ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্ফুলিঙ্গ’ ভাস্কর্য

আশিক ইসলাম, রাবি
প্রকাশিত: ১৪:৩৮, ২৯ মার্চ ২০২২
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্ফুলিঙ্গ’ ভাস্কর্য
২০১২ সালে ড. শামসুজ্জোহা হলের মূল ফটকের পাশে একটি স্মৃতি স্মারক ‘স্ফুলিঙ্গ’ নির্মাণ করা হয়

চারপাশে সবুজ গাছপালায় ঘেরা একটি পুকুর। পুুকুরের ঠিক পূর্ব পাশে একটি আবাসিক হল। হলের পাশেই গাছপালার নিচে ছোট্ট একটি  বেদি। বেদির ঠিক পেছনে রয়েছে বাঁকা লম্বা একটি দেয়াল। দেয়ালটি লাল আর কালো ইটের দ্বারা তৈরি। আর দেয়ালের মাঝখানে রয়েছে গোল বৃত্ত। যেনো জাতীয় পতাকার লাল বৃত্তকে নির্দেশ করছে। আর বৃত্তের সামনে একজন মানুষের ভাস্কর্য। বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ড. শামসুজ্জোহার স্মরণে নির্মিত ‘স্ফুলিঙ্গ’ ভাস্কর্যের কথা।

অবস্থান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ড. শামসুজ্জোহা হলের মূল ফটকের পশ্চিম পাশে ‘স্ফুলিঙ্গ’ ভাস্কর্যটির অবস্থিত। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা স্মরণে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে।

ইতিহাস
১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। গণঅভ্যুস্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করার চেষ্টা করে। আন্দোলনকারী ছাত্ররা মিছিল বের করলে অনেক ছাত্রের জীবননাশের আশঙ্কা থাকায় প্রক্টর শামসুজ্জোহা নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন সেনাসদস্যদের। কিন্তু সেনাসদস্যরা তার কথা উপেক্ষা করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। নিজের জীবন দিয়ে ছাত্রদের রক্ষা করার এই নজির দ্বিতীয়টি নেই। তার সেই চির অবদান অম্লান করে রাখতে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার নামানুসারে আবাসিক হলের নামকরণ করে ‘শহীদ শামসুজ্জোহা হল’ এবং ২০১২ সালে হলের মূল ফটকের পাশে একটি স্মৃতি স্মারক ‘স্ফুলিঙ্গ’ নির্মাণ করে। 

Advertisement

স্থাপত্যের আকার
স্থাপত্যটির উচ্চতা ১৫ ফুট। দৈর্ঘ্য ৩৮ ফুট এবং প্রস্থ ২৪ ফুট। এই ভাস্কর্যে শহীদ শামসুজ্জোহার ৩ ফুট উচ্চ আবক্ষ প্রতিকৃতি রয়েছে। ২০১২ সালের ৫ মে তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. এম আবদুস সোবহান এটি উদ্বোধন করেন। তৎকালীন হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মর্তুজা খালেদের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও চারুকলার শিক্ষক অধ্যাপক এস এম জাহিদ হোসেনের তত্ত্বাবধানে মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কনক কুমার পাঠক ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন।

মূল দৃশ্যপট
ভাস্কর্যটির পেছেনে একটি বাঁকা দেয়াল রয়েছে। দেয়ালে লাল ও কালো ইটের ব্যবহার করা হয়েছে আর মাঝখানে রয়েছে একটি ফাঁকা বৃত্ত।। বৃত্তের চারপাশে আগুনের ফুলকি (স্ফুলিঙ্গ) বুঝাতে লাল ইটের ব্যবহার করা হয়েছে। আর পাশেই রয়েছে কালো ইটের ব্যবহার। কালো অংশের মধ্যে লাল স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়লে আগুন যেমনটা হয় সে ধরনের একটি আভাস দেয়া হয়েছে। একপাশ থেকে দেখলে বুঝা যায় বাঁকা দেয়াল দ্বারা উড়ন্ত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে নির্দেশ করা হয়েছে।

দেয়ালের মাঝের বৃত্ত বরাবর ঠিক সামনে রয়েছে ড. জোহার ভাস্কর্য আবক্ষ প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতিটা রাখা হয়েছে একটি কালো বেদির উপরে। শোক বুঝাতে কালো রঙের ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। ভাস্কর্যের সামনে একটু ফাঁকা জায়গা রয়েছে, সেখানে রয়েছে সবুজ ঘাস। এই ফাঁকা অংশ দিয়ে বুঝানো হয়েছে মতিহারের সবুজ চত্বর। এই সবুজ চত্বরে ড. জোহা শহীদ হয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন তাই প্রতিকৃতির নিচের বেদিতে লাল রঙ উপস্থাপন করা হয়েছে। বেদির দুই দিকে লাল রঙের সিঁড়ি রয়েছে। এই দুই দিকে লাল রঙটা সবুজ রঙকে ভেঙে মতিহারের (সবুজ ঘাস) গন্ডি পেরিয়ে আরো বাইরে চলে গেছে। অর্থাৎ মতিহারের যে চত্বর সে চত্বরকে ভেঙে রক্তপ্রবাহ বাইরে চলে গেছে। তখন তার আত্নত্যাগ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারাদেশে তার রক্তটা প্রবাহিত হয়েছে সেই নির্দেশনা দেয়।

রক্ত প্রবাহিত হওয়ার ফলে স্বাধীনতা এসেছে। সিঁড়ির উদ্দেশ্য হচ্ছে উপরে ওঠা। ঠিক একইভাবে ড. জোহার রক্তের প্রবাহ বাইরে গেছে (সারাদেশে ছড়িয়েছে) সিঁড়ির মতো করে। যে সিঁড়ি বেয়ে আমরা আস্তে আস্তে ভাস্কর্য ও পতাকার (দেয়াল) ওখানে যেতে পারছি। অর্থাৎ আমরা স্বাধীনতার দিকে পৌঁছে গেছি। মূলত স্থাপত্যটি এভাবেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

স্ফুলিঙ্গ
‘স্ফুলিঙ্গ’ শব্দের অর্থ হলো ছিটকে পড়া আগুনের কণা। যে কণাটা কোথাও পড়ে আবারো জ্বলে উঠেছে। শহীদ ড. জোহা যেনো সে রকমই একটি আগুনের কণা। ওরা এই আগুনকে নেভাতে চেয়েছিলো কিন্তু সে আগুনটা না নেভে আরো জ্বলে ওঠে প্রচন্ড আকারে। যার ফলে বাংলাদেশ হয় স্বাধীন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেডএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!