ডিম- প্রাণিজ আমিষ, মেধাবি প্রজন্ম ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির সহায়ক
- দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ২,৪৪৬.৫ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়, যা দিনে ৬ কোটিরও বেশি।
- জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের বছরে ন্যূনতম ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন।
- বিজ্ঞানীরা ডিম কে একটি ‘পরিপূর্ণ খাদ্য’ বা কমপ্লিট ফুড বা সুপার ফুড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
- ১০০ গ্রাম খাসির মাংস থেকে যে প্রোটিন পাওয়া যায়, সেই একই পরিমাণ প্রোটিন মেলে ৪টি ডিম থেকে।
মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠণে এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে এই পোল্ট্রি শিল্প। প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস হলো ডিম। স্বল্প মূল্যে প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা মেটাতে ডিমের জুড়ি নেই। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতেও ডিমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিম থেকে সাধারণত প্রায় ৭৭ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। ডিম উচ্চমানের আমিষের পাশাপাশি আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফলেট, দস্তা ও ভিটামিন ডির উৎস। এতে চোখের সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় লুটিন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো উপাদানও রয়েছে।
ডিম শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে এবং বিপাকীয় কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। এতে ওমেগা-৩-এর মতো প্রয়োজনীয় চর্বিও পাওয়া যায়। সহজলভ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের খাদ্যতালিকায় ডিম গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মুরগির ডিম সবচেয়ে বেশি খাওয়া হলেও হাঁস, কোয়েল ও রাজহাঁসের ডিমও জনপ্রিয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, চর্বি একেবারে খাওয়া ভালো নয়, কথাটা সঠিক নয়। যা ভালো নয়, তা হলো সম্পৃক্ত চর্বি এবং ট্রান্সফ্যাট। গরু খাসির মাংসের জমাট চর্বি, ঘি, মাখন, ক্রিম, পেস্ট্রি ও ডিপ ফ্রাই খাবারে আছে এ ধরনের ক্ষতিকর চর্বি। বাদ দিতে হলে এগুলো বাদ দিন। আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানে কেবল অস্বাস্থ্যকর খাবার বাদ দেওয়া নয়।
আজ ৯ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার বিশ্ব ডিম দিবস পালিত হচ্ছে। বিশ্ব ডিম উৎপাদকদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড এগ অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রোটিন দ্যাট পাওয়ার্স অ্যান্ড প্রোটেক্টস’, যার অর্থ ‘শক্তি জোগায়, সুরক্ষা দেয় প্রোটিন’। ডিমে থাকা উচ্চমানের প্রোটিন এবং শরীরের বৃদ্ধি, পেশির রক্ষণাবেক্ষণ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখায় এর ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে এবারের আয়োজনে।
৩০তম বার্ষিকী: ১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের (আইইসি) উদ্যোগে প্রথম বিশ্ব ডিম দিবস চালু হয়, সে হিসেবে এবার দিবসটির ৩০ বছর পূর্তি হচ্ছে।
বিশ্ব ডিম দিবসের মূল উদ্দেশ্যও ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এর গুরুত্ব তুলে ধরা। এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষ্যে এবারও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন (বাংলাদেশ শাখা) এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সেমিনার এবং বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় ডিম গুরুত্বপূর্ণ প্রাণিজ আমিষের উৎস। মাছ, মাংস ও দুধের মতো খাবারের পাশাপাশি ডিমও পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের বৃদ্ধি, কিশোর-কিশোরীদের বিকাশ এবং বয়স্কদের পেশির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকা জরুরি।
আমরা জানি, প্রাণিজ প্রোটিনের মধ্যে ডিম অন্যতম। ডিমে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদরোগসহ অনেক রোগের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকরী। সাধারণ হিসেবে ১০০ গ্রাম খাসির মাংস থেকে যে প্রোটিন পাওয়া যায়, সেই একই পরিমাণ প্রোটিন মেলে ৪টি ডিম থেকে।

- হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নারীদের আ্যডোলেশন পিরিয়ডে বা পরবর্তীকালে সপ্তাহে কমপক্ষে ৬টি ডিম খেলে ব্রেস্ট ক্যানসারের সম্ভাবনা প্রায় ৪৪ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিজ্ঞানীরা ডিম কে একটি ‘পরিপূর্ণ খাদ্য’ বা কমপ্লিট ফুড বা সুপার ফুড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ডিমের মত এত স্বল্পমূল্যের প্রাণিজ আমিষ দ্বিতীয়টি নেই। মা, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের জন্য ডিম একটি আদর্শ খাদ্য। আমরা জানি, পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুরা রাতকানা, রক্ত স্বল্পতা, হাড্ডিসার হয়ে যাওয়া ইত্যাদি রোগে ভোগে। তাই মেধাবী জাতি গড়তে হলে ডিম খাওয়ার পরিমান বাড়াতে হবে।
দেশে বর্তমানে মাথাপিছু বছরে ১৩৭টি ডিমের প্রাপ্যতা রয়েছে। তবে পোলট্রি ফিড, বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় ডিম উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে খামারি পর্যায়ের বিক্রয়মূল্য এবং খুচরা বাজারের মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় প্রান্তিক খামারিরা লোকসানে পড়ছেন। এর মধ্যেই ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ২০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার ও খাত সংশ্লিষ্টরা কাজ করছে।

