ঢাকা,  শুক্রবার   ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]
উপজেলা হাসপাতালে বাড়ছে শয্যা

স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনে সরকারের মহাপরিকল্পনা

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:২৪, ৬ নভেম্বর ২০২৬
স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনে সরকারের মহাপরিকল্পনা
ছবি: সংগৃহীত

স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দিতে দেশের স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, চিকিৎসক-নার্সসহ বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, আধুনিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা চালু এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো হবে।

চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। জাতীয় বাজেটের মোট বরাদ্দের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এই খাতে রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বাসসকে বলেন, গত ১৫ বছরের দুর্নীতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও মেরামত হয়নি।

তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান সরকার পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে। এটি এক বা দুটি প্রকল্পের বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ।

উপজেলা হাসপাতাল হবে ১৫১ শয্যার

উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে ৪৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সরকার। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

প্রকল্পের আওতায় ১৮টি হাসপাতাল ৫১ শয্যায়, ৩০৫টি ১০১ শয্যায়, ৮৩টি ১৩২ শয্যায়, ১৩টি ১২০ শয্যায় এবং ২৪টি হাসপাতাল ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ৪৪৩টি উপজেলায় সমন্বিত বহুতল সেবাভবন এবং ১৫টি উপজেলায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীর আবাসন সুবিধা নির্মাণ করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অনেক এলাকায় ৩০ ও ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আর পর্যাপ্ত নয়। কোনো কোনো উপজেলায় এখন ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষকে সেবা দিতে হচ্ছে। এ কারণে দেশের ৫০৩টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তরের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উন্নীত হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), করোনারি কেয়ার, ওয়ান স্টপ জরুরি সেবা, মেডিসিন, সার্জারি, নাক-কান-গলা, চক্ষু, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যানসার শনাক্তকরণ, ফিজিওথেরাপি এবং স্ট্রোক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার ও আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হবে।

বাড়ি বাড়ি পৌঁছাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৪ হাজার ৬৩৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ১ হাজার ৬৩১টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হাব স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ জন্য ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।

২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় ৫ হাজার ৯৩৬টি স্থাপনা পুনর্নির্মাণ, ৮ হাজার ৩৪৮টি মেরামত বা আধুনিকায়ন এবং ৩৫০টি নতুন হাব নির্মাণ করা হবে। অন্যদিকে কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৪২৮টি পুনর্নির্মাণ, ৬০৫টি সংস্কার এবং ৫৯৮টি নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন ও পুনর্নির্মিত স্থাপনাগুলোতে আসবাবপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রবেশপথ নিশ্চিত করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা দেবেন। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ প্রশিক্ষিত এসব কর্মী অন্তত দুই মাসে একবার প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ দেবেন।

তারা বাড়িতেই রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে পারবেন। এর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে পাঠানো হবে।

ডা. মুহিত বলেন, সরকার শুধু মানুষের বাড়ির দরজায় নয়, ঘরের ভেতরেও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চায়।

চিকিৎসক-নার্স নিয়োগে বড় উদ্যোগ

দেশে চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংকট কাটাতে বড় পরিসরে নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় বাংলাদেশে নার্সের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীরও ঘাটতি রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের প্রথম আট মাসে কয়েক হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন করা হয়েছে।

একই সঙ্গে আরও ২ হাজার ৫০০ নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন ও নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমানে কর্মরত ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আরও ১ লাখ কর্মী যুক্ত করে মোট সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে উন্নীত করা হবে। এর মধ্যে প্রথম ৩০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

বিভাগীয় পর্যায়ে বাড়বে ক্যানসার চিকিৎসা

ক্যানসার চিকিৎসা ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে বিভাগীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশের আটটি বিভাগে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন ও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচটি নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট (ইনমাস) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।

দেশজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে ১৭টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পাঁচটি উন্নত রোবটিক সার্জারি যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসা এখনো মূলত ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক। ফলে দূরবর্তী এলাকার রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। এতে চিকিৎসার ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত খরচও বহন করতে গিয়ে রোগী ও তাদের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েন। এ সমস্যা কমাতেই মানুষের কাছাকাছি ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সাভারে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট

স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়াতে সাভারে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করছে সরকার। প্রতিমন্ত্রী একে দেশে প্রথম এ ধরনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, চিকিৎসকদের মূলত রোগীর চিকিৎসাসেবার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা দেওয়া হয় না। অথচ পরবর্তী সময়ে অনেক চিকিৎসক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কিংবা সিভিল সার্জন হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন।

আগামী ১ জানুয়ারি ইনস্টিটিউটটি উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছে। সেখানে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে ১৬ হাজার কোটি টাকার দরপত্র

দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট ও অচল যন্ত্রপাতির অবস্থা যাচাই করতে ইতোমধ্যে নিরীক্ষা করেছে সরকার। এতে দেখা গেছে, অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সচল এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রের মতো প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয় সরঞ্জামও নেই।

এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নে ১৬ হাজার কোটি টাকার একটি কর্মসূচির দরপত্র শিগগিরই আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

এই কর্মসূচির আওতায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হবে।

বিশেষ করে সচল এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্র কেনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে উপজেলা পর্যায়েই রোগীরা দ্রুত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পান। সূত্র: বাসস

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!