তাকে দেখলেই বলতো- ‘তোর এক পা নেই তোর দ্বারা কিছু হবে না।’ তবুও তিনি থেমে যাননি। এসব উপহাসকে পুঁজি করেই এগিয়ে চলেছেন। সব উপহাস আর কটু কথাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বলছিলাম লোক প্রশাসন বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের ছাত্রী ফাহিমা আক্তার খুশির কথা। তার বাড়ি নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানার অন্তর্গত পানিয়াল পুকুরপাড়া গ্রাম। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে খুশি সবার ছোট।
.png)
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিলো তার। তাইতো বুকভরা স্বপ্ন আর মনের জোরে এক পায়ে ভর করেই চলে যেতেন বিদ্যালয়ে। গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি ও কিশোরগঞ্জ মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে শহরে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য। নিজের একান্ত প্রচেষ্টা আর অধ্যবসায়ে সেই খুশি ভর্তি হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তিনি বলেন, গ্রামের পাড়া প্রতিবেশীরা আমার প্রতিবন্ধকতার কারণে নানাভাবে আঘাত করে কথা বলতো। আমি যখন ভার্সিটির কোচিং করতে আসবো তখন আমার পরিবারের কাছে অনেকেই মানা করেছে। বাবাকে সবাই বলতো, বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠালে আমাকে নিয়ে সবাই ঠাট্টা করবে। জীবনে অনেকের কাছে কটু কথা শুনেছি তবুও থেমে যাইনি। পা নেই বলেই কি আমি স্বপ্ন দেখতে পারবো না? আমিই একদিন দেশকে নেতৃত্ব দিবো। ভবিষ্যতে সরকারি উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা হতে চাই।
খুশি জানান, তার বাবার বয়স হয়েছে। পারিবারিক আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নেই। দুই ভাই বিয়ে করে আলাদাভাবে থাকছে। তাদের খোঁজখবর নিচ্ছে না। আগে আকিজ গ্রুপ থেকে ২ হাজার টাকা করে বৃত্তি পেতেন খুশি। কিন্তু বর্তমানে সেটাও বন্ধ। কিভাবে নিজের খরচ চালাবে সংশয় তার।
খুশি বলেন, আমি প্রতিবন্ধী কিন্তু সমাজের প্রতিবন্ধী হয়ে থাকতে চাই না। আত্মনির্ভরশীল হতে চাই। বিভিন্ন জায়গায় টিউশন খুঁজেছি কিন্তু আমার প্রতিবন্ধকতার কারণে কেউ টিউশন দিতে রাজি হয় না। এই প্রতিবন্ধকতা কি আমার অপরাধ?
একপায়ে চলাফেরা করতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই অসুস্থ হোন খুশি। তার সমস্যার বিষয়ে জানতে পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক গোলাম সাব্বির তাকে একটি বাইসাইকেল কিনে দিয়েছেন।
খুশি বলেন, সাইকেল পেয়ে চলাফেরা একটু সহজ হয়েছে। যখন সাইকেল ছিলো না হেঁটে ক্লাসে যাওয়া খুব কষ্ট হতো। মাঝে মাঝেই পায়ের ব্যথায় জ্বর চলে আসতো। ব্যথার কারণে রাতে পড়াশোনা ঠিকমতো করতে পারতাম না। সাইকেল পাওয়ার পর থেকে আর ক্লাস মিস হচ্ছে না এবং অসুস্থও কম হচ্ছি। সময়মতো ক্লাসে যেতে পারছি।
খুশি আরো বলেন, এক পায়ে সাইকেল চালাতে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। তবে যখন ক্লাসের চাপ বেশি থাকে তখন একটু কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে পায়ে ব্যথা চলে আসে। ক্যাম্পাসে যেভাবে যানবাহন চলাফেরা করে তাতে ভয়ে থাকি কখন এক্সিডেন্ট করে ফেলি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, ছাত্র উপদেষ্টার কাছ থেকে খুশির প্রতিবন্ধকতার কথা শুনতে পেয়ে তাকে একটি সাইকেল কিনে দিই। এখন বিকেলে হাঁটতে বের হলে যখন খুশিকে সাইকেল চালাতে দেখি তখন নিজের মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করে। প্রতিবন্ধীরাও দেশের সম্পদ হয়ে উঠবে যখন তাদের সঠিক যত্ন নেয়া হবে।