ঢাকা,  রোববার   ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

[ ফিচার ]

পরিযানের দীর্ঘ পরিক্রমায় অনেক সহোদর হারায় পরিযায়ী পাখিরা

এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১০:২২, ১১ অক্টোবর ২০২৬
পরিযানের দীর্ঘ পরিক্রমায় অনেক সহোদর হারায় পরিযায়ী পাখিরা
পরিযায়ী পাখি প্রজাতিগুলোর সংরক্ষণে আমাদের আরো যত্নশীল হওয়া দরকার

পরিযায়ী পাখিদের মুক্ত পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে! সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও স্থানীয় গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৫% থেকে ৫১% পরিযায়ী পাখির প্রজাতি সংখ্যায় কমে যাচ্ছে। প্রতি ৯টি পরিযায়ী পাখির মধ্যে অন্তত ১টি প্রজাতি আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রকৃতিগতভাবেই পরিযায়ী পাখিদের শারীরিক গঠন অনেক শক্তিশালী। সাধারণত ৬০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিটার উঁচু দিয়ে উড়ে যায় পরিযায়ী পাখিরা। ছোট পাখিদের ঘণ্টায় গতি ৩০ কিলোমিটার। দিন-রাতে এরা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উড়তে পারে। বড় পাখিরা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার অনায়াসে উড়তে পারে। 

  • আশ্চর্যের বিষয়, এসব পাখি তাদের গন্তব্য স্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে। তার পরও প্রশ্ন থাকে পরিযায়ী পাখিরা হাজার হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ যাত্রায় কীভাবে পথ চেনে। 

বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রই পাখিদের পথ চেনায়। উপকূলরেখা, পাহাড় শ্রেণি, নদী, সূর্য, চাঁদ, তারার অবস্থান লক্ষ করে গন্তব্যের পথ খুঁজে নেয় পরিযায়ী পাখিরা। পারিযায়ীদের পথ চেনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ পাখিরা থাকে ঝাঁকের সামনের আর নতুনরা থাকে পেছনের দিকে।

নরসিংদী বার্ড ক্লাব \ Narsingdi Bird Club | Narsingdi

পরিযায়ী পাখিরা মনে করে, পৃথিবীর সব ভূখন্ড নিজেদের। হওয়াও উচিত তাই। কিন্তু পাখিদের কাছে পৃথিবী অখন্ড হলেও মানুষের পৃথিবী যে খন্ড খন্ড-বিখন্ড। এ কারণে অকারণ শত বাধা আর মানুষের পাতানো ফাঁদে জীবননাশের হুমকিতে অসংখ্যা পরিযায়ী প্রাণ। 

দূর দেশ থেকে আসত বলে আগে এদের ডাকা হতো ‘অতিথি পাখি’, আর এখন ‘পরিযায়ী পাখি’ বলে বিশ্বে তাদের পরিচয়। হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে দল বেঁধে পরিযায়ী পাখিরা আসে সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশে। ইংল্যান্ডের নর্থ হ্যামশায়ার, সাইবেরিয়া কিংবা অ্যান্টার্কটিকার তীব্র শীত থেকে বাঁচতে যে পাখিরা পাড়ি জমায় দক্ষিণের কম শীতের দেশে। 

অন্যভাবে বললে, শীত শুরুর আগেই পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো থেকে হাজার হাজার পাখি দল বেঁধে দক্ষিণ গোলার্ধ ও তার আশপাশের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলে সাময়িকভাবে আশ্রিত হয়। জানলে অবাক হবেন, জীবজগতের মধ্যে পাখিরাই সর্বাধিক পরিযায়ী। পাখি ছাড়া অন্য প্রাণীদের মাঝে এত ব্যাপক, বিস্তৃত ও দীর্ঘ পরিযানে ঘটনা নেই। 

গবেষণায় দেখা গেছে, পরিযায়ী পাখিরা আমাদের কাছে অতিথি বলে মনে হলেও আসলে তারা এখানে এসে ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকে। 

তাহলে একটানা নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বছরের প্রায় অর্ধেক সময় তারা পরিভ্রমণে এসে কাটায়। বছরের বাকি সময় তাদের যাত্রাপথে কাটে। সে হিসেবে পরিযায়ী পাখিদের নিজ দেশে খুব কম সময়ই কাটে বলা যেতে পারে। 

বছরের পর বছর এভাবে নিয়মিত পরিযানে পরিযায়ী পাখিদের গন্তব্যস্থল এবং যাত্রাবিরতির স্থানে বিভিন্ন পাখিদের সঙ্গে সখ্য এমনকি প্রণয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়। অপরপক্ষে পরিযানের দীর্ঘ পরিক্রমায় তারা অনেক সহোদরকে হারিয়ে ফেলে।

