ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ জাতীয় ]

দুই ডজন ব্যবসায়ীর হাতে খেজুরের নিয়ন্ত্রণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০:০৬, ৮ মার্চ ২০২৪
দুই ডজন ব্যবসায়ীর হাতে খেজুরের নিয়ন্ত্রণ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

* খেজুরের দামে শুভঙ্করের ফাঁকি
* যেসব দেশ থেকে আমদানি করা হয়
* বাজারে পাওয়া যায় যেসব জাত
* খেজুর বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি
* ডলারের দাম বৃদ্ধির অজুহাত
* আমদানি-রফতানিকারক সমিতি যা বলছে
* খুচরা ব্যবসায়ীরা যা বলছেন
* ভোক্তাদের মাঝে অসন্তোষ, চান নিয়মিত তদারকি
* বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

পবিত্র রমজান মাসে বিশ্বজুড়ে ইফতারের প্রধানতম উপাদান খেজুর। বাংলাদেশেও খেজুর ছাড়া ইফতার কল্পনা করা যায় না। সারাবছর বাজারে খেজুরের উল্লেখযোগ্য চাহিদা না থাকলেও রমজানে তা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সুযোগটিই নেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা সিন্ডিকেট করে খেজুরের দাম পাল্লা দিয়ে বাড়িয়ে দেন। বিশেষ করে খুচরা বাজারে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। স্বল্প আয়ের মানুষকে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে খেজুর কিনতে হয়। খেজুর আমদানিনির্ভর পণ্য। আমদানি ব্যয়, ভ্যাট, করসহ মোটা দাগে খরচও রয়েছে বেশ। আবার দাম যারা নিয়ে কারসাজি করছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে পারছে না প্রশাসন। ফলে এর মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। 

এদিকে, গত বছর থেকেও এ বছর খেজুরের দাম প্রায় দ্বিগুণ। কারণ হিসেবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, কাস্টমস ডিউটি ট্যাক্স, রেগুলেটরি ডিউটি ট্যাক্স ইত্যাদিকে দুষছেন ব্যবসায়ীরা। ভ্যাট ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করাতেও এসব রাজস্ব ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দাম কমছে না বলে মত দেন আমদানিকারকরা। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতবছর রোজায় এক ডলারের দাম ছিল ১০৫-১০৬ টাকার মতো। এবার তা কিনতে হচ্ছে ১২৬-১২৭ টাকায়। তার সঙ্গে রয়েছে কয়েক ধরনের রাজস্ব।

দুই ডজন ব্যবসায়ীর হাতে খেজুরের নিয়ন্ত্রণ:

Advertisement

দেশের বাজারে বেশিরভাগ খেজুর আমদানি করে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে ২৫ জনের একটি সিন্ডিকেট। সর্বোচ্চ ৩ হাজার টন থেকে সর্বনিম্ন ১০০ টন আমদানি করা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে– অ্যারাবিয়ান ডেটস ফ্যাক্টরি, মদিনা ফ্রুটস লিমিটেড, রয়েল ফ্রেশ ফুডস, মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজ, আল্লাহর রহমত স্টোর, সাপোয়ানা ফুড ট্রেডিং কর্পোরেশন, রামিসা বিডি লিমিটেড, এডি ফ্রুটস লিমিটেড, হৃদয় এন্টারপ্রাইজ, সাউদার্ন ট্রেডিং, জেবি অ্যান্ড ব্রাদার্স, জেসপার ট্রেডিং, ওয়াসিফ ট্রেডিং, আল আনসার ফুডস, আস সাফা ওয়াল মারওয়া ট্রেডিং, ফারিয়া ট্রেডিং, মনসুর কোল্ডস্টোর, প্যারাগন এন্টারপ্রাইজ, হারুন স্টোর, শাকিল ফ্রেশ ফ্রুটস কোম্পানি, ট্রেড লিঙ্ক এজেন্সি, রিজভী ফ্রুটস, সবুজ এন্টারপ্রাইজ, সুপ্তি ট্রেডার্স ও লায়াম ফ্রেশ ফ্রুটস।

গত তিন বছরের আমদানিচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রমজান ঘিরে সবচেয়ে বেশি শুকনা ও ভেজা খেজুর আমদানি করছে ঘুরেফিরে একই প্রতিষ্ঠান। কার্টন ও বস্তায় করে খেজুর এসেছে দেশে। প্যাকেটে ভেজা খেজুর এনেছেন ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী। ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার খেজুর এনেছেন তারা। আর ভেজা খেজুর এনেছেন ৫৫ থেকে ৬০ জন ব্যবসায়ী। এগুলো খালাসের আগে চট্টগ্রাম কাস্টমসকেও নামে-বেনামে পরিশোধ করতে হয় কোটি কোটি টাকা।

