ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ অর্থনীতি ]

চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন রেকর্ড

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭:৫৫, ৫ মার্চ ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন রেকর্ড
ফাইল ফটো

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের আমদানি–রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ এবং কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৯৮ শতাংশ পরিচালনা করে এই বন্দর। দক্ষিণ–পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরের তীরে কৌশলগত অবস্থান এবং আধুনিক অবকাঠামোর কারণে এটি শুধু দেশের অর্থনীতিই নয়, আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

১৩৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান এখন আধুনিকায়ন, দক্ষতা এবং আর্থিক সক্ষমতার নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ৪৮ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক বছরে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে বন্দরে।

Advertisement

এর আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯০ টিইইউ। অর্থাৎ এক বছরে অতিরিক্ত হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৭৭ টিইইউ, যা প্রায় ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

এই সময়ে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং মোট কার্গো থ্রুপুট বেড়েছে ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যা, পরিবহন ধর্মঘট কিংবা কাস্টমস কার্যক্রমে বিঘ্নের মতো নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও জাহাজের গড় অপেক্ষার সময় অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে মাত্র এক দিনে।

শুধু অপারেশনাল সাফল্য নয়, আর্থিক ক্ষেত্রেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত পাঁচ বছরে রাজস্ব আয়, উদ্বৃত্ত এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অবদানের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্য দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বন্দরের গড় রাজস্ব আয় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৩ দশমিক ০৮ শতাংশ।

২০২৫ সালে বন্দরের মোট রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে আয় ছিল ৫ হাজার ৭৬ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ২০২৪ সালে, যখন আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব আয় বেড়েছিল ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও সফল হয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত পাঁচ বছরে রাজস্ব ব্যয়ের গড় প্রবৃদ্ধি সীমাবদ্ধ রাখা গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশের মধ্যে। ২০২৪ সালে ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ।

আয়ের প্রবৃদ্ধি যেখানে দ্বিমাত্রিক ঘরে, সেখানে ব্যয় এক অঙ্কের মধ্যে রাখা আর্থিক ব্যবস্থাপনার বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এর ফলেই বাড়ছে বন্দরের উদ্বৃত্ত। ২০২৫ সালে নিট উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪২ কোটি টাকা- যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এর আগে ২০২৪ সালে উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ২ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম বন্দর শুধু নিজের আর্থিক সক্ষমতাই বাড়াচ্ছে না, রাষ্ট্রীয় কোষাগারেও দিচ্ছে বড় অবদান।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভ্যাট, আয়কর এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব মিলিয়ে মোট ৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এর মধ্যে আয়কর ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, ভ্যাট ৩ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব ৬০০ কোটি টাকা।

২০২১ সালে যেখানে কোষাগারে জমা হয়েছিল ১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০৪ কোটি টাকায়।

বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, ডিজিটাল অটোমেশন এবং আধুনিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং প্রযুক্তির ব্যবহার সময় ও খরচ কমিয়েছে। পাশাপাশি পতেঙ্গা টার্মিনালসহ নতুন অবকাঠামো যুক্ত হওয়ায় বিদেশি জাহাজ দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের এই আর্থিক দৃঢ়তা ভবিষ্যতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। বিশেষ করে বে-টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প দেশের সমুদ্র অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর এখন শুধু একটি বন্দর নয়- এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। বর্তমান প্রবৃদ্ধি ও দক্ষতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী বন্দর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে চট্টগ্রাম বন্দর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!