জন্ম থেকেই দুই পা অচল তার। চলাফেরা করতে পারেন না সাধারণদের মতো। ডান হাত দিয়ে তেমন কোনো কাজই করতে পারে না। একমাত্র ভরসা বাম হাত। ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না, রয়েছে মুখের জড়তাও। এজন্য জন্মের পর থেকেই দেখেছেন জীবনের কঠিন বাস্তবতা। সমাজের মানুষের কাছ থেকে শুনেছেন নানা কটু কথা। এমন শারীরিক সমস্যা নিয়ে পড়ালেখা করা প্রায় অনিশ্চিতই ছিল। তারপরও থেমে যাননি তিনি। ইস্পাত কঠিন মনোবল, অদম্য উৎসাহ, প্রবল ইচ্ছাশক্তি, একনিষ্ঠতা আর মায়ের সর্বাত্মক সহযোগিতার কাছে কোনো প্রতিবন্ধকতা বাধা হতে পারেনি। নিজ যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
রিফাতের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলার পিটিআই মোড়ে। তার মা রহিমা বেগম গৃহিনী এবং বাবা সাইদুর রহমান। বাবা ২০১৯ সালে মারা যান। তার বড় ভাই জোবায়ের রহমান একজন ফিল্যান্সার। পরিবারের চার সদস্যের মধ্যে রিফাত সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই তার ছিল পড়াশোনার প্রবল আগ্রহ। এতো প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও বাম হাতে লিখেই পঞ্চম শ্রেণিতে ৬০০ নম্বরের মধ্যে ৫৭৩ নম্বর পেয়ে বৃত্তি পান। অষ্টম শ্রেণিতেও আবারো বৃত্তি পান।
.png)
এরপর নীলমণিগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হোন। এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন রিফাত। ভর্তি পরীক্ষা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাবির ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ১৪৪তম স্থান অধিকার করে নিজ যোগ্যতায় ভর্তি হোন আইন বিভাগে।
রিফাত বলেন, আমার শারীরিক সমস্যা নিয়ে লোকে নানা কথা বলত। প্রায়ই শুনতে হতো- ‘পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে কি করবে? তোমার বড় ভাই এমন ফলাফল করলে কিছু একটা হত। তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না।’ আমি এসব কথা মেনে নিতে পারিনি। নিজের জেদ থেকে পড়াশোনা করেছি। যাতে কিছু একটা করে দেখাতে পারি।
বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ধরমপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় মায়ের সঙ্গে থাকেন রিফাত। নিজে একাই চলাফেরা করতে পারেন না, তাইতো মাকে নিয়ে এসেছেন গ্রাম থেকে। তার বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকা অবস্থায় দুর্ঘটনায় মারা যায়। তার পেনশনের টাকায় কোনোরকম পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাসা ভাড়া, পড়াশোনার খরচ চালানো কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে মা-ছেলের।
রিফাত বলেন, এই প্রথম বাড়ির বাইরে আছি দুই মাস হলো। মাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। একা চলাফেরা করতে একটু সমস্যা হয়। বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটা দূরে তাই যাওয়া-আসা খুব সমস্যা হয়। অন্যদিকে রাস্তাও অনেক দুর্ঘটনা প্রবণ। দুই সপ্তাহ হলো বৈদ্যুতিক হুইলচেয়ার ব্যবহার করছি। তাতে কিছুটা উপকার হচ্ছে। কিন্তু অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোতে একাই যেতে পারি না। ভবনের সিঁড়িগুলো হুইলচেয়ারে উঠার মতো নয়। তাই সিঁড়িতে উঠতে বন্ধুদের সহযোগিতা নিতে হয়। বন্ধুরা আমাকে ক্লাসে যেতে সাহায্য করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি আমাকে হলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আমার জন্য খুব উপকার হয়।
বাবার সম্পর্কে জানতে চাইলে আবেগ আপ্লুত হয়ে রিফাত বলেন, আমাদের বাড়ি হাইওয়ে রাস্তার পাশেই। তখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। আমার বাবা ছিলেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার অবসরে যাওয়ার বাকি ছিল পাঁচ বছর। একদিন একটা ট্রাক হঠাৎ করে আমাদের ঘরের দেয়াল ভেঙে বাড়িতে ঢুকে পড়ে। দেয়ালে চাপা পড়ে বাবা মারা যায়। ঐ ঘটনায় আমরা মামলা করেছিলাম। কিন্তু ট্রাক চালকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
রিফাত বড় একটি স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছেন আইন বিভাগে। তার স্বপ্ন একদিন সে দেশের বড় আইনজীবী হবেন। সেদিন মামলা করেও বাবার হত্যার বিচার পাননি। আইনজীবী হয়ে বাবার হত্যার সঠিক বিচার এনে দেবেন মাকে। রিফাত বলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখি একদিন বড় আইনজীবী হব। আইনজীবী হয়ে আমার বাবার হত্যার সঠিক বিচার মাকে এনে দিব।’
আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক হাসিবুল আলম প্রধান বলেন, তার সম্পর্কে আমি জানি এবং তাকে চিনি। ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে পর থেকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত তার খোঁজখবর রাখছি। তার বন্ধুরা ও বিভাগের সবাই যাতে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয় সে নির্দেশনা দিয়েছি। তার যেকোনো সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সে একজন অদম্য মেধাবী। আমার আইন বিভাগে মেধা তালিকায় সে ভর্তি হয়েছে। তার ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল হোক এই কামনা করি।