ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]

ইসরায়েলি হামলায় কী দ্বিতীয় গাজায় পরিণত হবে লেবানন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:০৬, ২২ জুন ২০২৪
ইসরায়েলি হামলায় কী দ্বিতীয় গাজায় পরিণত হবে লেবানন?
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে লেবানন সীমান্তে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহতের ধোঁয়া এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় সৃষ্ট আগুন ইঙ্গিত দিচ্ছে গাজায় চলমান যুদ্ধ বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় হামাস ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল ও লেবাননের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যেও পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। তাদের মধ্যে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছিলেন  বিশ্লেষকেরাও। তবে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে বড় আকারে যুদ্ধ বেধে গেলে তা গাজার চেয়েও ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে। এদিকে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা যত কমেছে, ততই ইসরায়েল–হিজবুল্লাহ যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে। 

জানা গেছে, গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনি মিত্র হামাসের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে নিয়মিত রকেট হামলা চালাচ্ছে। পাল্টা হামলায় ইসরায়েল সাদা ফসফরাস দিয়ে লেবাননের বিভিন্ন গ্রামে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার ফলে দক্ষিণ লেবাননের লক্ষাধিক মানুষও তাদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।

Advertisement

ইসরায়েলের আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা

লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমান্তে সংঘাত ও সর্বাত্মক যুদ্ধ বাধানো নিয়ে উস্কানিমূলক বাক্য বিনিময় করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস। শুক্রবার এক বিবৃতিতে দুই দেশের যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং সম্ভাবনা একটি ভুল গণনা বলে মন্তব্য করেছেন গুতেরেস।

বিবৃতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, একটি বেপরোয়া পদক্ষেপ, ভুল বুঝাবুঝি বিপর্যয় ঘটাতে পারে, যা সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমন কী কল্পনাকেও। এ অঞ্চলের মানুষ ও বিশ্ব লেবাননকে আরেকটি গাজায় পরিণত হতে দিতে পারে না।

গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা উত্তেজনা নিরসন ও ভুল বোঝাবুঝি রোধে কাজ করছেন। বিশ্বকে সোচ্চার হয়ে স্পষ্ট করে বলতে হবে-অবিলম্বে উস্কানি বন্ধ করা কেবল প্রয়োজনই নয়, এটা অপরিহার্য। কোনো সামরিক সমাধান নেই।’ 

যুদ্ধ যদি সত্যিই শুরু হয়, তাহলে সামরিক দিক থেকে তার ফলাফল কী হবে?

হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি মূলত স্থলবাহিনী। যোদ্ধা ও মজুত বাহিনীসহ হিজবুল্লাহর মোট সেনাসংখ্যা এক লাখের বেশি। ২০০৬ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে এসে সংখ্যা, পাল্লা, নির্ভুলতার দিক থেকে হিজবুল্লাহ রকেটব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।

এছাড়া হিজবুল্লাহ বাহিনীর শক্তির মূল ভিত্তি রাদওয়ান ফোর্স। এই অভিজাত ইউনিটের জনবল দুই হাজার থেকে তিন হাজার। রাদওয়ান ফোর্সের সেনাদের স্নাইপিং অভিযান, বৈরী পরিবেশে যুদ্ধ এবং শত্রুশিবিরে ঢুকে অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

হিজবুল্লাহর স্থলবাহিনীর ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানবিরোধী ইউনিটও রয়েছে। বর্তমানে, গোষ্ঠাটির কাছে এখন ১৯ ধরনের বেশি ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট সিস্টেম রয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ার তৈরি লেজার-গাইডেড করনেটস এবং আমেরিকার তৈরি ওয়্যার-গাইডেড টিওডব্লিউএস–জাতীয় মিসাইলও রয়েছে।

চলমান সংঘাতে প্রথমবারের মতো লেবাননের বালবেকে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

সিরিয়া যুদ্ধের সময় হিজবুল্লাহ ট্যাংক নিয়ে যুদ্ধ করতে শিখেছে। ইসরায়েলের বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য হিজবুল্লাহ তাদের সাঁজোয়া যানের বড় অংশটিই সিরিয়ায় রেখেছে। হিজবুল্লাহর কাছে মূলত পুরোনো সোভিয়েত আমলের টি-৫৪/ টি-৫৫ ও টি-৭২ ধরনের ট্যাংক রয়েছে।

হিজবুল্লাহর ট্যাংক যুদ্ধের চেয়ে ট্যাংকবিরোধী পদাতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলি বাহিনী ট্যাংক যুদ্ধে সুদক্ষ।

আমার গবেষণা সূত্রে বলতে পারি, হিজবুল্লাহর কাছে ১৩ ধরনের বেশি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। যদিও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি এখন পর্যন্ত হিজবুল্লাহর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। আকাশযুদ্ধ করার মতো ড্রোনের মজুত সীমিত। নৌযুদ্ধ করার সামর্থ্যও তাদের কম। তাদের কাছে হালকা অস্ত্রে সজ্জিত নৌযান রয়েছে।

ইলেকট্রনিক ও সাইবার যুদ্ধের কিছুটা সক্ষমতা হিজবুল্লাহর আছে। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তথ্য পরিচালনা ও পাল্টা গুপ্তচরবৃত্তি চালাতে সু-অভিজ্ঞ গোয়েন্দা ইউনিট তাদের রয়েছে। এ ছাড়া তারা একটি স্বাধীন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পেরেছে।

