ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

বাদাম মামা মহুবার আলী: ৩০ বছরে বেরোবি স্মৃতির সাক্ষী

ফারহান সাদিক সাজু, বেরোবি
প্রকাশিত: ১৭:৩৮, ১৯ নভেম্বর ২০২৩
বাদাম মামা মহুবার আলী: ৩০ বছরে বেরোবি স্মৃতির সাক্ষী
মহুবার আলী। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘প্রায় ৩০ বছর হইল এই ক্যাম্পাসে বাদাম বেচি। আগে ভালোই বিক্রি হতো। তবে এখন- সারা দিনে দুই কেজি বাদামও শ্যাষ হয় না। ছাত্র-ছাত্রীগুলারে জোর করি দিতে চাইলেও নেয় না। ওমরা (ওরা) তো বোঝে না এই বাদাম কয়টা বেচা না হইলে না খায়া থাকা লাগে!’ কথাগুলো বলছিলেন মহুবার আলী নামের সত্তোরোর্ধ্ব বয়সের একজন বাদাম বিক্রেতা। 

সবুজে মোড়ানো ক্যাম্পাসে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) পরিচিত মুখ মহুবার আলী। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলেও নিয়মিত বাদাম নিয়ে আসেন তিনি। কখনো অনায়াসেই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেন, আবার কখনো তাকে পড়তে হয় প্রহরীদের বাধার মুখে। ক্যাম্পাসের মনোরম পরিবেশ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতায় ভালোই কাটছিল তার দিন। তবে ইদানীং তার সবকিছুই যেন এলোমেলো। বয়স হয়েছে, ঔষধ-বাজারের খরচ বেড়েছে। তবে আয় বাড়ার বদলে আরো কমেছে। ফলে বিষণ্ণমনে প্রতিদিন ঘরে ফেরে সে। 

ঘড়ির কাটায় তখন দুপুর ১টা। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করছিলেন বাদাম কেনার জন্য। প্রখর রোদে চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ মহুবার আলীর। জানালেন, আজ দুই কেজি বাদাম নিয়ে বের হয়েছেন। অর্ধেকেরও কম বিক্রি হয়েছে। এখান থেকে তার লাভের অঙ্ক দাঁড়াবে দেড় থেকে দুই শ’ টাকা। পরিবার পরিজন এখন শুধু তার স্ত্রী। ছেলে নেই বলে সংসারের হালটা তাকেই সামলাতে হয়। 

Advertisement

মহুবার আলী রংপুর নগরীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন উত্তর মমিনপুর চানকুটি গ্রামে। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে বাদামের ঝুড়ি কাঁধে টানছেন। প্রথমে রংপুর কাছারি এলাকায়, পরে গত ১৫ বছর ধরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কারমাইকেল কলেজ এলাকায় বাদাম, ছোলা, বুট বিক্রি করে সংসার চালান। 

মহুবার আলী। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মহুবার আলী জানালেন, চার কন্যা সন্তানের বাবা তিনি। মেয়েদের সবার বিয়ে দিয়েছেন। সারা দিনে যে আয় হয় এর মধ্যে প্রতিদিন তার এবং স্ত্রীর জন্য ৫০ থেকে ৬০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। একদিকে বয়সের ভার অন্য দিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। তাই ক্ষুদ্র আয়ের সংসারে কোনো দিন খেয়ে আবার কোনো দিন না খেয়ে কেটে যায় তাদের। 

মহুবার আলী বলেন, ‘আগে যা বেচাবিক্রি হতো সেটা দিয়া কোনো চলতো। এখন সবকিছুর দাম বাড়ছে। এখন যে ট্যাকা লাভ হয়, তাতে খুব হিসাব করি খাবার খাওয়া লাগে।’ 

বয়সের কারণে আর চলাফেরা স্বাভাবিক নেই মহুবার আলীর। অল্পেই হাঁপিয়ে যান। জানালেন, বয়স বাড়লেও দরিদ্রদের জন্য সরকারি কোনো সুবিধা বা ভাতা তিনি পান না। তবে ভিক্ষাবৃত্তি করবেন না বলেই, কষ্ট করে এই কাজ করেন তিনি। 

মহুবার আলী আরো বলেন, ‘বয়স বাড়ছে, ঠিকঠাক মতো আর চলাফেরাও করবার পারি না। প্রতিদিনও ক্যাম্পাসে আসা হয় না। মানুষের কাছে হাত পাততে পারি না, লজ্জা করে। সে জন্য কষ্ট হলেও নিজে কামাই করে খাই।’ 

তিনি জানান, প্রায় ৩০ বছর ক্যাম্পাসে চলাফেরা। চোখের পাতায় দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো। মনে পড়ে যায়, বিভিন্ন ধরনের খেলার টুর্নামেন্টের কথা। সেই দিনগুলোর অনেক মজার ছিল। সেসব দিনে বেশ বিক্রি হতো। তবে এখন আর সেই আয়োজন-উৎফুল্ল নেই। ছাত্রছাত্রীরাও এখন রেস্তরাঁয় খায়, বাদাম খুব একটা চলে না। 

তার বিষয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তারা জানান, ক্যাম্পাসে তারা মহুবার আলীকে প্রায়ই দেখেন বাদাম বিক্রি করতে। বাদাম কেনার জন্য এক রকম বায়না ধরেন। বৃদ্ধ বয়সেও এমন পরিশ্রম করতে দেখলে খারাপ লাগে তাদেরও।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!