স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে চাকরি দিয়েছেন নিজের ব্যক্তিগত নাপিত থেকে শুরু করে কাজের লোক পর্যন্ত। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা যেনো নিত্যদিনের ঘটনা। বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালিন ভিসি অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের কথা।
তবে এদিক থেকে একেবারেই ব্যতিক্রম বর্তমান ভিসি অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার। দায়িত্ব নেয়ার ৮ মাসেই জায়গা করে নিয়েছেন শিক্ষার্থীদের মনে। তার শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ যা তাকে করেছে অনন্য। যেনো একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ ভিসি অধ্যাপক এম সোবহান এবং অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার।
.png)
২০১৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর মারা যায় ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী সানিউর রহমান সানি। তার জানাযায় অংশ নিতে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বাস চেয়েছিলো সহপাঠীরা। তখন ভিসি সোবহান বাস দেননি। কিন্তু হিমেল মারা গেলে তার জানাযায় অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের বাস দেয়াসহ তার দাফনকার্য সম্পন্ন করেছেন বর্তমান ভিসি। ট্রাকচালকের বিরুদ্ধে হামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, একদিনেই ঘাতক চালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আগে কখনো বিশ্ববিদ্যালয় এমন মামলা করেনি।
হিমেলের মায়ের ভরণপোষণ ও আজীবন চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করেছেন তারা। দাফনের দিনে মায়ের হাতে দিয়েছেন ৫ লাখ টাকা এবং গতকাল (বৃহস্পতিবার) দিয়েছেন আরো ৫ লাখ টাকার চেক ও ঈদ উপহার সামগ্রী। হিমেলকে কেউ মনে না রাখলেও মনে রেখেছেন তারা। ট্রাকচাপায় আহত রিমেলের পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং ঈদ উপকার সামগ্রী দিয়েছেন।
বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের মারধরের ঘটনায় ভিসি সোবহান ছিলেন নিরব। এমনকি অভিযোগপত্র দিলেও তা হারিয়ে ফেলেছে তার প্রশাসন। কোটা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের মারধর, ছিনতাই, সাংবাদিকদের উপরে হামলাসহ কোনো বিষয়ে তিনি পাশে দাঁড়াননি।
এদিক থেকে ব্যতিক্রম বর্তমান ভিসি। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত করে ঘাতকরা। এই ঘটনায় ভিসি নিজে শিক্ষার্থীকে দেখতে গিয়েছেন। তার চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করেছেন। পরিবারকে চিকিৎসা বাবদ এক লাখ টাকা দিয়েছেন। গতকাল (শুক্রবার) আরো ৫০ হাজার টাকা ও ঈদ উপকার সামগ্রী দিয়েছেন।
হিমেলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলা মাঠে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আলোচনায় বসেছিলো। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম উন্মুক্ত আলোচনা। এই আলোচনায় হিমেলের পরিবারের পক্ষে ৯টি দাবি জানায় তার সহপাঠীরা। ভিসি তাদের সব দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন। সেই সঙ্গে বেশ কয়েকটি দাবি এরই মধ্যে পূরণ করেছেন।
তৎকালিন ভিসির সময়ে প্রক্টরের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলা, ক্ষমতার অপপ্রয়োগসহ নানা অভিযোগ ছিলো। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা প্রক্টরের অব্যাহতির দাবি জানালেও ভিসি সোবহান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এদিকে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে শিক্ষার্থীরা এবং তাকে অব্যাহতির দাবি জানায়। বর্তমান ভিসি শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রক্টরকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন প্রক্টর নিয়োগ দেন। যা পূর্বের ভিসির সময়ে দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও স্বার্থ রক্ষায় বর্তমান ভিসি সব সময় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
তৎকালিন ভিসি অধ্যাপক আবদুস সোবাহানের সময় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রাস্তার বেহাল দশা। সেসব রাস্তা সংস্কারে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা দাবি জানালেও বিভিন্ন অযুহাতে না নাকজ করে ভিসি সোবহান। বর্তমান ভিসি সেসব রাস্তা সংস্কারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন রাস্তার চলছে সংস্কার কার্যক্রম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে নিতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বর্তমান ভিসি। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিক্ষার্থীদের যেকোনো প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে পাঠ্যক্রমেও নজর দিয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত পরিবর্তন থেকে শুরু করে সব জায়গাতে রাখছেন স্বাক্ষর।
চারুকলা অনুষদের এক শিক্ষার্থী বলেন, একজন ভিসিকে চার বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমান ভিসি মাত্র আট মাস সময় অতিবাহিত করেছেন। আট মাসে তার সম্পর্কে জাজমেন্ট দেয়া মুশকিল। তবে এটা সত্য বর্তমান ভিসি শিক্ষার্থীদের কথা ভাবেন, তাদের চাওয়াকে গুরুত্ব দেন। যা আগের ভিসির মধ্যে পাইনি। শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে যে দেয়াল তৈরি হয়েছিলো তা ভেঙে দিয়েছে বর্তমান প্রশাসন, এটা বলা যায়।