২০০৬ সালে ৩৪ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ৪ হাজারটি রকেট ছুড়েছিল। এখন হিজবুল্লাহের অস্ত্রভান্ডারে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি রকেট ও মিসাইল রয়েছে। এসব রকেট ও মিসাইল কাছের ও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করার সক্ষমতা আছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে, ফালাক-১ রকেট ১০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে সক্ষম। ৫০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে। অন্যদিকে জেলজাল মিসাইল ২০০ কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে সক্ষম, ৬০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বিস্ফোরক নিতে পারে।

ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে বারবার সংঘাত দেখা দেওয়ায় অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ছবি: এএফপি

কৌশলগত দিক থেকে দূরপাল্লার মিসাইল ইসরায়েলের জন্য সমস্যার কারণ। হিজবুল্লাহকে যদি ইসরায়েলি বাহিনী উত্তর দিকের লিতানি নদী পর্যন্ত হটিয়েও দিতে পারে, তারপরও ইসরায়েলে হামলার সংখ্যা কমবে না। হিজবুল্লাহর কাছে এখন ৬৫ হাজার মিসাইল রয়েছে, যেগুলোর পাল্লা ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে। আর ২০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার মিসাইলের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। এর মানে হচ্ছে, হিজবুল্লাহ লিতানি নদীর উত্তরাঞ্চল থেকে তেল আবিবে মিসাইল হামলা করতে সক্ষম।

হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সামাল দিতে পারবে কি ইসরায়েলের আয়রন ডোম?

সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে—এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রশস্ত্র বছরের পর বছর ধরে হিজবুল্লাহকে দিয়ে আসছে ইরান। 

বর্তমানে হিজবুল্লাহর হাতে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রকেট আছে, সেগুলোর সক্ষমতা ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের অস্ত্রশস্ত্রের চেয়ে বেশি। হিজবুল্লাহর এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বেশির ভাগই স্বল্পপাল্লার। এরপরও সেগুলোর কিছু কিছু ইসরায়েলের বেশ ভেতরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ইসরায়েলি বাহিনীর ধারণা, সংগঠনটির হাতে প্রায় দেড় লাখ ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট আছে। এসব অস্ত্র দিয়ে হিজবুল্লাহ বড় ধরনের হামলা চালালেই কেবল সেগুলো ঠেকানোর সক্ষমতা হারাতে পারে আয়রন ডোম।

ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে যেভাবে আগে জয়ী হয়েছিল হিজবুল্লাহ 

ইসরায়েলের সঙ্গে হিজবুল্লাহ দুইবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। প্রথমটা ১৯৮৫ থেকে শুরু করে ২০০০ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরব্যাপী গেরিলাযুদ্ধ। এই সংঘাতে হিজবুল্লাহ বিজয়ী হয়, কিন্তু তাদের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বরং রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষে বড় ধাক্কা লাগে।

দক্ষিণ লেবাননের গ্রাম লক্ষ্য করে ইসরায়েলি হামলার জবাবে উত্তর ইসরায়েলের সেনা সদর দফতর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল হিজবুল্লাহ।

দ্বিতীয় যুদ্ধটা ছিল আরো বিস্ময়কর। ২০০৬ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের সেই সংঘাতে হিজবুল্লাহ পদাতিক যুদ্ধ, সাঁজোয়া যান ও ট্যাংকবিরোধী কৌশল এবং সাইবার ও তথ্যপ্রযুক্তি হামলায় হিজবুল্লাহ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছিল। রসদ ফুরিয়ে আসা সত্ত্বেও যুদ্ধের পুরোটা সময় তারা রকেট হামলা অব্যাহত রাখে। ২০০৬ সালের এই যুদ্ধের ফলাফল ড্র হয়। ১৯৪৮ সালের পর কোনো আরব বাহিনী ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে এতটা সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

যুদ্ধে যে কৌশলে শত্রুদের শায়েস্তা করে ইসরায়েল

৭ অক্টোবর থেকে হিজবুল্লাহ ও দক্ষিণ লেবাননে তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়মিতভাবেই ইসরায়েলের গোলা বিনিময় চলছে। ধাপে ধাপে পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতাও বাড়ছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এসে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলার সংখ্যা গাজা থেকে চালানো রকেট হামলার সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। এখন গড়ে প্রতিদিন ১০০টি রকেট হামলা করছে হিজবুল্লাহ। ২০০৬ সালে তারা গড়ে প্রতিদিন ১২০টি রকেট হামলা করেছিল।

ইসরায়েল তাদের তথাকথিত ‘দাহিয়া মতাদর্শ’ শত্রুদের শায়েস্তা করার কাজে ব্যবহার করছে। এই মতবাদের মূল কৌশল হলো, শত্রুদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, বেসামরিক লোকজন ও তাদের অবকাঠামোর ওপর নির্বিচারে হামলা চালানো। সম্প্রতি গাজায় এই কৌশলের প্রয়োগ করছে ইসরায়েল। দক্ষিণ লেবাননের ক্ষেত্রেও স্বল্পমাত্রায় এই প্রয়োগ তারা করছে।

এই মতবাদের সারবত্তা হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা চালাতে হবে এই কারণে যে তারা সশস্ত্র যোদ্ধাদের রকেট হামলা চালানোর অনুমতি দিচ্ছে। বিদ্রোহ নির্মূলে পশ্চিমা চিরায়ত কৌশল হলো বিদ্রোহীদের ‘মন ও প্রাণ’ জিতে নাও। কিন্তু ইসরায়েলের দাহিয়া মতাদর্শ হলো, বোমা হামলা করে বেসামরিক জনসাধারণের ‘মন ও প্রাণ’ গুঁড়িয়ে দাও, যাতে বিদ্রোহীরা কোনোভাবেই ইসরায়েলে হামলা করার মতো পরিবেশ না পায়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!