ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ জাতীয় ]

চট্টগ্রামের মোবারক যেভাবে হয়ে উঠলেন ‘ডেভিড ইমন’

বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮:৩০, ২৯ জুলাই ২০২৬
চট্টগ্রামের মোবারক যেভাবে হয়ে উঠলেন ‘ডেভিড ইমন’
ডেভিড ইমন। ছবি: সংগৃহীত

অপরাধ জগতের অন্ধকার গহ্বর থেকে উঠে আসা এক যুবকের দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠার কাহিনী যেন হার মানায় কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও। সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান মোবারক হোসেন, যিনি পরবর্তীতে ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচিত হন, আজ চট্টগ্রামবাসীর কাছে এক আতঙ্কের নাম। কৈশোরে গ্যাং কালচারের ছায়ায় পথচলা শুরু করে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অপরাধ জগতের অন্যতম আলোচিত চরিত্রে পরিণত হন। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাতে গ্রেপ্তার হওয়া এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর উত্থান, অপরাধ সাম্রাজ্যের বিস্তার, নেপথ্যের নানা তথ্য এবং বিশিষ্টজনদের বিশ্লেষণ নিয়েই এই বিশেষ প্রতিবেদন।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম মোবারক হোসেন ইমনের। তার বাবার নাম মো. মুসা। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে খুব অল্প বয়সেই পড়াশোনার ইতি টানতে হয় তাকে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফটিকছড়িতেই। তবে বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষা কিংবা দ্রুত প্রভাব বিস্তারের বাসনা তাকে টেনে আনে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে।

অপরাধ জগতে নিজের একটি ভয়ংকর ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতেই তিনি নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করেন ‘ডেভিড’ উপাধি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো ডন কিংবা বিদেশি গ্যাংস্টারদের নামের আদলে নিজেকে উপস্থাপন করতে পছন্দ করতেন তিনি। অনুসারী ও সহযোগীদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ডেভিড ভাই’ নামে।

Advertisement

হাতে দামি ঘড়ি, বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাক, বিলাসবহুল গাড়িতে চলাচল—সব মিলিয়ে তার জীবনযাপনে ছিল আভিজাত্যের প্রকাশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত স্টাইলিশ ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে অল্প সময়েই লাখের বেশি অনুসারী গড়ে তোলেন। তবে এই চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক নির্মম অপরাধীর পরিচয়, যিনি মুহূর্তের মধ্যে খুন কিংবা বড় অঙ্কের চাঁদাবাজির নির্দেশ দিতে দ্বিধা করতেন না।

মোবারক হোসেন ইমন মূলত অপরাধ জগতের মূল ধারায় প্রবেশ করেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সাধারণ মানুষের কাছে তিনি তেমন পরিচিত ছিলেন না।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে তিনি যোগাযোগ করেন বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর সঙ্গে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বড় সাজ্জাদের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। সাজ্জাদের নির্দেশে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক মিশন সফল করার মাধ্যমে দ্রুতই অপরাধ সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।

এর আগে, চট্টগ্রামে সাজ্জাদ বাহিনীর হয়ে ‘ছোট সাজ্জাদ’ নেতৃত্ব দিলেও তিনি কারাবন্দি হওয়ার পর অপরাধ সাম্রাজ্যের বড় একটি অংশ চলে আসে ডেভিড ইমনের নিয়ন্ত্রণে। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে তার বিশাল ক্যাডার বাহিনী। এই সিন্ডিকেটে অর্ধশতাধিক উঠতি বয়সী তরুণ ও কিশোর গ্যাং সদস্য কাজ করত, যাদের সামান্য অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হতো।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অপরাধ জগতে প্রবেশের মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ডেভিড ইমন অন্তত সাতটি জোড়া ও একক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় সংঘটিত আলোচিত জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যাকাণ্ডে তার সরাসরি নেতৃত্ব বা সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামের দুই ব্যক্তিকে ব্রাশফায়ার করে হত্যার ঘটনাতেও তার নাম আলোচনায় আসে। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি ছিল তার অপরাধ কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশ। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ী, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (আইএসপি) লক্ষ্য করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

গত জুলাই মাসে বাকলিয়ার চন্দনপুরা এলাকার ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন ডেভিড ইমন। নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থ না পাওয়ায় তার নির্দেশে ৩০ জনেরও বেশি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দিনদুপুরে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে হামলা চালায়। তারা ব্যাপক ভাঙচুর করে এবং নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনাতেও তার ক্যাডারদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। একাধিক হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ডজনখানেক মামলার পলাতক আসামি হিসেবে ডেভিড ইমনকে ধরতে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে ছিল চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।

গত ২৭ জুলাই বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকা থেকে তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী আসিফ ও সাইদুল ইসলাম আরিফকে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তার অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পায়। অবশেষে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ধুমধুমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রাম পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম গণমাধ্যমকে জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ অভিযান চালিয়ে যশোর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। চট্টগ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপরাধ চক্রের মূলোৎপাটনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অপরাধ ও অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. রইছ উদ্দিন বলেন, ৫ আগস্টের পর যারা কিশোর গ্যাং ও আন্ডারওয়ার্ল্ডকে ব্যবহার করে নগরীতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, পুলিশ তাদের কঠোরভাবে দমন করছে। ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে একটি বড় অপরাধ সিন্ডিকেটের মূল উৎপাটন সম্ভব হয়েছে। তার বাকি সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসানুল হক বলেন, ডেভিড ইমনের মতো উঠতি সন্ত্রাসীদের উত্থান সমাজের জন্য অশনি সংকেত। দ্রুত অর্থ ও ক্ষমতার মোহে জড়িয়ে পড়া একশ্রেণির তরুণ গ্যাং কালচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। নৈতিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ার সুযোগ নিয়ে এ ধরনের অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এ ধরনের অপরাধ সিন্ডিকেট পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক আকতার কবির চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের কারণে আতঙ্কে রয়েছেন। ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তার ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সাহস না পায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি বড় অপরাধ চক্রের পতনের সূচনা হয়েছে। তবে তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার সফল সমাপ্তিই নির্ধারণ করবে এই অভিযানের চূড়ান্ত সাফল্য।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কে কে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!