টাঙ্গুয়ার হাওর : পরিযায়ী পাখিদের অভয়াশ্রম

  • আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, পাখিদের এই পরিযান রহস্য বিজ্ঞানীরা আজও পুরোপুরি সমাধান করতে পারেননি। পাখিদের এই পরিযান আসলে কতটা প্রাচীন ব্যাপার এটাই বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যময় ঘটনা। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, প্রাচীনকালে যখন পৃথিবীর পরিবেশ ছিল দুর্যোগপূর্ণ; তখন কিছু পাখি ভালো পরিবেশের আশায় আশপাশে ভালো স্থানে গিয়ে বাসা বাঁধত। বাকিরা দূর দেশে অজানার উদ্দেশে পারি দিত। সেই থেকেই তাদের মধ্যে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিযানের প্রবণতা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। 

মজার ব্যাপারটি হলো, পরিযায়ী পাখিদের এমন অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ করে বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন এসব পাখির ওপর কয়েকটি পরীক্ষা চালান। তিনি একটি পাখিকে তার পরিযানের আসন্ন সময়ে খাঁচাবন্দি করে রাখেন। 

এ পরীক্ষায় দেখা যায়, পরিযানের সময় যত সামনে আসে, পাখিটিও বেরিয়ে আসার জন্য ততই মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এই প্রবণতা এতই প্রবল যে খাঁচায় দাপাদাপিতে পাখির বুক ও ডানা রক্তাক্ত এমনকি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। 

অপর এক পরীক্ষায় তিনি একটি পরিযায়ী হাঁসকে তার পরিযানের আসন্ন সময়ে ডানা বেঁধে ছেড়ে দিয়ে দেখেন ডানা মেলে না উড়তে পেরে পাখিটি শেষমেশ হেঁটেই দীর্ঘ যাত্রা শুরু করে দেয়। ডারউইন তার গবেষণায় দেখেছেন যে, মা পাখিরা উড়তে অক্ষম বাচ্চাকে এই ভীষণ ঠান্ডায় ফেলেই তার পরিযানে চলে যায়। তার মানে এই সময়টিতে মাতৃত্বের টান থেকেও বেশি প্রবল তার পরিযানের প্রবৃত্তি।

Numbers of migratory birds are decreasing day by day due to pollution -  Anandabazar

পরিযায়ী পাখিরা আকাশে দলবদ্ধভাবে ওড়ার সময় দেখা যায় ইংরেজি ‘ভি’ আকৃতির নিপুণ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে উড়ে যায়। আকাশে মালার আকৃতি ধারণ করে ডানায় ভর করে উড়ে চলা পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্যের এটি একটি। এই রহস্য নিয়ে নানা বিচার-বিশ্লেষণ রয়েছে। গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ভি বিন্যাসে সর্বাগ্রে একটি পাখি অবস্থান করে আর পেছনে ত্রমান্বয়ে বাকি পাখিগুলো উড়তে থাকতে। মজার ব্যাপার হলো, সর্বাগ্রে নেতৃত্বদানকারী পাখির অবস্থান সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। 

বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে এই ‘ভি’ বিন্যাসের দুটি তত্ত্ব প্রচলিত। প্রথমটি হলো, বাতাসের ফ্লুইড ডায়নামিক্স মেনে চলে শক্তি বাঁচানো। সম্মুখের পাখিটির উড্ডয়নের ফলে বাতাসে যেই ভোর্টেক্স তৈরি হয়, তা পেছনের পাখিগুলো কাজে লাগায়, ফলে তাদের ওড়ার জন্য শক্তি অপেক্ষাকৃত কম খরচ হয়। 

দ্বিতীয়টি হলো, এই ধরনের বিন্যাসের ফলে পাখিগুলো পরস্পরের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। গবেষণা তথ্য থেকে জানা যায়, দীর্ঘ পথ ভ্রমণের সময় পারস্পরিক যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে যতদূর সম্ভব শক্তি ব্যবহার করাটাও জরুরি বিষয়।

চলনবিলে অবাধে চলছে পরিযায়ী পাখি শিকার

বাংলাদেশে পরিযায়ী পাখির প্রিয়স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- 
টাঙ্গুয়ার হাওর : 

প্রতি বছর শীত মৌসুমে এ হাওরে প্রায় ২০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে। এ ছাড়াও রৌয়ার বিল, গজারিয়ার বিল, আলমের ডোয়ার, ফইল্লার বিল, রূপাভুই বিলে পাখিদের আনাগোনা বেশি থাকে। 