যেসব দেশ থেকে আনা হয় খেজুর:

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশজানা যায়, দেশে প্রতি বছর ৮০-৯০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা থাকে ৫০ হাজার টন। যার প্রায় পুরোটাই আরববিশ্বসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিশর, ইরাক, ইরান, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া থেকেই দেশে অধিকাংশ খেজুর আমদানি করা হয়ে থাকে। 

খেজুরের উল্লেখযোগ্য জাত:

জাত ও আকারভেদে আমাদের দেশে কমপক্ষে ৩০ রকমের খেজুর পাওয়া যায়। বিশ্ববাজারে প্রায় ১০০ জাতের খেজুর আছে। তবে বাংলাদেশে ২০-২৫ জাতের খেজুর আমদানি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- বারহি, আমবার, সুক্কারি, মাবরুম, রুথান, সাফাভি, দাবাস, দাপাস, বাণী, জাহিদি, ফরিদা, সায়ের, মরিয়ম, কামরাঙ্গা মরিয়ম, আজওয়া, মেডজুল, খুরমা (শুকনা) ও গলা বা বাংলা খেজুর।

খেজুর বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি:

রাজধানীর বাদামতলী ফলের আড়ত ঘুরে দেখা যায়, পাইকারিতে ৫ কোজি প্যাকেটের মরিয়ম খেজুর ৪৬০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে, গত বছর যার দাম ছিল ৩৫০০ টাকা। আজওয়ার প্যাকেট বিক্রি হতে দেখা যায় ৩৭০০ টাকায়, গতবছর যার দাম ছিল ৩২০০ টাকা। এমনই হারে দাম বেড়েছে সব জাতের খেজুরের। গতবছর ৫৯০০ টাকায় বিক্রি হওয়া মেডজুল ৭৫০০ টাকায়, ১৮০০ টাকায় বিক্রি হওয়া বাণী খেজুরের প্যাকেট (৫ কেজি) এ বছর ৩১০০ টাকায়, ১৮০০ টাকায় বিক্রি হওয়া দাপাস ৪০০০ টাকায়, জাহিদি ৬৫০ থেকে বেড়ে ১২৫০ টাকায়, মাবরুম ৫০০০ টাকা থকে বেড়ে ৮০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা বাজারের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের দামের তুলনায় কেজিতে খেজুরের দাম বেড়েছে ১০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত বা তারও বেশি। গত বছর খুচরা বাজারে বিক্রি হওয়া ৪০০ টাকা দরের দাপাস খেজুরের দাম এবার ৮০০ টাকার মতো। ১৫০ টাকা কেজি দরের জাহিদি এবার ছুঁয়েছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অভিজাত শ্রেণির পছন্দের মরিয়ম খেজুর গত বছর ৯০০ এর আশপাশে থাকলেও এবার তা হাজার ছাড়িয়েছে। গত বছরের রমজানে জাতভেদে প্রতি কেজি খেজুর ১৫০ থেকে ১২০০ টাকায় পাওয়া গেলেও এবার ২৫০ এর নিচে ছোঁয়া যাচ্ছে না কোনো খেজুরই। তুলনামূলক দাম কম হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জাহিদি, দাবাস, বাণী ও গলা খেজুর। এদিকে অভিজাত শ্রেণির কাছে পছন্দের খেজুরের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের মেডজুল, মাবরুম, আজওয়া ও মরিয়ম। বাজারে এগুলোর দাম সবচেয়ে বেশি।

ডলারের দাম বৃদ্ধির অজুহাত:

দাম বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গতবারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে খেজুরের দাম। গতবারের তুলনায় ডলারের দাম বৃদ্ধির হার ১৮-১৯ শতাংশ হলেও খেজুরের দাম বৃদ্ধি হয়েছে জাতভেদে ৭০-১০০ শতাংশ পর্যন্ত। এত বৃদ্ধির জন্য কয়েক ধরনের রাজস্ব ও সরবরাহ ঘাটতিকেও দুষছেন ব্যবসায়ীরা৷

খেজুর আমদানিতে ভ্যাট কমানো হলেও দামে তা প্রভাব পড়ছে না বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, হিমায়িত কনটেইনারে আমদানি করা খেজুরে চার ডলারের অ্যাসেসমেন্ট (শুল্কায়ন) মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে কার্টনজাত সব খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য আড়াই ডলার, প্যাকেটজাত খেজুরে ২.৭৪ ডলার, বস্তায় আমদানি হওয়া খেজুর এক ডলার হিসেবে শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণ করেছে কাস্টম। 

