ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ জাতীয় ]

ফুটপাতের শরবত-পানীয় কতটা স্বাস্থ্যকর

আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশিত: ২০:০১, ১৮ জুন ২০২৩
ফুটপাতের শরবত-পানীয় কতটা স্বাস্থ্যকর
গ্রাফিক্স: ডেইলি বাংলাদেশ

রাজধানীর ফুটপাতে শরবত, আখের রস, ওষুধি শরবত ও লেবুপানি বানাতে এবং বিক্রি করার দৃশ্য খুবই পরিচিত। কিন্তু এই শরবত ও পানীয় কতটা স্বাস্থ্যকর তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থেকে যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটপাতের এসব শরবত-পানীয় গরম থেকে সাময়িক প্রশান্তি দিলেও এর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।

চিকিৎসকরা জানান, রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের শরবত নিরাপদ নয়। তাদের শরবতের পানি ও বরফ কোথা থেকে আসে তার ঠিক নেই। এ শরবত পান করলে পেটের অসুখ, হেপাটাইটিস এ বা বি-সহ নানা রোগ হতে পারে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও কম নয়।

তারা আরো বলেন, এসব শরবতে সাধারণ ট্যাপের পানি ব্যবহার করা হয়। শরবত ঠান্ডা করতে সাধারণ পানি থেকে তৈরি বরফ (মাছের জন্য তৈরি) ব্যবহার করা হয়। ভেজাল ও কালার দেওয়া ট্যাং, লেবু, অ্যালোভেরার নির্জাস, অর্জুন, বহেরা, হরিতকীর সঙ্গে স্যাকারিন মিশিয়ে এই শরবত তৈরি করা হয়। অস্বাস্থ্যকর এই শরবত পান করার ফলে পানিবাহিত রোগসহ শরীরে নানা সংক্রমিত রোগও ছড়িয়ে পড়ে। যা আমরা সহজে বুঝতে পারি না।

Advertisement

রাস্তার পাশে শরবত খেতে আসা রিকশাচালক করিম মিয়া বলেন, প্রচণ্ড গরম পড়লে রাস্তার ধারে ভ্যান থেকে ৫ টাকা করে দুই গ্লাস ঠান্ডা শরবত কিনে খাই। গরমে খুব ভালো লাগে। আসলে এগুলো অস্বাস্থ্যকর হলেও গরমে ভালো লাগে। 

লেবুর শরবত বিক্রেতা কুদ্দুস আলি জানান, খাবার পানি দিয়ে লেবুর শরবত তৈরি করা হয়। শরবতে বিট লবণ ও চিনি মিশিয়ে দেওয়া হয়। আর যেসব বরফ দেওয়া হয়, সেগুলো সংগ্রহ করা হয়  বিভিন্ন মাছের আড়ত থেকে। মাছ সংরক্ষণের জন্য আড়তদাররা এসব বরফ তৈরি করেন। আর লেবু বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকারি দামে কেনা হয়। আখের রসেও মাছ সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা বরফ দেওয়া হয়।

ফুটপাতে শরবতের দোকান

তিনি আরো জানান, প্রতিদিন প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ গ্লাস শরবত বিক্রি হয়। ভ্যানচালক, বাসের হেলপার, ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়া সাধারণ মানুষ তাদের ক্রেতা। আবার স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাও এ শরবত পান করে থাকে।

মহাখালী বাস টার্মিনালে মেশিনে আখ পিষে শরবত বিক্রি করেন রায়হান ফকির। শরবত ঠান্ডা রাখতে মেশিনের মুখে বরফের চাঁই রেখে দেন। এ বরফ গলা পানি মিশে যায় শরবতের সঙ্গে। 

এই বরফ নিরাপদ কিনা জানতে চাইলে রায়হান জানান, বরফ ফ্যাক্টরি থেকে আনা। এক পাটা বরফ ৬০ টাকায় কিনে আনি। তারাতো বলে ভালো, তাই কিনে আনি। আমার দেখার কিছু নেই।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভ্যানে শরবত বিক্রি করছেন হকাররা। ভ্যানের উপর একটি ফিল্টারে পানি ও বরফ মিশিয়ে রাখা হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে লেবু , ড্রিংক পাউডার, বিট লবণ, তোকমা ও বরফ কুঁচি। শুধু লেবুর শরবত বিক্রি হচ্ছে ৫ টাকায় আর ড্রিংক পাউডার মেশানো শরবত বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়।

ফুটপাতে শরবতের দোকান

জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্যের বিশুদ্ধতা পরিবীক্ষণ ও বিচারিক বিভাগের পরিচালক সহদেব চন্দ্র সাহা বলেন, রাস্তার খাবারের মান নিয়ে কাজ চলছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করা হচ্ছে। পরবর্তীতে রাস্তার পাশে বিক্রি করা খাবার কীভাবে স্বাস্থ্যকর করা যায়, সেসব বিষয়সহ নানা প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. সুদীপ রঞ্জন দেব বলেন, ভ্রাম্যমাণ শরবত বিক্রেতাদের পানি, বরফ কোথা থেকে আনা হয়, তা না জেনেই আমরা সেটা পান করে থাকি। এসব শরবতে ব্যবহার করা বিট লবণও নিরাপদ নয়। তৃষ্ণা নিবারণের নামে অসচেতনতা থেকে আমরা বিভিন্ন ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। আমাদের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

ফুটপাতে শরবতের দোকান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল হক ভূঁইয়া বলেন, অনেক দেশেই রাস্তার পাশে খাবার বিক্রির জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা আছে। জীবাণুমুক্ত পানির ব্যবস্থাও আছে। মান নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত তদারকি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও রাস্তার খাবারকে নিরাপদ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, খাবারগুলোতে কী কারণে জীবাণু থাকছে, এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা এবং সে লক্ষ্যে প্রতিকারের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। খাবার বিক্রেতাদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দেওয়া হলে কর্তৃপক্ষের জন্য মান নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করাও সহজ হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!