তার লেখাপড়া বেশি দূর এগোয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জীবিকার সন্ধানে মনতলা থেকে আখাউড়ায় চলে আসেন। কোনো কাজ জানা না থাকায় প্রথমে রিকশা মেরামতের কাজ শুরু করেন। কিছুদিন পর ঘড়ি মেরামতের কাজ শেখার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। স্থানীয় এক ঘড়ি কারিগরের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। এরপর শুরু করেন ঘড়ি মেরামতের কাজ শেখা।

ধীরে ধীরে ঘড়ির কাজের প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। একসময় ঘড়ির বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ, মেশিন এবং সূক্ষ্ম ত্রুটি শনাক্ত করার দক্ষতা অর্জন করেন। কয়েক বছর অন্যের সঙ্গে কাজ শেখার পর সড়ক বাজার এলাকায় নিজেই দোকান ভাড়া নিয়ে ঘড়ি মেরামতের কাজ শুরু করেন। পরে দোকান হাতছাড়া হয়ে গেলে গত কয়েক বছর ধরে ফুটপাতে টোল দিয়ে বসে এই কাজ করছেন।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে অনেক সময় ঘড়ি হাতে নিয়েই সমস্যার জায়গা বুঝতে পারেন তিনি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কের পাশের ফুটপাতে ছোট্ট পরিসরে বসে আছেন মনমোহন বিশ্বাস। সামনে বিভিন্ন ধরনের পুরোনো হাতঘড়ি। কোনো ঘড়ির ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ খুলে পরিষ্কার করছেন, কোনো ঘড়িতে লাগাচ্ছেন নতুন ব্যাটারি। আবার কোনো ঘড়ির কাঁটা ঠিক করছেন, কোনোটি সচল করতে পরীক্ষা করছেন মেশিন। অত্যন্ত সূক্ষ্ম এসব কাজ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রবীণ এই কারিগর।

মনমোহন বিশ্বাস বলেন, ৫০ বছর ধরে এই কাজ করছি। একটা সময় মানুষ ঘড়ি ব্যবহার করত। তখন ঘড়ির কাজও অনেক বেশি ছিল। ঘড়ি নষ্ট হলে মানুষ মেরামত করতে নিয়ে আসত। এখন মোবাইল ফোনের কারণে ঘড়ির ব্যবহার অনেক কমে গেছে। তারপরও যারা ঘড়ি ব্যবহার করেন, নষ্ট হলে মেরামতের জন্য নিয়ে আসেন। তবে কাজের চাহিদা ও আয় দিন দিন কমছে।

তিনি আরও বলেন, এই পেশার সঙ্গে আমার জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এখন বয়স হয়েছে। বয়সের সঙ্গে নানা রোগও বেড়েছে। অনেক কষ্টের মধ্যেও কাজটি ভালোবেসে করে যাচ্ছি। যতদিন শরীর সায় দেবে, ততদিন ঘড়ি মেরামতের কাজ করে যেতে চাই।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মনমোহন বিশ্বাসের মতো অভিজ্ঞ ঘড়ি কারিগর এখন খুব বেশি দেখা যায় না। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ঘড়ি মেরামতের মতো পুরোনো পেশা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। ফলে অভিজ্ঞ কারিগরদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্যবাহী কারিগরি দক্ষতাও।

তাদের মতে, ঘড়ি এখন শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়; অনেকের কাছে এটি স্মৃতি ও আবেগেরও অংশ। বাবা কিংবা দাদার কাছ থেকে পাওয়া পুরোনো ঘড়ি অনেকেই যত্ন করে রেখে দেন। সেই ঘড়ি নষ্ট হলে নতুন ঘড়ি না কিনে মেরামত করে সচল করতে চান। তখন প্রয়োজন পড়ে মনমোহনের মতো অভিজ্ঞ কারিগরের।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. বাদল মিয়া বলেন, ছাত্রজীবনে অনেক কষ্ট করে একটি ঘড়ি কিনেছিলাম। কয়েক বছর পর সেটি নষ্ট হয়ে যায়। তখন এই লোকের কাছে এনে মেরামত করাই। তিনি খুবই ভালো মানুষ। তার হাতের কাজও ভালো। ঘড়িতে কোনো সমস্যা হলে এখানে এনে ঠিক করাই।

আরেক বাসিন্দা মো. রাসেল আহমেদ বলেন, বড় ভাই প্রবাস থেকে উন্নতমানের একটি ঘড়ি পাঠিয়েছেন। কয়েক দিন ব্যবহারের পর হঠাৎ হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। তাই মেরামত করতে এখানে নিয়ে এসেছি। তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যেই ঘড়িটি ঠিক করে দিয়েছেন।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে ঘড়ির ব্যবহার কমলেও মনমোহন বিশ্বাসের মতো কারিগরদের কাছে এখনো ফিরে আসে মানুষের পুরোনো স্মৃতি। নষ্ট ঘড়ির ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশে হাত রেখে তিনি শুধু একটি যন্ত্র সচল করেন না, অনেক সময় সচল করে দেন মানুষের প্রিয় স্মৃতিও। আর সেই কাজের ওপর ভর করেই পাঁচ দশক ধরে চলছে তার জীবিকার চাকা।

ডেইলি-বাংলাদেশ//এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!