জাতীয় পর্যায়ের ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এ চারটি উদ্ভাবনী গবেষণা প্রকল্প নিয়ে অংশ নিয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর (বেরোবি)। রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এ মেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের উদ্ভাবনগুলো প্রদর্শন করা হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি, কার্বন ব্যবস্থাপনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—চারটি ভিন্ন ক্ষেত্রে তৈরি এসব প্রকল্প বাস্তব জীবনে প্রয়োগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যবহারেরও সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
.png)
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ছিল মেলার দ্বিতীয় দিন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ১২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ মেলা চলবে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবকেরা অংশ নিয়েছেন।
মেলায় বেরোবির প্রদর্শিত চার প্রকল্প হলো—‘Silicon Based Perovskite Solar Cells’, ‘AgriTrace BD’, ‘Carbon Setu’ এবং ‘DeshGuard AI’।
‘Silicon Based Perovskite Solar Cells’ প্রকল্পটি সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সৌরশক্তির আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
‘AgriTrace BD’ প্রকল্পে কৃষি খাতের তথ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষক, উৎপাদন ও কৃষিপণ্যের তথ্যকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার আওতায় এনে কৃষি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক করার লক্ষ্য রয়েছে এ উদ্ভাবনে।
কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশগত বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘Carbon Setu’। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং কার্বন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে ‘DeshGuard AI’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি উদ্ভাবনী প্রকল্প। প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপত্তা ও বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে এতে।
মেলায় বেরোবির প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী। এ সময় তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের উদ্ভাবনী কার্যক্রমের খোঁজ নেন।
উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, ‘আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় বদ্ধপরিকর। ল্যাবরেটরির নতুন নতুন আবিষ্কার যখন বাণিজ্যিক বাজারে জায়গা পাবে, তখনই দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘এই ইনোভেশন ফেয়ার আমাদের তরুণ গবেষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা ও নেটওয়ার্ক তৈরির অনন্য সুযোগ। গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি এসব উদ্ভাবন যেন বাস্তব জীবনে মানুষের কাজে লাগে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও গবেষক প্রফেসর ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির কোনো সমন্বয় নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিষয়টি সমন্বয় করার চেষ্টা করছেন। এই সমন্বয় হলে বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্রে বিশাল পরিবর্তন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সমন্বয়হীনতার কারণে বাংলাদেশের সমসাময়িক অনেক দেশ বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে গেছে, যেটা বাংলাদেশ করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে, কিন্তু সেই গবেষণার ফল শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।’
তার ভাষ্য, গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা গেলে দেশের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতে বড় পরিবর্তন আসবে। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেওয়া গেলে গবেষণার সুফল সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেরোবির রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর ড. মো. ফেরদৌস রহমান, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মিজানুর রহমান, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রফেসর ড. মো. এমদাদুল হক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. কামরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ের এ মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বেরোবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উদ্ভাবন বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোকে আরও উন্নত ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ইনোভেশন ফেয়ারে প্রদর্শিত বেরোবির চার প্রকল্প শুধু প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, শিল্পের চাহিদা পূরণ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনে ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন জাতীয় পর্যায়ে আরও দৃশ্যমান হওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতেও অবদান রাখবে।