ঢাকা,  শনিবার   ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

[ আন্তর্জাতিক ]

দিল্লিতে ধরপাকড়, এবার কি এক দফার আতঙ্কে মোদী সরকার?

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯:১০, ১০ অক্টোবর ২০২৬
দিল্লিতে ধরপাকড়, এবার কি এক দফার আতঙ্কে মোদী সরকার?
সংগৃহীত ছবি

ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ভারতে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠন।

আন্দোলন ঘিরে দিল্লিতে ধরপাকড়, নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিবহনব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই জরুরি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। বিক্ষোভে জনপ্রিয় ইউটিউবার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কর্মসূচির আগেই দলটির কয়েকজন নেতা এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয়। এ ছাড়া বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া আরও অনেককে আটক করার খবর পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আন্দোলনের মূল দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ছে। তাদের দাবি, এর ফলে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন চলছে। কমিশনের ভাষ্য, মৃত, অযোগ্য ও একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত ভোটারদের শনাক্ত করে তালিকা নির্ভুল করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

তবে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সংশোধন প্রক্রিয়ায় এমন কিছু নথি চাওয়া হচ্ছে, যা দরিদ্র, অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছে নেই। নথিপত্রে নাম বা অন্যান্য তথ্যের সামান্য অমিল থাকলেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা দাবি করছে।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগও বিতর্ক বাড়িয়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলমান রয়েছেন বলে বিরোধী শিবিরের দাবি। তবে এসব পরিসংখ্যান, বাদ পড়ার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিরোধীদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হলে নির্বাচনের ফল ও ভোটারদের অংশগ্রহণ প্রভাবিত হতে পারে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে স্বচ্ছ তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। কয়েকটি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ এবং কিছু সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এসব ব্যবস্থা বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের চলাচল সীমিত করেছে। তাদের দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করতে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে হবে এবং কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

তবে নিরাপত্তাব্যবস্থা, আটক ব্যক্তির সংখ্যা এবং যোগাযোগ বা পরিবহন বন্ধ রাখার বিষয়ে উত্থাপিত দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছেন বিরোধী নেতারা।

এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন নেতাকে দিল্লিতে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিক্ষোভে অংশ নিতে যাওয়া বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা, সমাজকর্মী ও আইনজীবীদের আটকের খবরও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব আটকের ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাঁদের কোথায় নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনের বরাতে দাবি করা হয়েছে, ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা ও নতুন ভোটার নিবন্ধনের নিয়ম নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছিলেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, গত ১০ মাসে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে চিঠি দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধসংক্রান্ত এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও মূল নথি যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

নির্বাচন কমিশনের দাবি, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নির্ভুল করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের জটিলতা এবং তথ্যগত অসংগতির কারণে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষ করে দরিদ্র, অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধী নেতারা। তাদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, সহজবোধ্য ও বৈষম্যহীন।

এ ক্ষেত্রে কতজনের নাম বাদ পড়েছে, তাদের মধ্যে কতজন যোগ্য ভোটার এবং কতজনের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্কের প্রকৃত চিত্র বোঝা সহজ হবে।

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের ধারাবাহিক প্রতিবাদ এবং দিল্লিতে ধরপাকড়ের অভিযোগ মোদী সরকারের ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। তবে এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার। এসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা।

আপাতত ভোটার তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দু, বিবিসি, আল-জাজিরা

ডেইলি-বাংলাদেশ/একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!