ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

মুক্তি সংগ্রামের জীবন্ত প্রতীক রাবির ‘সাবাস বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য

আশিক ইসলাম, রাবি
প্রকাশিত: ১৫:১৬, ২৭ মার্চ ২০২২
মুক্তি সংগ্রামের জীবন্ত প্রতীক রাবির ‘সাবাস বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাবাস বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য

মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দুটি লাল রঙের অবয়ব। একজনের পরনে প্যান্ট, অন্যজনের লুঙ্গি। একজন দুই হাতে দৃঢ়ভাবে রাইফেল ধরে দৌড়ের ভঙ্গিতে রয়েছে। আরেকজনের এগিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বাঁ-পা বাড়িয়ে দিয়েছে। ডান হাতে রাইফেল আর বাঁ হাত মাথার ওপরে মুষ্টিবদ্ধ। যেনো তারা শত্রুকে শেষ করে দিতে অদম্য গতিতে ছুটছে। এর মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে সব পেশার মানুষের অংশগ্রহণের প্রতীক। বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’র কথা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার পর হাতের বাম পাশে উন্মুক্ত খোলা মাঠ। একটু সামনে এগিয়ে যেতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ সিনেট ভবন চত্বরে মাথা উঁচু করে স্ব গৌরবে দাঁড়িয়ে আছে সাবাস বাংলাদেশ ভাস্কর্যটি। শিল্পীর শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় লাল বেলে মাটির এই ভাস্কর্যে রচিত হয়েছে সংগ্রামী বাঙালির ইতিহাস। অসাম্প্রদায়িক বাংলার চূড়ান্ত এক বিজয়ের জীবন্ত ছবি সাবাশ বাংলাদেশ ভাস্কর্য।

ইতিহাস
মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রতীক এই সাবাস বাংলাদেশ ভাস্কর্যটি। ১৯৯১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে শিল্পী নিতুন কুন্ডু ভাস্কর্যের নির্মাণকাজ শুরু করেন। নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লাগে এক বছর। বিনা পারিশ্রমিকে শিল্পী এই ভাস্কর্য নির্মাণ করে দেন বলে জানা গেছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এটি উন্মোচন করেন।

Advertisement

প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করার যে প্রয়াস চালিয়েছিল, তাতে আক্রান্ত হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও। পরে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ ঘাঁটি গেড়ে বসে এখানে। এ সময় তাদের বিতাড়িত করতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন অধ্যাপক হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক মীর আবদুল কাইউম, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দারসহ নাম না জানা অনেক শিক্ষার্থী ও কর্মচারী। আর এসব শহীদের স্মৃতি অম্লান করে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা হয় ‘সাবাস বাংলাদেশ’।

মূল দৃশ্যপট
দুটি অবয়বের একজন দুই হাতে দৃঢ়ভাবে রাইফেল ধরে দৌড়ের ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে। তার দৌঁড়ের ভঙ্গিতে রয়েছে গতি, সাহস ও বীরত্বের বিশালতা। আরেকজনের এগিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বাঁ-পা বাড়িয়ে দিয়েছেন। ডান হাতে রাইফেল আর বাঁ হাত মাথার ওপরে মুষ্টিবদ্ধ। তা যেনো বাঙালি হৃদয়ের বিজয় অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের পেশিবহুল দেহ অমিত শক্তির আভাস দিচ্ছে।

ভাস্কর্যের পাদদেশে রয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ। ৪০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে ভাস্কর্যটি অবস্থান করছে। পুরো ভাস্কর্যটি একটি বিশাল বেদির ওপর স্থাপিত। কয়েক ধাপ সিঁড়ি পাড়ি দিয়ে ভাস্কর্যের মূল বেদি। ভাস্কর্যের মূল দুটি অবয়বের পেছনে রয়েছে ৩৬ ফুট লম্বা একটি দেয়াল। দেয়ালটির উপরিভাগে একটি বৃত্ত, যা স্বাধীনতার সূর্যের প্রতীক।

কারুকার্য
চিত্রশিল্পীর অনন্য শৈল্পিক হাতের যাদুকরী ছোঁয়ায় ভাস্কর্যটির অপরূপ সৌন্দর্য ও কারুকার্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে। ভাস্কর্যটির দুপাশে রয়েছে আয়তাকার দু’টি দেয়াল। যার একটিতে কয়েকজন বাউল গান করছেন। যা বাঙালি জাতির গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিচায়ক। অপর দেয়ালটিতে মায়ের কোলে শিশু ও দুই তরুণী। যাদের একজনের হাতে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। সেই পতাকার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে এক কিশোর। শিল্পীর শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় কালজয়ী এই লাল বেলে মাটির ভাস্কর্যে গ্রথিত হয়ে আছে সংগ্রামী বাঙালির ইতিহাস এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলার চূড়ান্ত এক বিজয়ের জীবন্ত চিত্র।

ভাস্কর্যের নিম্নভাগে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার চারটি লাইন স্থান পেয়েছে। যা ভাস্কর্যটিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
‘সাবাস, বাংলাদেশ, 
এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়
জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার, 
তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরের দর্শনার্থীরাও আসেন ভাস্কর্যটি দেখতে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাজু আহমেদ বলেন, সাবাস বাংলাদেশ ভাস্কর্যটি তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে বাঙালি জাতির দেশপ্রেম, সম্প্রীতি, সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেডএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!