স্টেম সেল থেরাপির ভবিষ্যৎ কত দূর?
একসময় মনে করা হতো, মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ বা অঙ্গ পুনর্গঠন করা কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয়। আজ স্টেম সেল (Stem Cell) গবেষণা সেই ধারণাকে বাস্তব চিকিৎসার অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—স্টেম সেল নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চললেও এর সব ব্যবহার এখনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নয়।
স্টেম সেল হলো এমন বিশেষ কোষ, যেগুলো নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে পারে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের পরিণত কোষে রূপ নিতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসা (Regenerative Medicine)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে স্টেম সেল।
স্টেম সেল কোথায় পাওয়া যায়?
মানবদেহে বিভিন্ন ধরনের স্টেম ও অগ্রদূত কোষ (Progenitor Cell) রয়েছে। চিকিৎসা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে
.png)
- অস্থিমজ্জা ও রক্ত (Bone Marrow and Blood) — রক্তগঠনকারী স্টেম সেলের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব কোষ থেকেই রক্ত ও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার বিভিন্ন কোষ তৈরি হয়।
- নাভিরজ্জুর রক্ত (Umbilical Cord Blood) — রক্তগঠনকারী স্টেম সেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা নির্দিষ্ট রক্তরোগে কোষ প্রতিস্থাপনে ব্যবহৃত হয়।
- ভ্রূণীয় স্টেম সেল (Embryonic Stem Cell) এবং প্ররোচিত বহুশক্তিসম্পন্ন স্টেম সেল (Induced Pluripotent Stem Cell বা iPSC) — গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের কোষ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়াও ত্বক, অন্ত্র, চুলের গোড়াসহ বিভিন্ন অঙ্গে নিজস্ব ধরনের টিস্যু-নির্দিষ্ট স্টেম বা অগ্রদূত কোষ (Tissue-specific Stem/Progenitor Cells) রয়েছে।
তবে কোনো অঙ্গে স্টেম সেল পাওয়া যায় বলেই সেই কোষ ব্যবহার করে ওই অঙ্গের রোগের চিকিৎসা বর্তমানে সম্ভব—এমন ধারণা সঠিক নয়।
সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবহার: রক্ত ও অস্থিমজ্জার রোগ
স্টেম সেল চিকিৎসার সবচেয়ে সফল ও দীর্ঘদিনের ব্যবহার হলো রক্তগঠনকারী স্টেম সেল প্রতিস্থাপন (Hematopoietic Stem Cell Transplantation বা HSCT)।
লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া এবং কিছু গুরুতর রক্ত ও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার রোগে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা জীবনরক্ষাকারী হতে পারে।
আধুনিক কোষ ও জিন-চিকিৎসা (Cell and Gene Therapy) এই ক্ষেত্রকে আরও এগিয়ে দিয়েছে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ক্যাসজেভি (CASGEVY; exagamglogene autotemcel)। এতে রোগীর নিজের রক্তগঠনকারী স্টেম সেল সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট জিনে পরিবর্তন আনা হয়। পরে সেই পরিবর্তিত কোষ আবার রোগীর শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সিকল সেল রোগ (Sickle Cell Disease) এবং রক্ত সঞ্চালন-নির্ভর বিটা-থ্যালাসেমিয়া (Transfusion-dependent Beta-thalassemia)-এর চিকিৎসায় এই পদ্ধতি অনুমোদিত হয়েছে।
অর্থাৎ, এটি শুধু “স্টেম সেল দিয়ে অঙ্গ মেরামত” নয়; বরং জিন-পরিবর্তিত স্টেম সেলভিত্তিক চিকিৎসা (Gene-edited Stem Cell-based Therapy)।
চোখের চিকিৎসায় স্টেম সেল
স্টেম সেল-ভিত্তিক চিকিৎসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো লিম্বাল স্টেম সেল ঘাটতি (Limbal Stem Cell Deficiency)।
চোখের লিম্বাস (Limbus) থেকে রোগীর নিজস্ব কোষ সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বৃদ্ধি করা যায়। পরে সেগুলো ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়ার পৃষ্ঠ পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে হোলোকার (Holoclar) নির্দিষ্ট ধরনের মাঝারি থেকে গুরুতর লিম্বাল স্টেম সেল ঘাটতির চিকিৎসায় অনুমোদিত। বিশেষ করে রাসায়নিক বা শারীরিকভাবে চোখ পুড়ে গেলে এই চিকিৎসা ব্যবহার করা যেতে পারে।
গুরুতর পোড়া ও ত্বকের ক্ষত
কোষভিত্তিক পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসা (Cell-based Regenerative Therapy) গুরুতর পোড়ার চিকিৎসাতেও এগিয়েছে।
তবে “স্টেম সেল দিয়ে নতুন ত্বক তৈরি” কথাটি অনেক সময় অতিরঞ্জিতভাবে বলা হয়। কিছু অনুমোদিত কোষভিত্তিক চিকিৎসায় পরীক্ষাগারে বৃদ্ধি করা কোষ (Cultured Cells) বা তৈরি করা টিস্যু (Engineered Tissue) ব্যবহার করে ক্ষত বন্ধ হওয়া এবং ত্বকের পুনর্গঠনে সহায়তা করা হয়।
- যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্রাটাগ্রাফট (StrataGraft) নির্দিষ্ট ধরনের তাপজনিত পোড়ার ক্ষেত্রে ক্ষত বন্ধ হওয়া এবং ত্বকের পুনর্গঠনে সহায়তার জন্য অনুমোদিত।
- মস্তিষ্ক ও পারকিনসনস: আশার জায়গা, কিন্তু এখনো গবেষণাধীন
পারকিনসনস রোগে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের ডোপামিন উৎপাদনকারী স্নায়ুকোষ (Dopamine-producing Neurons) ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
গবেষকেরা বহুশক্তিসম্পন্ন স্টেম সেল থেকে এই ধরনের স্নায়ুকোষ তৈরি করে মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করছেন।
সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক। তবে পারকিনসনস রোগের নিয়মিত চিকিৎসা হিসেবে এই পদ্ধতি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বড় গবেষণা প্রয়োজন।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে বড় অগ্রগতি
স্টেম সেল গবেষণার অন্যতম আলোচিত ক্ষেত্র হলো ইনসুলিন উৎপাদনকারী অগ্ন্যাশয়ের দ্বীপকোষ (Insulin-producing Islet Cells) প্রতিস্থাপন।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। গবেষকেরা স্টেম সেল থেকে নতুন ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ তৈরি করে শরীরে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করছেন।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি প্রাথমিক মানব গবেষণায় একজন রোগীর ক্ষেত্রে এমন কোষ প্রতিস্থাপনের পর তিনি ইনসুলিনের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং এক বছর পর্যন্ত রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন।
- ফলাফলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে এখনো সাধারণ রোগীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা বলা যায় না। আরও বেশি রোগীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
সামনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, পর্যাপ্তসংখ্যক কোষ তৈরি, রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার আক্রমণ, অনিয়ন্ত্রিত কোষবৃদ্ধি এবং টিউমার তৈরির ঝুঁকি (Tumor Formation Risk)-সহ নানা প্রশ্ন।
- হৃদযন্ত্র, - অস্থিসন্ধি, - স্নায়ুতন্ত্র, - যকৃত ও কিডনি—কোথায় দাঁড়িয়ে গবেষণা?
হার্ট অ্যাটাকের পর ক্ষতিগ্রস্ত হৃদ্পেশী পুনর্গঠন, মেরুদণ্ডের আঘাত (Spinal Cord Injury)-এর পর স্নায়ুর কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস (Osteoarthritis)-এ ক্ষতিগ্রস্ত তরুণাস্থি পুনর্গঠন, যকৃতের ক্ষতি পূরণ এবং কিডনির কার্যকর কোষ তৈরির মতো বিষয় নিয়ে গবেষণা চলছে।
কিন্তু এগুলোর বেশিরভাগই এখনো মানবদেহে চিকিৎসা-পরীক্ষা (Clinical Trial) বা গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ফল সীমিত বা অস্পষ্ট। ব্যবহৃত কোষের ধরন, কোষের উৎস, চিকিৎসার পদ্ধতি এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে।
“স্টেম সেল” লেখা থাকলেই চিকিৎসাটি প্রমাণিত নয়- এটি বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি।
অনলাইনে অনেক প্রতিষ্ঠান বা ক্লিনিক বিভিন্ন ধরনের “স্টেম সেল” চিকিৎসার মাধ্যমে বাত, স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, স্নায়ুরোগ, অটিজমসহ নানা রোগ সারানোর দাবি করে।
কিন্তু কোনো ক্লিনিকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে মানেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত—এমন নয়।
অননুমোদিত পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসা পণ্য (Regenerative Medicine Products) ব্যবহারে সংক্রমণ, রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া, কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং টিউমার তৈরির মতো গুরুতর ঝুঁকি থাকতে পারে।
তাই স্টেম সেল চিকিৎসা নেওয়ার আগে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনা
- স্টেম সেল গবেষণার লক্ষ্য শুধু নতুন কোষ তৈরি করা নয়। বরং—
- রোগাক্রান্ত কোষের পরিবর্তে সুস্থ কোষ প্রতিস্থাপন
- ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কোষ পুনর্গঠন
- ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষ প্রতিস্থাপন
- ক্ষতিগ্রস্ত হৃদ্পেশী পুনর্গঠন
- তরুণাস্থি ও হাড় পুনর্গঠন
- যকৃত ও কিডনির কার্যকর কোষ তৈরি
- রোগীর নিজের কোষ থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোষ-চিকিৎসা (Personalized Cell Therapy) তৈরি
মানুষের কোষ ব্যবহার করে নতুন ওষুধ পরীক্ষা
—এসব ক্ষেত্রেই গবেষণা দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
স্টেম সেল থেরাপি এখন আর কেবল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়—কিন্তু এটি এখনো সর্বব্যাধির চিকিৎসাও নয়।
- রক্তের কিছু গুরুতর রোগে রক্তগঠনকারী স্টেম সেল প্রতিস্থাপন বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা। নির্দিষ্ট চোখের রোগে স্টেম সেলভিত্তিক চিকিৎসা বাস্তব চিকিৎসায় পৌঁছেছে। আর জিন-পরিবর্তিত স্টেম সেল চিকিৎসা এবং স্টেম সেল থেকে তৈরি ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষের মতো প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন দরজা খুলছে।
তবে হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, কিডনি, যকৃত কিংবা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে “সম্ভাবনা” আর “প্রমাণিত চিকিৎসা”—এই দুইয়ের পার্থক্য এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্টেম সেলের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হয়তো কোনো একটি রোগের চিকিৎসায় নয়; বরং এমন এক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে এগিয়ে যাওয়ায়, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে শুধু ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা নয়—প্রয়োজনে কোষের স্তরেই মেরামত বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে।
সেই ভবিষ্যৎ হয়তো একদিন বাস্তব হবে। তবে বিজ্ঞানের সৌন্দর্য এখানেই—আশাকে সম্ভাবনা হিসেবে দেখা,
আর প্রমাণকে প্রমাণ হিসেবেই গ্রহণ করা।
লেখক : ডাঃ এম আর করিম রেজা
ত্বক, সৌন্দর্য, সংক্রামক রোগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।