পোলট্রি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) জানিয়েছে, দেশের মানুষের জন্য উৎপাদনের এই পরিমাণ ডিমের সরবরাহ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মাথাপিছু প্রাপ্যতার হিসাব বলছে, পুষ্টির চাহিদা বিবেচনায় আরো উৎপাদন প্রয়োজন। বিশেষ করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং শিশু-কিশোরদের পুষ্টি চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিমের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।
মাথাপিছু ডিম ব্যবহারে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে মেক্সিকো—বছরে গড়ে ৪০৯টি। জাপানে এ সংখ্যা ৩৩৭টি এবং নেদারল্যান্ডসেও ডিমের ব্যবহার অনেক বেশি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বছরে গড়ে প্রায় ২৭০ থেকে ৩০০টি ডিম ব্যবহূত হয়।
কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পাশাপাশি চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ মাংস ও আমিষের যোগানদাতা হিসেবেও অবদান রাখছে- পোল্ট্রি শিল্প। ভুট্টা ও সয়াবিনের সমন্বয়ে অর্গ্যানিক পদ্ধতিতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে এ শিল্পের খাবার। ফলে আমিষের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদনও।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) সূত্রে জানা যায় বাংলাদেশে ডিমের যে চাহিদা তা অনেকটাই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। আশার খবর হলো- এই শিল্পের উদ্যোক্তারা আবারো পোল্ট্রি পণ্য রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডিমের খোসার ওপর সু-কারুকার্য করা কিংবা ঘর সাজাতে ডিমের খোসার ব্যবহার শুরু হচ্ছে।
এ খাত সংশ্লিষ্টদের নিরবিচ্ছিন্ন ভুমিকার ফলে দেশ এখন মুরগির ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এমনকি দেশের ডিম ও মাংসের শতভাগ চাহিদাপূরণ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছে। ফলে দেখা দেখা দিয়েছে রফতানির সম্ভাবনাও।
ডিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ডিমের উৎপাদন ছিল এক হাজার ৪৯৩ কোটি ৩১ লাখ। প্রায় এক দশকের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ৫০৯ কোটি ৪১ লাখ। উৎপাদন বৃদ্ধির হার প্রায় ৬৮ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে সেটি ২০৮টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ আগামী চার বছরে মাথাপিছু প্রাপ্যতা প্রায় ৬৮টি বাড়াতে হবে।
জানা গেছে, ২০০৫ সালের আগেও দেশের চাহিদা মিটিয়ে ডিম বিদেশে রপ্তানি হতো। কিন্তু ২০০৭ ও ২০০৯ সালে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ায় পোলট্রি শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে। বার্ড ফ্লু আঘাত হানায় ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের (ওআইই) শর্তের কারণে পোল্ট্রির রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ধকল কাটিয়ে আবারো বাংলাদেশ থেকে ডিম রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তারা।

- বিপিআইসিসি সূত্রে জানা গেছে, আগে হ্যাচিং ডিম আমদানি করতে হতো। এখন বাংলাদেশে গ্রান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম আছে। প্যারেন্টস্টক বা পিএস ফার্মের সংখ্যা ছোট-বড় মিলে প্রায় ৮০টি। আশার খবর হচ্ছে এখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই দেশের হ্যাচিং ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে।
আধুনিক হ্যাচারিগুলোতে যান্ত্রিক উপায়ে সপ্তাহে এক কোটি ১০ লাখেরও বেশি ডিম ফোটানো হয়। মুরগি পালনের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। খাবার ও পানি সরবরাহ, ডিম সংগ্রহ সবকিছু স্বয়ংক্রিয় উপায়ে করা হয়। ফলে ভোক্তারা সহজেই স্বাস্থ্যকর-জীবাণুমুক্ত ডিম ও মুরগির মাংস পাচ্ছেন।
- জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, সুস্থ থাকার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বছরে গড়ে ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে মাত্র ৪৫-৫০টি।
তবে আশার খবর হলো ডিম শুধুমাত্র পুষ্টি উপাদেয় খাবার হিসেবে অসুখ অসুস্থতায় অথবা অতিথি আপ্যায়নে নয়- প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ডিমের গুরুত্ব অনেকাংশে বেড়েছে।
পিতা-মাতারা সন্তানদের সুস্বাস্থ্য ও মেধাবিকাশের জন্য ডিম দিচ্ছেন নিত্যদিন। নিজেদের সুস্থ্যতায় সকালের নাস্তায় ডিম খাচ্ছেন অনেকে। ডিনারে বা লাঞ্চেও ডিমের মুখরোচক রন্ধনশৈলী জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বয়স্ক ও সন্তানসম্ভবা মায়েদেরও ডিম খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
এভাবে দেশের মানুষের মাঝে ডিম সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। সন্তানের স্কুল টিফিনে ডিম দিয়ে তৈরি রকমারি নাস্তা প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে সরকারের স্কুল ফিডিংয়ে ডিম অর্ন্তভুক্ত করলে ডিমের ব্যবহার ও চাহিদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এবিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ করতে পারে।
এস এম মুকুল, কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক