ঢাকা,  শনিবার   ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

[ ফিচার ]

মহারানী ভিক্টোরিয়া ও মুন্সী আবদুল করিম

রাজপ্রাসাদের আড়ালে এক রহস্যময় সম্পর্ক
হারুন-অর-রশীদ খান
প্রকাশিত: ১১:৩৪, ১০ অক্টোবর ২০২৬
মহারানী ভিক্টোরিয়া ও মুন্সী আবদুল করিম
তাঁদের সম্পর্ক প্রেম ছিল, না গভীর বন্ধুত্ব—তার নিশ্চিত উত্তর হয়তো আর কখনোই পাওয়া যাবে না। তবে এটুকু স্পষ্ট, রাজমুকুটের আড়ালেও একজন মানুষ সঙ্গ, আস্থা ও ভালোবাসা খুঁজেছেন

একজন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহাপরাক্রমশালী সম্রাজ্ঞী, অন্যজন ভারতবর্ষের এক সাধারণ যুবক। কীভাবে তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল এমন এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যা তোলপাড় করে দিয়েছিল রাজপরিবারকে?

ইতিহাসের কিছু গল্প উপন্যাসকেও হার মানায়। মহারানী ভিক্টোরিয়া ও মুন্সী আবদুল করিমের সম্পর্ক তেমনই এক বিস্ময়কর অধ্যায়। সেখানে ছিল স্নেহ, বিশ্বাস, মানসিক ঘনিষ্ঠতা, রাজপরিবারের ঈর্ষা এবং মৃত্যুর পরেও সত্যকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা।

তাঁদের সম্পর্ক কি নিছক বন্ধুত্ব, গভীর মানসিক নির্ভরতা, নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর আজও অজানা।

এক সাধারণ যুবকের রাজপ্রাসাদে আগমন
১৮৬৩ সালে ভারতের ঝাঁসির কাছে ললিতপুরে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ আবদুল করিম। তাঁর পিতা হাজী ওয়াজিরউদ্দিন ছিলেন হাসপাতালের সহকারী। কর্মজীবনের একপর্যায়ে আবদুল করিম আগ্রার কারাগারে কেরানি হিসেবে কাজ করতেন।

Victoria & Abdul' Review: Judi Dench Once Again Plays Queen Victoria

অন্যদিকে, মহারানী ভিক্টোরিয়া ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম ক্ষমতাধর শাসক। ১৮৩৭ সালে ব্রিটেনের সিংহাসনে আরোহণ করেন তিনি। পরে ১৮৭৬ সালে লাভ করেন ‘ভারতের সম্রাজ্ঞী’ উপাধি।

১৮৮৭ সালে তাঁর সিংহাসনে আরোহণের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ভারত থেকে দুজন কর্মচারীকে ব্রিটেনে নেওয়া হয়। তাঁদের একজন ছিলেন আবদুল করিম, অন্যজন মোহাম্মদ বখশ। রাজপ্রাসাদে তাঁদের দায়িত্ব ছিল খাবার পরিবেশন করা।

১৮৮৭ সালের ৩ জুন উইন্ডসর দুর্গে রানীর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় আবদুল করিমের।

কে জানত, রাজপ্রাসাদের একজন সাধারণ খাদ্য পরিবেশকই একদিন হয়ে উঠবেন সম্রাজ্ঞীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনদের একজন!

Victoria & Abdul (2017) - Tim Pigott-Smith as Sir Henry Ponsonby - IMDb

খাবারের টেবিল থেকে আস্থার আসনে
প্রচলিত বিবরণ অনুসারে, একদিন ভারতীয় পদ্ধতিতে তৈরি একটি খাবার রানীর বিশেষ পছন্দ হয়। খাবারটি কে তৈরি করেছেন, তা জানতে গিয়ে তিনি আবদুল করিমের কথা জানতে পারেন।

  • ভিক্টোরিয়া ভারতীয় সংস্কৃতি ও ভাষা সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন। আবদুল করিমকে ইংরেজি শেখার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকেই রানী হিন্দুস্তানি ভাষা শিখতে শুরু করেন।
  • ১৮৮৮ সালের দিকে আবদুল করিমকে দেওয়া হয় ‘মুন্সী’ উপাধি। ভাষাশিক্ষক হিসেবে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতীয় বিষয়াবলিতে রানীর পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন।

এভাবেই একজন সাধারণ ভারতীয় কর্মচারীর জীবনে খুলে যায় রাজপ্রাসাদের এমন এক দরজা, যার ওপারে অপেক্ষা করছিল সম্মান, ক্ষমতা, বন্ধুত্ব এবং অসংখ্য বিতর্ক।

বয়সের ব্যবধান পেরিয়ে এক বিশেষ সম্পর্ক
১৮৮৭ সালে আবদুল করিমের বয়স ছিল প্রায় ২৪ বছর, আর ভিক্টোরিয়ার ৬৮। বয়স, জাতিগত পরিচয়, সামাজিক অবস্থান ও ক্ষমতার দিক থেকে তাঁদের মধ্যে ছিল বিশাল ব্যবধান।

The true story of Queen Victoria and Abdul Karim that inspired the film

  • তবু করিমের প্রতি রানীর স্নেহ ক্রমেই গভীর হয়। তাঁকে রাজকীয় সফরে সঙ্গে নেওয়া হতো। দেওয়া হয়েছিল বিশেষ আবাসন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মূল্যবান উপহার। তাঁর পরিবারের প্রতিও রানী সহানুভূতিশীল ছিলেন।
  • চিঠিপত্রে ভিক্টোরিয়ার স্নেহপূর্ণ সম্বোধন এবং করিমের প্রতি তাঁর বিশেষ আস্থা তাঁদের সম্পর্কের গভীরতার পরিচয় দেয়।

তবে এই সম্পর্ককে সরাসরি প্রেমের সম্পর্ক বলে ঘোষণা করার মতো অকাট্য প্রমাণ নেই। তাঁদের মধ্যে গভীর মানসিক ঘনিষ্ঠতা ও ভালোবাসা ছিল—এ কথা ঐতিহাসিক দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; কিন্তু সেই ভালোবাসার প্রকৃতি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন।

রাজপ্রাসাদে ঈর্ষা ও ষড়যন্ত্র
আবদুল করিমের দ্রুত উত্থান রাজপরিবারের অনেক সদস্যের কাছে ছিল অসহনীয়। উপনিবেশিত ভারতবর্ষের একজন সাধারণ কর্মচারী কীভাবে সম্রাজ্ঞীর এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন? কেন তাঁকে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ মর্যাদা? কেন ভারতীয় বিষয় নিয়ে তাঁর পরামর্শকে গুরুত্ব দিচ্ছেন রানী?

এসব প্রশ্ন থেকেই রাজপ্রাসাদে বাড়তে থাকে অসন্তোষ। করিমের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও সন্দেহ ছড়ানো হয়। এই বিরোধের পেছনে সামাজিক শ্রেণিবোধের পাশাপাশি তৎকালীন ব্রিটিশ সমাজের বর্ণবাদী মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

কিন্তু ভিক্টোরিয়া নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। করিমের প্রতি আস্থা বজায় রেখে তিনি রাজপরিবারের বিরোধিতার মুখেও তাঁকে সমর্থন করেন।

১৮৯৯ সালে রানীর ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে আবদুল করিমকে ‘কমান্ডার অব দ্য রয়্যাল ভিক্টোরিয়ান অর্ডার’ (CVO) সম্মানে ভূষিত করা হয়।একজন ভারতীয় কর্মচারীর এমন রাজকীয় সম্মানলাভ ছিল সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

নিঃসঙ্গ সম্রাজ্ঞী, মুন্সী ও ভালোবাসার প্রশ্ন—

  • ১৮৬১ সালে স্বামী প্রিন্স আলবার্টের মৃত্যুর পর ভিক্টোরিয়ার ব্যক্তিগত জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘদিন শোকের মধ্যে থাকা রানীর জীবনে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মানুষের সাহচর্য বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। তাঁদের মধ্যে জন ব্রাউনের নামও উল্লেখযোগ্য।

১৮৮৩ সালে জন ব্রাউনের মৃত্যুর কয়েক বছর পর আবদুল করিমের সঙ্গে ভিক্টোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। ভাষাশিক্ষা, ব্যক্তিগত কথোপকথন, সফর এবং নিয়মিত চিঠিপত্র তাঁদের সম্পর্ককে আরও নিবিড় করে তোলে।

অনেকে তাঁদের সম্পর্ককে প্রেমের গল্প হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে মনে রাখতে হবে, গভীর স্নেহ আর প্রণয় এক বিষয় নয়।

