নারীর প্রতি বিদ্বেষ কমাতে এবং ক্ষতিকর সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে টিকটকে আলোচনা করেন সুলতানা (ছদ্মনাম)। তার পরিচিত একজনকে হেনস্তা করতেন হাসান সাইদ। এর প্রতিবাদ করায় সুলতানাকেও হুমকিধমকি দেন সাইদ। টিকটকে হাসান সাইদের ফ্যান-ফলোয়ারও সুলতানাকে হেনস্তা করতে থাকেন।
সুলতানা জানান, পরবর্তী দুই বছর বার বার তাকে হেনস্তা করেন সাইদ। এ ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।
.png)
এক নারীর বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, হাসান সাইদ সামাজিক মাধ্যম থেকে তাদের ছবি ডাউনলোড করেন। এরপর টিকটকে গিয়ে সেই নারীর ছবি দিয়ে টিটকারি করে। কখনো ধর্ষণ এবং হত্যার হুমকিও দিয়ে থাকেন।
এদিকে বিতর্কিত টিকটকার হাসান সাইদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে বিবিসি। তবে তার পক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি।
সাইদের শিকার ভুক্তভোগী নারী-
যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন মাসুমা। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি টিকটকে রান্নাবান্না দেখান এবং সেখানে তার একটি রেস্তোরাঁও আছে। একদিন হাসান সাইদ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মাসুমার টিকটক লাইভে অতিথি হিসেবে আসতে চান। মাসুমা তাকে নাকচ করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সাইদ। মাসুমাকে ‘ঝুলিয়ে’ দেওয়ার হুমকি দেন তিনি।
মাসুমা এ তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন টিকটকে, কিন্তু এরপর তাকে টার্গেট করেন সাইদ। তিনি আমাকে নিয়ে ভিডিও বানায় আর বলে আমি একজন যৌনকর্মী। সাইদের ফলোয়াররা সেই ভিডিও শেয়ার করতে থাকে। এক পর্যায়ে টিকটক তা সরিয়ে নেয়, কিন্তু মাসুমা বলেন, ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। তার ব্যবসা এবং পেশা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি পুলিশের কাছে যান, কিন্তু তারাও কিছু করতে পারেনি।
সাইদকে থামানোর প্রথম পদক্ষেপ-
গত বছর জানুয়ারিতে স্ট্র্যাটফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা কামরুল ইসলামের নজরে আসে হাসান সাইদের টিকটক অ্যাকাউন্ট। এমন ভয়াবহ সব টিকটক কেউ তৈরি করতে পারে, তিনি তা ভাবতেও পারেননি। বন্ধুবান্ধবদের থেকে তিনি জানতে পারেন, যুক্তরাজ্যে বসবাসকারীদের বেশ কয়েক বছর ধরেই টার্গেট করে আসছে সাইদ। প্রচুর ফ্যান-ফলোয়ার রয়েছে তার, এ কারণে সাইদ ধরে নিয়েছেন তিনি আইনের ঊর্ধ্বে। তাকে থামাতে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন কামরুল।
প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে হাসান সাইদের সাথে যোগাযোগ করে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন কামরুল। এতে হিতে বিপরীত হয়। কামরুল ও তার পরিবারের ছবি নিয়ে টিকটকে ছড়িয়ে দেন সাইদ, সরাসরি তার মা ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দিতে থাকেন। এ পর্যায়ে পুলিশ এবং টিকটক কর্তৃপক্ষকে ব্যাপারটি জানান কামরুল। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, টিকটক বিষয়টিকে একেবারেই আমলে নেয়নি তখন। তারা জানায়, এই ভিডিওতে তাদের কমিউনিটি গাইডলাইনে কোনো ভায়োলেশন দেখে না তারা।
এরপর প্যারিসে যুক্তরাজ্যের দূতাবাসে যোগাযোগ করেন কামরুল। সেখানে একজন ফরাসি আইনজীবীর দ্বারস্থ হন তিনি। হাসান সাইদ ফরাসি আইনে লঙ্ঘন করে ধর্ষণ এবং সহিংসতার হুমকি দিয়েছেন, এ মর্মে তিনটি মামলা করা হয়। কিন্তু এ মামলাগুলো খুবই ধীরগতিতে চলছে।
অবশেষে সাইদের প্রতি ব্যবস্থা-
এদিকে যুক্তরাজ্যের পুলিশি প্রক্রিয়াও ধীর। প্রায় আড়াই মাস সময় নিয়ে তারা কামরুলের অভিযোগ ইন্টারপোল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। সবশেষে ২০২৩ সালের এপ্রিলে কামরুল যুক্তরাজ্যের ইনফরমেশন কমিশনার'স অফিস (আইসিও) এর দ্বারস্থ হন। এখান থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হয়। টিকটক, ফেসবুক, এবং ইউটিউবকে হাসান সাইদের কনটেন্ট সরিয়ে নেয়ার জন্য সাতদিন সময় দেয়া হয়।
এতদিনে এসব প্ল্যাটফর্মের টনক নড়ে। টিকটক হাসান সাইদের অ্যাকাউন্ট ব্যান করে দেয়, তার ভিডিওগুলো সরিয়ে নেয়। ইউটিউব তার চ্যানেল মুছে ফেলে। ফেসবুক থেকেও তার কনটেন্ট সরিয়ে নেয়া হয়, তার পেইজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করে চলেছেন। হাসান সাইদ বা অন্যান্য টিকটকারের হেনস্থার শিকার অনেক যুক্তরাজ্য প্রবাসী নারী তার সাথে যোগাযোগ করেছেন। এমন ভয়াবহ হেনস্থায় অনেকে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথাও ভেবেছেন। প্রবাসী সুলতানা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীরা নিজেদের কথা বলবেন, অনেক বাংলাদেশি পুরুষ তা পছন্দ করেন না। এ কারণে তারা নারীদের হেনস্থার মাধ্যমে চুপ করিয়ে রাখতে চান। এসব ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের আরও নজর দেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তবুও দমে যাননি সাইদ-
কামরুল জানান, এতকিছুর পরেও হাসান সাইদ দমে যাননি। টিকটকে নতুন নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে কামরুলের পরিবারকে হেনস্তা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন হাসান সাইদ। এ বিষয়ে প্রতিদিনই কামরুল টিকটকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, কিন্তু সবসময় দ্রুত পদক্ষেপ নেয় না প্ল্যাটফর্মটি।