কোরবানির জন্য সুস্থ পশু চেনার উপায়
১। কোরবানির পশু ক্রয়ের জন্য একজন ক্রেতাকে প্রথমেই পশুর বয়সের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। গরু, মহিষ, উট জাতীয় বড় পশুর জন্য দুই বছরের অধিক বয়সী এবং ছাগল, ভেড়া, দুম্বা জাতীয় ছোট পশুর ক্ষেত্রে এক বছরের অধিক বয়সী পশু নির্বাচন করতে হবে।
.png)
গরু, মহিষের ক্ষেত্রে নিচের পাটির দুটি বা ততোধিক স্থায়ী দাঁতওয়ালা পশু এবং একইভাবে ছাগল, ভেড়া, দুম্বার ক্ষেত্রেও নিচের পাটির স্থায়ী দুটি বা ততোধিক দাঁতওয়ালা পশু ক্রয় করতে হবে।
শিংওয়ালা গরুর ক্ষেত্রে শিংয়ের খাঁজ বা রিং দেখে গরুর বয়স বোঝা যায়। দেশি গরুর শিংয়ে সাধারণত ৩ বছর বয়সে প্রথম একটি গোলাকৃতি রিং দৃষ্টিগোচর হয়। বিদেশি গরুর ক্ষেত্রে প্রথম রিংটি ২ বছর বয়সে দেখা যায়। পরবর্তীতে দেশি/বিদেশি উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রতি ১ বছর পর পর ১টি করে গোলাকৃতি রিং দৃষ্টিগোচর হয়।
২। পশুকে অবশ্যই বাহ্যিক ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। যেমন: একটি বা দুইটি শিং ভাঙ্গা, লেজ ভাঙ্গা, পা ভাঙ্গা, কান কাটা, গায়ে বা ক্ষুরে ক্ষত, এক বা একাধিক চোখ কানা পশু কুরবানির জন্য উপযুক্ত নয়।
পশুর চোখের সামনে আচমকা হাত নাড়িয়ে চোখের অন্ধত্ব যাচাই করে নেওয়া যেতে পারে।
৩। পশুর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকবে। অতিরিক্ত গরম কিংবা ঠাণ্ডা থাকবে না। শরীরে জ্বর আছে কিনা সেটা জানার জন্য কানের গোরায় হাত দিলে বোঝা যাবে। শরীরে জ্বর থাকলে এখানে তাপমাত্রা সামান্য বেশি হওয়ার পরিবর্তে অতিরিক্ত গরম থাকবে।
৪। গায়ের চামড়ার রং উজ্জ্বল হবে এবং কোনো দাগ থাকবে না।
৫। পিঠের কুজ মোটা ও টান টান থাকবে।
৬। নাকের উপরের অংশ (মাজল) বিন্দু বিন্দু ঘামে ভেজা থাকবে।
৭। সামনে খাবার দিলে টেনে নিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করবে এবং অবসরে জাবর কাটবে।
৮। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে। নাকের সামনে হাত রেখে শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিকতা পরীক্ষা করে নেওয়া যেতে পারে।
৯। চোখ উজ্জ্বল ও স্বাভাবিকভাবে ভেজা থাকবে।
১০। কান ও লেজ দিয়ে মশা-মাছি তাড়াবে। কিছুক্ষণ পরপর নড়াচড়া করবে।
১১। পশুটি চঞ্চল থাকবে এবং চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
১২। সুস্থ গরুর চামড়ার ওপর দিয়ে কয়েকটি পাঁজরের হাড় বোঝা যাবে।
১৩। পশুর প্রস্রাব ও গোবর স্বাভাবিক আছে কিনা সেটি যাচাই করে দেখতে হবে।
১৪। কোরবানির জন্য গর্ভবতী গাভী কোনোভাবেই উপযোগী নয়। তাই কেনার আগে গাভীটি গর্ভবতী কিনা সেটি যাচাই করে দেখুন। সাধারণত গর্ভবতী গাভীর পেট ও ওলান স্ফীত থাকে। নিজে না বুঝতে পারলে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানে পরামর্শ নিন।
স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগকৃত গরু চেনার উপায়
১। স্টেরয়েড (যেমন: ডেক্সামিথাসন) ট্যাবলেট বা ইনজেকশন দেওয়া গরু খুবই শান্ত হবে। ঠিকমতো চলাচল করতে পারবে না।
২। স্টেরয়েড দেওয়া গরু অল্পতে হাঁপিয়ে যাবে; ক্লান্ত হয়ে পড়বে।
৩। উরুতে অনেক মাংস মনে হলেও সেটি হবে তুলতুলে নরম। স্টেরয়েডমুক্ত গরুর মাংস শক্ত থাকবে।
৪। হরমোন দেওয়া গরুর পুরো শরীরে পানি জমে (বিশেষ করে চামড়ার নিচে) মোটা দেখাবে ও থল থল করবে। হাত দিয়ে শরীরে চাপ দিলে দেবে যাবে এবং দেবে যাওয়া অবস্থা অনেকক্ষণ স্থায়ী হয়। অপরদিকে হরমোনমুক্ত গরুর শরীরে চাপ দিলে দেবে যাবে না। সামান্য দেবে গেলেও সেটি সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যাবে। এ ধরনের গরুর প্রস্রাবের পরিমাণও কমে যায়।
৫। হরমোন প্রয়োগ করা গরুর মুখে অতিরিক্ত ফেনা বা লালা থাকতে পারে।
৬। সাধারণত স্টেরয়েড দেওয়া ষাঁড়ের অণ্ডকোষ ষাঁড়ের শরীরের সাইজের তুলনায় বেশ ছোট হবে।
