লো, গো, রে, হে ---এগুলো হচ্ছে সম্বোধনসূচক অব্যায়। যেমন 'রে পামর' 'রে পাষণ্ড', 'ও লো সই, আমার ইচ্ছা করে তোদের মত মনের কথা কই'।
ফারসি উৎসের শব্দ বান্দা থেকে স্ত্রী-রূপ বান্দী এসেছে। বান্দা হল গোলাম, দাস, সেবক, বা অনুগত ব্যক্তি।
.png)
বান্দা শব্দটি বিশ্লেষণ করলে বিভিন্নদিকে ছড়ানো রূপ আমরা দেখতে পাবো, তবে আলোচ্য রচনাটি কেবল একটি প্রবাদ নিয়েই।
বাংলা ভাষায় ঠাকুর শব্দটির বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। এটি মূলত দেবতা, ঈশ্বর, পূজনীয় বা শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, পুরোহিত, ব্রাহ্মণ, কিংবা রাঁধুনি অর্থে ব্যবহৃত হয়। পিতার পিতাকে ঠাকুরদা বলা হয়, দেবরকে ঠাকুরপো। ভারতীয় পারিবারিক সামাজিক নীতিতে শ্বশুরকুলের সবাই পতিব্রতা সাবিত্রী স্ত্রীর পরম পূজনীয়, সম্মানীয়। কাজেই ঠাকুর মানে যেমন রাঁধুনি, তেমনি পরম শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তি।
আলোচ্য প্রবাদটিতে 'হগদা' শব্দটি আছে। অন্য শব্দগুলো চেনা গেলেও হগদা শব্দটি ঠিক চেনা যায় না যেন, আমরা বুঝে নেই আর-কী। তাই হগদা মানে উছিলা, হগদা মানে দোহাই, হগদা মানে মাধ্যম।
বাংলা ভাষা ফারসি ভাষার কাছে কত যে ঋণী, তা বলার নয়। আর সিলেট অঞ্চলের ভাষায় আরবি ও ফারসি দুটো ভাষারই প্রভাব লক্ষণীয়।
হগদা শব্দটিও ফারসি উৎসের। ফারসি শব্দ হক মানে সত্য, প্রাপ্য অধিকার বা পাওনা। আর দাদ মানে দেওয়া হয়েছে যা বা দান ; যেমন: খোদা-দাদ অর্থ খোদার দেওয়া। ফারসি ‘হক-দাদ’ (যার অর্থ 'ন্যায্য প্রাপ্য', 'আল্লাহর দেওয়া দান' বা 'অধিকার') শব্দটির আঞ্চলিক উচ্চারণে বিকৃত হয়ে 'হগদা' বা 'হগদাই' হয়ে গেছে।
ভাষাতাত্ত্বিক অন্য একটি মত অনুযায়ী, সংস্কৃত 'ভাগ' বা 'ভাগ্য' শব্দ থেকে প্রাকৃতের মাধ্যমে সিলেটি ভাষায় ‘হগ’ বা ‘হগদা’ শব্দের জন্ম হতে পারে।
এই অর্থে ‘হগদা’ মানে একজনের ভাগ্যের অংশ বা রিজিকে যার অবদান আছে। অর্থাৎ, যার উছিলায় বা মাধ্যমে নিজের ভাগের অন্নটি জোটে।
যখন কেউ বলে 'কার হগদা খাও', তার প্রচ্ছন্ন অর্থ দাঁড়ায়—'কার উছিলায় বা কার মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া এই হকের অংশ (রিজিক/অন্ন) তুমি পাচ্ছো?'
এই প্রবাদটি বলা হয় যখন, তখন খোঁটাস্বরূপই বলা হয়। কেউ উপকার পেয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করলে খোঁটাস্বরূপ এই প্রবচনটি বলা হয়। প্রবচনটিতে বান্দীকে খাওয়ার খোঁটা দেওয়া হয়েছে, ঠাকুর যদি রান্না না করেন (একসময় এমন ছিল সম্পন্ন হিন্দু পরিবারে) তবে তো আহার জুটবে না। আহার জুটবে ঠাকুরের উছিলায়। কাজেই বান্দীর উচিত কৃতজ্ঞ থাকা। পরিবারের কর্তা বা যে কোনো নির্ভরযোগ্য, নির্ভরশীল কারও আচরণে ক্ষুন্ন হয়েও একথা বলতে পারেন।
প্রবাদ-প্রবচনের জন্ম হয়েছে মানুষের অভিজ্ঞতার আলোকে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক অসংগতি প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে তুলে ধরা এর কাজ। শ্লোক>ছিলক আর প্রবাদ এক নয়।
ভাষা সৃষ্টি হয়, পরিবর্তিত হয়, অন্য ভাষায় লীন হয় সাধারণ মানুষের দ্বারা। ভাষা পণ্ডিতদের সৃষ্ট নয়, সাধারণ মানুষই ভাষার ধারক, বাহক।
লেখক : নাসরীন আক্তার রুবি, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও গবেষক।