হাকালুকি হাওর : 
এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এ হাওরেও শীতে আসে প্রচুর অতিথি পাখি। হাকালুকি হাওরের কালাপানি, বাইয়াগজুয়া, কৈয়ারকোনা বিলে অতিথি পাখি বেশি দেখা যায়। 

বাইক্কা বিল : 
চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলের পাশেই পাখির অভয়াশ্রম বাইক্কা বিল। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওরের পূর্ব পাশের প্রায় একশ হেক্টর আয়তনের জলাভূমি শীতে ভরে যায় পরিযায়ী পাখিতে। বাইক্কা বিল প্রায় ১৬০ প্রজাতির পাখির অভয়াশ্রম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : শীতের শুরু থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। গাছপালায় ঢাকা সবুজ এই ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলোকে এ সময়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেয় পাখিরা। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : 
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দা নদীর বিভিন্ন চরে শীত মৌসুমে আসে নানা অতিথি পাখি। 

রাজশাহীর পদ্মার চর : 
গত কয়েক বছর ধরে এ নদীর চরে অতি বিরল সারস পাখি কালো মানিকজোড়সহ আরো অনেক বিরল প্রজাতির পাখির দেখা মিলছে। 

মুহুরী সেচ প্রকল্প : 
সামুদ্রিক জোয়ার ঠেকানো ও বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখার জন্য এ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়। শীতে এ প্রকল্প এলাকায় আসে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি। পাখির কলরবে গোটা এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

পাখির অভয়ারণ্য ঝিনাইদহের আশুরহাট গ্রাম

  • বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, পাখিদের পরিযানের মুখ্য উদ্দেশ্য দুর্যোগ আবহাওয়া থেকে প্রাণরক্ষা, খাদ্যের সহজলভ্যতা আর বংশবৃদ্ধি করা। এটি এখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত। এই নিয়মের টানে উত্তর গোলার্ধের অধিকাংশ পরিযায়ী পাখি দক্ষিণে আসে অফুরান পোকামাকড় আর নতুন জন্ম নেওয়া উদ্ভিদ খাওয়ার লোভে। 

এখানে এসে তারা খাদ্যের প্রাচুর্যের পাশাপাশি দেশীয় পাখিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে ভিন্ন এক পাখি সমাজ। এখানে তারা মিলেমিশে থাকে। বাসা বাঁধে, বংশবৃদ্ধি ঘটায়। এ দেশে এসে বাচ্চা ফুটিয়ে নতুন সংসার নিয়ে চলে যায় অন্য দেশে। 

পরিযায়ী পাখির জন্মহার যেমন বেশি মৃত্যুহারও তেমনি বেশি। পরিযানের সময়ই অর্ধেকের বেশি পাখি মারা যায়। ধরা যাক একটি পাখি সুদূর সাইবেরিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার পথে অনেক জায়গায় বিশ্রাম নিতে হয় এবং আহার করতে হয়। 

কিন্তু দেখা যায় প্রতি বছর এই পাখিটি এলাকায় বিশ্রাম ও খাবার গ্রহণ করত মানুষের কারণে সে স্থানটির আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেলে পাখিটির জীবন তখন হুমকির মুখে পড়ে। সঙ্গে যদি বাচ্চা পাখি থাকে, তাহলে আরো ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। 

পরিযায়ী পাখি দেখতে যাবেন যেখানে

এভাবে অনেক পরিযায়ী পাখির জীবনবসান ঘটে যাত্রাপথেই। আবার পরিযায়ী পাখিরা যেখানে এসে আশ্রিত হয় সেখানকার মানুষের লোভের ফাঁদ, বিষটোপ, গুলি, নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারায় অনেক দুর্লভ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। 

অপরদিকে অতিথি পাখিদের বিচরণ ভূমি ক্রমশ সংকুচিত হওয়ায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। এভাবে অনেক নির্মমতার শিকারে প্রাণ বলি দেওয়ার কারণে আপন নীড়ে ফেরা হয়না অনেক পরিযায়ী পাখির। 

নানা কারণে অনেক প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আজ বিপন্ন। কারণ এদের বাসভূমি ও বিচরণভূমি কমছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন খুব খারাপ প্রভাব ফেলছে। 

পরিযায়ী পাখি প্রজাতিগুলোর সংরক্ষণে আমাদের আরো যত্নশীল হওয়া দরকার। যেহেতু আমরা নিজেদের পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব দাবি করি তাহলে এই শ্রেষ্ঠত্বের মহানুভবতা নিদর্শন অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে দেখানো আমাদেরই দায়িত্ব হওয়া উচিত।

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!