ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর টর্চার সেল রাবির জোহা হল

রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২১:১৯, ২৬ মার্চ ২০২২
মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর টর্চার সেল রাবির জোহা হল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল

১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। অভ্যুত্থানে ছাত্রদের বাঁচাতে নিজের জীবন দিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালিন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা। তার আত্মত্যাগের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের নামকরণ করা হয় শহীদ ড. শামসুজ্জোহা হল। ১৯৭১ সালে সেই জোহা হলকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বানিয়েছিল ‘টর্চার সেল’। সেখানে বিভিন্ন এলাকাতে থেকে নিরীহ মানুষদের ধরে নিয়ে এসে অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। পরে তাদের অনেককে হত্যা করে হলের পেছনের ফেলে দেওয়া হতো। 

সেই জোহা হলের ‘টর্চার সেল’ থেকে যে কয়জন বেঁচে ফিরেছিলেন তাদের একজন রাজশাহীর প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা শামসুর রহমান কান্দু। এখনো বেঁচে আছেন তিনি। তার বয়স এখন প্রায় ৯০ বছর। থাকেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের কাজলা এলাকায়। সম্প্রতি তার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তিনি প্রায় শয্যাশায়ী। অধিকাংশ সময় তার বিছানায় কাটে। খুব বেশি কথাও বলতে পারেন না। তবে মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনে কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। নির্যাতিত নেতা শুনিয়েছেন ‘একাত্তরের দিনগুলি’র কথা। 

শামসুর রহমান অভিমানের স্বরে বলেন, ‘এতদিন পর আসছো খোঁজ নিতে। এতদিন কই ছিলা?’ থেমে থেমে বলেন, ‘ওরা আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। উল্টো করে দু’পায়ের মাঝে বাঁশ দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছিল এবং খুব মেরেছিল...।” পরক্ষণেই কথার মাঝেই খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। পাশেই বসেছিলেন তার স্ত্রী রাহাত আরা রহমান। 

Advertisement

তিনি জানান, যুদ্ধ শুরু হলেও শামসুর শহর ছাড়েন নি। তিনি এখানকার পাকিস্তানি বাহিনীর নানা গতিবিধির তথ্য গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠাতেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী কাজলার বাসা থেকে তাকে টেনে-হেঁচড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জোহা হলে’ নিয়ে যায়।

রাহাত আরা রহমান বলেন, সেই দিনটি ছিল শনিবার। চারদিকে ফজরের আজান শোনা যাচ্ছিল। হঠাৎ কয়েকজন সেনা এসে ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। উনি (শামসুর) গিয়ে দরজা খুলে দিতেই সেনারা ঘরে ঢুকে তল্লাশি শুরু করে। দেখে কোনো অস্ত্র আছে কি-না! কিছু না পেয়েও ওরা ওকে ধরে নিয়ে যায়। সেদিন নাকি এই এলাকা থেকে আরও ২০-২৫ জনকে নিয়ে গিয়েছিল।

শামসুর রহমানের স্ত্রী আরো বলেন, প্রায় ছয়-সাত দিন তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। মাথা নিচু করে দুপায়ের মাঝে বাঁশ দিয়ে ঝুলিয়ে নৃশংসভাবে পেটানো হয় তাকে। দুই পা ফুলে গিয়েছিল এবং সারাদেহে আঘাতের চিহ্ন ছিলো। মাথায় রক্ত জমে গিয়েছিল। কিছুই খেতে দেওয়া হতো না, পানি খেতে চাইলেও পাকসেনারা তাদের পায়ের বুট মুখের কাছে ধরত। এ ঘটনার পর থেকে শামসুর ঠিকমতো চোখে দেখতে এবং হাঁটতেও পারে না। আজও ওর পায়ে সেই দড়ি বাঁধার দাগ আছে। এগুলো মনে পড়তেই নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যকার মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, ১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি থেকেই দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আবাসস্থল শহীদ শামসুজ্জোহা হলকে পাকিস্তানি হানাদাররা রূপ দিয়েছে তাদের ক্যাম্প, টর্চার সেল হিসেবে। শহরের অন্যান্য জায়গাগুলোতেও যে হত্যা-নির্যাতন কর্মকাণ্ড চালানো হয়নি এমন নয়। কিন্তু শহরের নানা প্রান্ত থেকে সন্দেহভাজন নিরীহ নারী-পুরুষকে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে এই হলে নিয়ে এসে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো এবং তথ্য বের করার চেষ্টা করত। নিরীহ মানুষদের ধরে এনে হলের ব্লকের বারান্দায় হাত বেঁধে রশিতে ঝুলিয়ে নির্যাতন, মেয়েদের ওপর যৌন নিপীড়ন, অকথ্য ভাষায় গালাগালিও করা হয়েছে। এছাড়া হলের পিছনে নারী-পুরুষকে এক দড়িতে বেঁধে নিয়ে গণহত্যা চালানো হতো।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেডএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!