হয়তো আবদুল করিম ছিলেন রানীর এমন একজন সঙ্গী, যাঁর কাছে তিনি রাজমুকুটের ভার সরিয়ে একজন সাধারণ মানুষের মতো কথা বলতে পারতেন। আবার তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছু দিক চিরকালই রহস্যের আড়ালে থেকে যেতে পারে।

রানীর মৃত্যু, আর তারপর সবকিছুর অবসান—
১৯০১ সালের ২২ জানুয়ারি মহারানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যু হয়। আর তাঁর মৃত্যুর পরপরই আবদুল করিমের জীবনে নেমে আসে নাটকীয় পরিবর্তন।

নতুন রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের নির্দেশে তাঁকে ব্রিটেন ছেড়ে ভারতে ফিরে যেতে হয়। রাজপরিবারের উদ্যোগে রানীর সঙ্গে তাঁর আদান-প্রদান করা বহু চিঠি ও সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করে ধ্বংস করা হয়।

যে রাজপ্রাসাদে একসময় তিনি পেয়েছিলেন বিশেষ মর্যাদা ও স্নেহ, সেখান থেকেই তাঁকে বিদায় নিতে হয়। রানীর জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি যে সুরক্ষা ছিল, মৃত্যুর পর তা আর অবশিষ্ট থাকেনি।

ভিক্টোরিয়া অবশ্য জীবদ্দশায় করিমের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলেন। ভারতে তাঁর জন্য জমি ও আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার উদ্যোগও নিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

পুড়িয়ে ফেলা চিঠি, তবু বেঁচে রইল ইতিহাস
ভারতে ফিরে আবদুল করিম আগ্রায় বসবাস শুরু করেন। ১৯০৯ সালের এপ্রিলে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
রাজপরিবারের উদ্যোগে বহু চিঠি ধ্বংস করা হলেও, করিমের ব্যক্তিগত দিনলিপির কিছু অংশ তাঁর পরিবারের কাছে থেকে যায়। দীর্ঘদিন পর সেই দিনলিপি ও অন্যান্য নথি এই বিস্মৃত অধ্যায়কে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে।

Is 'Victoria & Abdul' on Netflix in Australia? Where to Watch the Movie -  New On Netflix Australia & New Zealand

সাংবাদিক ও লেখক শ্রাবণী বসু তাঁর গবেষণাগ্রন্থ Victoria & Abdul: The True Story of the Queen’s Closest Confidant-এ তাঁদের সম্পর্কের নানা অজানা দিক তুলে ধরেন। এই বই অবলম্বনে ২০১৭ সালে নির্মিত হয় হলিউডের চলচ্চিত্র Victoria & Abdul।

একসময় যে সম্পর্ককে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে সেই সম্পর্কই হয়ে উঠল ইতিহাস, গবেষণা ও চলচ্চিত্রের আলোচনার বিষয়।

Victoria & Abdul movie review: For queen or for country its worth a watch |  Lifestyle News

ইতিহাসের কাছে আজও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন—
মহারানী ভিক্টোরিয়া ও মুন্সী আবদুল করিমের কাহিনি কেবল প্রেমের সম্ভাবনাময় গল্প নয়; এটি সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবৈষম্য, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, নিঃসঙ্গতা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংযোগেরও ইতিহাস।

একদিকে ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অধিপতি, অন্যদিকে উপনিবেশিত ভারতের এক সাধারণ কর্মচারী। 

প্রচলিত সামাজিক সীমারেখা অতিক্রম করে তাঁদের মধ্যে যে আস্থা ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, তা রাজপরিবারের বহু মানুষের কাছে ছিল অস্বস্তিকর।

রানীর মৃত্যুর পর চিঠিপত্র ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়নি।

তাঁদের সম্পর্ক প্রেম ছিল, না গভীর বন্ধুত্ব—তার নিশ্চিত উত্তর হয়তো আর কখনোই পাওয়া যাবে না। তবে এটুকু স্পষ্ট, রাজমুকুটের আড়ালেও একজন মানুষ সঙ্গ, আস্থা ও ভালোবাসা খুঁজেছেন; আর ইতিহাসের প্রান্তে থাকা এক ভারতীয় যুবক হয়ে উঠেছিলেন সেই নিঃসঙ্গ সম্রাজ্ঞীর জীবনের বিশেষ একজন।

কিছু সম্পর্কের নাম দেওয়া যায়, কিছু সম্পর্ক থেকে যায় ইতিহাসের রহস্য হয়ে।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!