ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]
আগুনে নিহত ১০

অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়াই চলছিল টুপটুপ রিসোর্ট

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৬:১৫, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়াই চলছিল টুপটুপ রিসোর্ট
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে পাটোয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ছয়জন আহত হয়েছেন। বাঁশ ও কাঠের তৈরি দোতলা রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সও ছিল না বলে জানা গেছে। গত জুনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। দুপুর ১টা পর্যন্ত সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। আগুনে রিসোর্টটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে গেছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।

আহতরা হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীর মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। অন্য একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, আগুন লাগার খবর পেয়ে কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও নির্বাপণ কার্যক্রম শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সদস্যরাও এ কাজে সহযোগিতা করেন। প্রথমে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ পাওয়া যায়। দুপুর ১টার পর রিসোর্টের টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, নিহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উদ্ধার কার্যক্রম শেষে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

ফায়ার সার্ভিস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটির নিচতলায় রান্নাঘর এবং দোতলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে। রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। আগুন লাগার পর তা নেভানোর চেষ্টা করা হলেও রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ছয়জনের মরদেহ শনাক্ত করেছেন এবং আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি পর্যটকেরা

আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান জানান, হঠাৎ দরজা খুলে তিনি চারদিকে ধোঁয়া দেখতে পান। তখন কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। জীবন বাঁচাতে তিনি ও তার স্ত্রী পাশের নালায় লাফ দিয়ে বের হয়ে আসেন।

তিনি জানান, রিসোর্টটিতে ২৫ থেকে ৩০ জন পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তারা সেখানে উঠেছিলেন। আরও দুই দিন রিসোর্টটিতে থাকার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

স্বজনদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে এসে পর্যটকদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা এবং সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে আগুনের প্রকৃত কারণ ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আসবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: কক্সবাজার
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!