ঢাকা,  বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
ইমামতির ফাঁকে তিন দশক ধরে গাছ লাগাচ্ছেন রেজাউল

ইমামের হাতে ৩০ বছরের সবুজ বিপ্লব, বদলে গেছে গ্রামের সড়ক

মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেন, চরফ্যাশন (ভোলা)
প্রকাশিত: ১৫:৪৫, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইমামের হাতে ৩০ বছরের সবুজ বিপ্লব, বদলে গেছে গ্রামের সড়ক
ভোলার চরফ্যাশনে সড়কের পাশে তালগাছের চারা লাগাচ্ছেন ইমাম মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দিনের বড় একটি সময় কাটে মসজিদে ইমামতি করে। আর অবসর পেলেই হাতে তুলে নেন গাছের চারা। নিজের অর্থ, শ্রম ও উদ্যোগে প্রায় তিন দশক ধরে গ্রামের বিভিন্ন সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে চলেছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। তার লাগানো হাজার হাজার গাছের সবুজে বদলে গেছে গ্রামের সড়কের চিত্র। বিশেষ করে সারি সারি তালগাছের ছায়ায় একেকটি সড়ক এখন যেন পরিণত হয়েছে প্রাকৃতিক সবুজ করিডোরে।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া পরিচিত একজন ইমাম হিসেবে। তবে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অবসর সময়টুকু তিনি ব্যয় করেন গাছ লাগানো ও পরিচর্যায়।

নিজের নার্সারি দিয়ে শুরু

প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন তিনি। সেখানে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন।

Advertisement

শুধু নিজেই গাছ লাগিয়ে থেমে থাকেননি। মাইকিং করে স্থানীয় মানুষকেও বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করেছেন। এরপর ধীরে ধীরে তার এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়কে।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, বিভিন্ন ধরনের ফলজ ও ঔষধি গাছ। তবে তালগাছের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

তালগাছের ছায়ায় বদলে গেছে সড়ক

ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ দেখে মনে হয়, সবুজের বুক চিরে চলে গেছে একটি সরু পথ।

গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় স্থানীয়দেরও দেখা যায় এই সড়কে সময় কাটাতে। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে সড়কটির সবুজ সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন রেজাউল কিবরিয়া। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন তিনি। নানা কারণে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও তুহিন বলেন, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা এখানে সময় কাটান। বাইরের লোকজনও সড়কটির সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

তারা বলেন, রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগ দেখে স্থানীয় অনেক মানুষ নিজেদের জায়গায় গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

‘গাছ লাগানো সদকায়ে জারিয়া’

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, ‘সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাতেও আমার উদ্যোগ থেমে যায়নি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের মতো সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন জাতের চারা সংগ্রহ করে সেগুলো রোপণ করছি।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে বন বিভাগের পরামর্শও নিয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়ার ভাষায়, ‘আমার কাছে বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া একটি স্থায়ী কল্যাণের কাজ। আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস।’

যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন গাছ লাগানোর কাজ চালিয়ে যেতে চান রেজাউল কিবরিয়া। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

পাশে থাকার আশ্বাস ইউএনওর

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি তার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ভোলা/এমকে
ট্যাগ: ভোলা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!