আমদানি-রফতানিকারক সমিতি যা বলছে:

ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রফতানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আমরা প্রতি টন খেজুর ৯০০ থেকে ১ হাজার ডলারে আমদানি করছি। কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ আড়াই হাজার ডলার টনপ্রতি দাম নির্ধারণ করেছে। ফলে কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট ও রেগুলেটরি ডিউটিও বেড়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে কনটেইনার খালাস করতে খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুল্ক বাড়ার ফলেই মূলত দেশে খেজুরের দাম বেড়েছে।

বাদামতলীর খেজুর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মদিনা ফ্রুটস লিমিটেডের কর্মকর্তা (এজিএম) মো. সেলিম রেজা বলেন, খেজুরের মান ভালো রাখার জন্য অনেক সময় রেফ্রিজারেটর সুবিধাসম্পন্ন কনটেইনারে করে আমদানি করতে হয়। অন্যদিকে সাধারণ কনটেইনারে জাহাজ ভাড়া তেমন বেশি নয়। সাধারণ কনটেইনারে আনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২.৭৫ ডলার অ্যাসেসমেন্ট করা হয়। অথচ রেফ্রিজারেটর সুবিধার কনটেইনারের ক্ষেত্রে চার ডলার হিসেবে অ্যাসেসমেন্ট করা হচ্ছে। একদিকে শুল্কহার ১০ শতাংশ কমানো হলেও শুল্কায়ন মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে শুল্ক কিছু কমানো হলেও এতে খেজুরের দাম কমায় কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। 

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশঢাকার বাদামতলীর সাথী ফ্রেশ ফ্রুটস, মদিনা ফ্রুটস, আল্লাহর দান ফ্রুটসসহ আমদানিকারক আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, খেজুর আমদানিকারক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর নতুন করে যোগ হয়েছে কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ। সঙ্গে রয়েছে রেগুলেটরি ডিউটি  ও ভ্যাট ১৫ শতাংশ। এসব খাতে আগে এত রাজস্ব দিতে হতো না ব্যবসায়ীদের।  মূলত এর প্রভাবই বেশি পড়েছে খেজুর আমদানিতে। 

খুচরা ব্যবসায়ীরা যা বলছেন: 

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে মজুতদারি করে কৃত্রিম সংকট তৈরির কাজ মূলত খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতারা করতে পারেন না। এটি আমদানিনির্ভর পণ্য। ফলে মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হলে এর পেছনে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোরই সংশ্লিষ্টতা থাকে। 

ভোক্তাদের মাঝে অসন্তোষ:

মূল্যবৃদ্ধির এই বাজারে খেজুর কিনতে অধিক অর্থ খরচ হওয়ায় অসন্তোষ দেখা গেছে ভোক্তাদের মাঝে। বাদামতলী আড়তে আসা ক্রেতা মামুন বলেন, খেজুর ছাড়া ইফতার আসলে কল্পনা করা কঠিন। এজন্য বেশি দাম হলেও পরিমাণে কম কিনবো। কিন্তু অতিরিক্ত রাজস্ব ও ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে আমাদের ভুগতে হচ্ছে। তিনি বাজার নিয়মিত তদারকি বাড়ানোর দাবি জানান।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন:

ক্যাবের সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এবারও পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি হয়েছে। সরকার ১০ শতাংশ শুল্কও ছাড় দিয়েছে। তবে নজরদারিতে দুর্বলতা রয়ে গেছে। আবার যারা দাম নিয়ে কারসাজি করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে পারছে না প্রশাসন। ফলে খেজুরের বাজার অস্থির হওয়ার পেছনে এসব কারণ নেপথ্য হিসেবে কাজ করছে।

কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ও বাজার সিন্ডিকেট প্রতিরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমদানি হওয়া পণ্যগুলো অনেক হাতবদল হয়ে বাজারের প্রান্তিক ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। প্রতিটি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরাই অনেক বেশি লাভ করে থাকেন বলে এ সমস্যা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি পণ্যে লাভের হার নির্ধারণ করে দেওয়া হলে এবং সেটা সরকারের কর্মকর্তারা তদারকি করলে মূল্য সহনশীল করা সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, বাজারে যখন কোনো পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে, তখন সরবরাহ কমিয়ে দিলেই দাম বেড়ে যায়। বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। এ ধরনের মজুতদারি ও বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!