বি.দ্র. দূরদূরান্ত থেকে আগত এবং নানাবিধ ধকল সহ্য করা গরু অনেক সময় হরমোন প্রয়োগকৃত গরুর মতো দুর্বল মনে হতে পারে। তাই বিষয়টি সতর্কতার সাথে যাচাই করা উচিত।
পশুর পরিবহন ও কোরবানির আগ পর্যন্ত যত্ন:
১। গন্তব্যস্থান কাছে হলে কোরবানির পশুটিকে হাঁটিয়ে নিবেন। দূরে হলে যানবাহনে (চারপাশে ঘেরা মিনি ট্রাক বা পিকআপ) পরিবহন করুন। গাড়ির ফ্লোরে নরম বিছানা বিছিয়ে দিতে হবে।
২। সাধারণত বিকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে পরিবহন করা উত্তম। এতে ধকল কম হবে। পরিবহনের সময় অতিরিক্ত গরম, বৃষ্টি, ধুলা ও দূষণ পরিহার করতে হবে।
৩। গাড়িতে ওঠানোর সময় ঢাল বা উপযোগী ভ্রাম্যমাণ সিঁড়ি ব্যবহার করুন। এতে পশুটি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
৪। গাড়িতে পশু উঠানোর অন্তত ১০-১৫ মিনিট পরে গাড়ি চালু করুন। নামানোর সময় গাড়ি বন্ধ করার ১০-১৫ মিনিট পরে পশুকে নামান।
৫। আপনার কোরবানির পশুটিকে শুষ্ক, খস খসে, পরিষ্কার মেঝেযুক্ত এবং ছাউনি দেওয়া জায়গায় রাখবেন।
৬। বাড়িতে আনার পর সাথে সাথেই খাবার/পানি দিবেন না।
৭। বাড়িতে আনার পর ১৫-৩০ মিনিট সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিতে দিন। তারপর নলকূপের স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি খেতে দিন, সঙ্গে অল্প পরিমাণ খাদ্য দিতে পারেন।
৮। গরম থেকে বাঁচাতে কোরবানির পশুর ঘরে সিলিং ফ্যান বা স্ট্যান্ড ফ্যানের ব্যবস্থা রাখুন। এমন জায়গায় রাখুন, যেন পর্যাপ্ত আলো বাতাস পায়। নিয়মিত (প্রতিদিন সকালে) গোসল করান।
৯। অতি উৎসাহী হয়ে গবাদি পশুকে শুধু ভাত, জাউ, খুদের ভাত খেতে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন ৷ এতে কোরবানির পশুটির ব্লট বা পেটফুলা হতে পারে ; এসিডোসিস হতে পারে; এমনকি মারা যেতে পারে।
১০। কোরবানির পশুর সামনে সবসময় পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ পানি রাখুন।
কোরবানির গরুর খাবার দুই প্রকার
প্রথমটি আঁশজাতীয়: খড় বা কাঁচা ঘাস
প্রতি ১০০ কেজি ওজনের গরুর জন্য দৈনিক আঁশজাতীয় খাবার:
খড়: ১-১.৫ কেজি + কাঁচা ঘাস: ২.৫-৩ কেজি
*কাঁচা ঘাস না খাওয়াতে পারলে শুধু খড় ২-২.৫ কেজি
*খড় না খাওয়াতে পারলে শুধু কাঁচা ঘাস ৫-৬ কেজি
(এই ফরমুলা ব্যবহার করে হিসাব করে আঁশজাতীয় খাবার দিতে হবে)
দ্বিতীয়টি দানাদার খাদ্য: গম/ধান/ছোলার ভুসি, চালের কুড়া, সরিষার খৈল, লবণ ইত্যাদি।
প্রতি ১০০ কেজি ওজনের গরুর জন্য দৈনিক ১.৫-২ কেজি দানাদার খাদ্যের মিশ্রণ খাওয়াতে হবে।
(এই ফরমুলা ব্যবহার করে হিসাব করে দানাদার খাবার দিতে হবে )
কোরবানির ছাগলের খাবার: কাঁচা ঘাস +পর্যাপ্ত পরিমাণ দানাদার খাদ্য (০.৫-১ কেজি প্রতিদিন)+ কাঁঠাল পাতা, কলার পাতা, কলার খোসা ইত্যাদি।
প্রতি কেজি দানাদার খাদ্যের মিশ্রণের নমুনা:
ক) গমের ভুসি ৩৫০ গ্রাম খ) চালের কুড়া ২৫০ গ্রাম গ) ছোলার ভুসি/খেসারি ২০০ গ্রাম ঘ) সরিষার খৈল ১৮০ গ্রাম ঙ) লবণ ২০ গ্রাম -- মোট ১ কেজি।
১১। পরিবহন কিংবা অন্যান্য ধকল কাটিতে উঠতে আপনার কোরবানির পশুটিকে স্যালাইনযুক্ত কিংবা মাল্টি ভিটামিন ও মিনারেল মিশ্রিত পানি খাওয়াতে পারেন। ধকলের কারণে পশুর শরীরের উপকারী জীবাণুর সংখ্যা কমে গেলে হজমে সমস্যা হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রোবায়োটিক খাওয়ানো যেতে পারে।
১৩। কোরবানির ১০-১২ ঘণ্টা আগে কোরবানির পশুকে পানি ছাড়া সব খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন। এতে জবাইয়ের পর চামড়া ছাড়ানো সহজ হয়।
স্বাস্থ্য পরামর্শসহ উদ্ভূত যেকোনো সমস্যায় একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিন।
লেখক
ডা. মো. মেহেদী হাসান (নান্নু)
সেকশন অফিসার
সার্জারি অ্যান্ড থেরিওজেনোলজি বিভাগ
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়