মধুমতির ভাঙনে বিলীন ঘরবাড়ি-ফসলি জমি, ঝুঁকিতে ২৫০ পরিবার
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় মধুমতি নদীর ভয়াবহ ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের শত শত মানুষ। গত দুই সপ্তাহে লোহাগড়া ও কোটাকোল ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। এতে প্রায় ৫০টি পরিবারের বসতবাড়ি, ২৫০ একর ফসলি জমি, দুই কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ও একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও প্রায় ২৫০টি পরিবার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে এ বছর নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, লোহাগড়া ইউনিয়নের ছাগলছিড়া এবং কোটাকোল ইউনিয়নের রায়পাশা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। নদীর পাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলো ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এসব এলাকায় পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি ছিল। মধুমতির ভাঙনে অনেকের ঘরবাড়ি, পৈতৃক ভিটা ও পূর্বপুরুষের কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সর্বস্ব হারিয়ে বহু পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে লোহাগড়া ইউনিয়নের ছাগলছিড়া গ্রামের মিন্টু মোল্যা, ইসলাম ফকির, আলিম মোল্যা, আহাদ মোল্যা, নজরুল শেখ, আমিনুর আলী, হাই মোল্যা ও রসুল মোল্যার পরিবার রয়েছে। অন্যদিকে কোটাকোল ইউনিয়নের রায়পাশা গ্রামের মির্জা খাঁ, রেজন খাঁ, রহিমন বেগম, খলিল কাজী, শাহিন শিকদার, জাফর খাঁ ও মান্নান মোল্যাসহ অনেকের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
ছাগলছিড়া গ্রামের মিন্টু মোল্যা বলেন, ‘রাতের বেলা ভাঙন সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। তখন কিছুই দেখা যায় না। কোথায় যাব, কী করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। আমরা গরিব মানুষ। অন্য জায়গায় গিয়ে ঘর তোলার মতো টাকাপয়সাও নেই। নদীভাঙন রোধে কেউ আমাদের খোঁজখবর রাখে না।’
রায়পাশা গ্রামের রহিমন বেগম বলেন, ‘আমাদের কয়েক বিঘা জমি মধুমতি নদীতে চলে গেছে। এর আগে দুইবার বাড়ি ভেঙেছে। অনেক কষ্ট করে নতুন বাড়ি করেছিলাম। এখন সেই বাড়িও ভাঙনের মুখে পড়েছে। নদীভাঙনে এলাকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।’ এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
এলাকাবাসী অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইজারাকৃত বালুমহালের নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন করা হলে সংশ্লিষ্ট ইজারাদারের ইজারা বাতিল করা হবে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, নিয়ম না মেনে বালু উত্তোলনের কারণে নদীপাড়ের মানুষ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তবে নির্ধারিত প্রকল্পের বাইরে তাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। নিয়মবহির্ভূত বালু উত্তোলনের কারণেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।