এই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরাই যখন একটু সিনিয়র হয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠেন তখন সেই শিক্ষার্থীরাই তাদের ‘সিনিয়রদের আসনে’ বসে নির্যাতন করে জুনিয়রদের। অথচ এখন যারা তাদের জুনিয়রদের নির্যাতনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা অধিকাংশই গত কয়েকদিন আগেও নির্যাতনের শিকার হয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছিল। এভাবেই প্রতিবছরই জুনিয়ররা সিনিয়র হয়ে নতুন জুনিয়রদের নির্যাতনের মাধ্যমে চলতে থাকে নির্যাতনের পরম্পরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রত্যেকটি হলেই এই চিত্র দেখা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর যে পরিমাণ শিক্ষার্থী ভর্তি হয় সেই হিসেবে আবাসিক হলগুলোতে আবাসন সংখ্যা অপ্রতুল। প্রতিবছর সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাদের আগের আরো চার বর্ষের সিনিয়রসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান শিক্ষার্থী ৩৭ হাজারের অধিক। এসব শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ১৮টি।
.png)
সিট স্বল্পতার জন্য সবকটি হলেই নতুন (প্রথম বর্ষের) শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য বরাদ্দ থাকে গণরুম। এই গণরুমের মেঝেতে সারি সারি বিছানা, আর উভয় পাশে সারিবদ্ধ ট্রাঙ্কে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখে এক রুমে থাকতে হয় ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থীর। একটু ফাঁকা জায়গাও চোখে পড়ে না সেই গণরুমে। এমন রুমে থাকতে এসব শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিত হতে হয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। আর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করলে রুম থেকে বের করে দেওয়া, শারীরিক-মানসিক নির্যাতনসহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুনতে হয় সিনিয়রদের থেকে।
এতো কষ্ট আর বিড়ম্বনা সহ্য করে আবাসিক হলে থেকে প্রথম বর্ষের পাঠ চুকিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠে শিক্ষার্থীরা। আর দ্বিতীয় বর্ষে উঠেই প্রথম বর্ষে নির্যাতনের শিকার হয়ে সিনিয়র হওয়া শিক্ষার্থীরাই মেতে উঠেন জুনিয়র (নতুন প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থী) নির্যাতনে। এভাবে নতুন এই জুনিয়ররা যখন সিনিয়র হয় তারাও চড়াও হয় জুনিয়রদের উপর। এভাবেই হলগুলোতে চলে নির্যাতনের ধারাবাহিকতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের ১৩টি হলে গ্রুপভেদে সপ্তাহে ৪-৫ দিন গেস্টরুম করানো হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। গত ১০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও ছাত্রদের আবাসিক হলগুলোতে প্রায় শতাধিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৫০ জনের অধিক শিক্ষার্থী। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করা, ফেসবুক পোস্টসহ নানা কারণে নির্যাতন করা হয়েছে। এদের কাউকে পিটিয়ে হল থেকে তাড়িয়ে সিট দখলে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব নির্যাতনের ঘটনার বিষয়ে জানা যায় কিন্তু প্রকাশিত এসব ঘটনার বাইরেও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী হয়রানির ঘটনা ঘটছে৷
করোনার পর ২০২১ সালের ৫ অক্টোবরে খোলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আবাসিক হল। হল খোলার পর থেকে গত ৪ মাসে এ পর্যন্ত ৮টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী। নির্যাতনের শিকার এসব শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুইজন শিক্ষার্থী হল-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এমন আচরণ বিশ্লেষণ করে ও তা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয় উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মেহ্জাবীন হক ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এই নির্যাতনের ঘটনা প্রতিবছরই ঘটছে। এটা অনেকটা পরিবেশগত শিক্ষা হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তারা নতুন অবস্থায় যা শিখে পরে তার জুনিয়রদের উপর তার প্রয়োগ করে। এই খারাপ শিক্ষা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে অন্যথায় এটা আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের আত্মপলব্ধি আনতে হবে। যেনো নিজেরাই তাদের কাজের খারাপ দিক বুঝতে পারে। আমরা পারস্পরিক মূল্যবোধ ও সহমর্মিতার চর্চা না করে নিষ্ঠুরতা চর্চা করছি তাই এমন ঘটনা ঘটে। তাই শিক্ষার্থীরা কিভাবে তাদের পরিবেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে বুঝতে নিয়মিত ওয়ার্কশপসহ নানামুখী উদ্যোগ নেয়া উচিত।