এলেন গিন্সবার্গের লেখা এই কবিতাটি পরে গানে রুপান্তর করা হয়েছিল। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে সকল বিদেশীরা আমাদের দুঃখ, দুর্দশা সারা পৃথিবীর মানুষের মাঝে নিঃস্বার্থভাবে প্রচার করেন তাদের ভিতর এলেন গিন্সবার্গের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে। এলেন গিন্সবার্গ ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিকে কলকাতায় এসেছিলেন।
কলকাতায় তার বেশ কয়েকজন লেখক বন্ধু ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায় চৌধুরীর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ বেশ খ্যাতিনামা সাহিত্যিকের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। তবে তিনি ১৯৭১ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতেই ছিলেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে অনেক শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল।
.png)
যশোর সীমান্তের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি "সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড" নামে বিখ্যাত কবিতাটি লিখেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কবিতাটিকে গানে রূপ দিয়েছিলেন।
— অ্যালেন গিন্সবার্গ
শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত মানুষের দল,
যশোর রোডের দুধারে বসত বাঁশের ছাউনি কাদামাটি জল।
কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে।
ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ী দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হায় একাত্তর যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।
সময় চলেছে রাজপথ ধরে যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল,
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, গরুগাড়ী কাদা রাস্তা পিছিল।
লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে, লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়,
ঘরহীন ভাসে শত শত লোক লক্ষ জননী পাগলের প্রায়।
রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু, পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে
এইটুকু শিশু এতবড় চোখ দিশেহারা মা কারকাছে ছোটে।
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, এত এত শুধু মানুষের মুখ,
যুদ্ধ মৃত্যু তবুও স্বপ্ন ফসলের মাঠ ফেলে আসা সুখ।
কারকাছে বলি ভাতরূটি কথা, কাকে বলি করো, করো ত্রান,
কাকে বলি, ওগো মৃত্যু থামাও, মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রান।
কাঁদো কাঁদো তুমি মানুষের দল তোমার শরীর ক্ষত দিয়ে ঢাকা,
জননীর কোলে আধপেটা শিশু এ কেমন বাঁচা, বেঁচে মরে থাকা।
ছোটো ছোটো তুমি মানুষের দল,
তোমার ঘরেও মৃত্যুর ছায়া,
গুলিতে ছিন্ন দেহ মন মাটি,
ঘর ছেড়েছোতো মাটি মিছে মায়া।
শত শত মুখ হায় একাত্তর যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে॥

নিজ দেশে ফিরে তার অন্যান্য শিল্পী বন্ধু ও বিখ্যাত গায়কদের সহায়তায় এই গান গেয়ে কনসার্ট করেছিলেন এবং বাংলাদেশী শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। এই টাকার চেয়েও বড় ব্যাপার হল এই কনসার্টটি সারাবিশ্বের সামনে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলো। সবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কথা।
এই কনসার্ট থেকেই বিশ্বে নতুন করে জনমত তৈরি হতে থাকে এবং বিশ্বের সকল শান্তিপ্রিয় মানুষ অপেক্ষা করে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের জন্য। প্রিয় এই কবি এই কবিতার মাধ্যমেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি তাঁর একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং সারা পৃথিবীর মানুষকে বাংলাদেশের পক্ষে থাকার জন্য অনুরোধ করেন।
Millions of babies watching the skies
Bellies swollen, with big round eyes
On Jessore Road -long bamboo huts
No place to shit but sand channel ruts
Millions of fathers in rain
Millions of mothers in pain
Millions of brothers in woe
Millions of sisters nowhere to go
One Million aunts are dying for bread
One Million uncles lamenting the dead
Grandfather millions homeless and sad
Grandmother millions silently mad
Millions of daughters walk in the mud
Millions of children wash in the flood
A Million girls vomit & groan
Millions of families hopeless alone
*‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর শুরুর অংশ

গিনসবার্গের এই কবিতাটি একেবারে শুরুতে, বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর অনুবাদ করেছিলেন খান মোহাম্মদ ফারাবী (Khan Mohammad Farabi)। বাংলাদেশের স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ (Tareque Masud) ‘মাটির ময়না’ নির্মানের আগে, একটি তথ্যচিত্রের (মুক্তির কথা, ১৯৯৮) জন্য বিশিষ্ট সংগীতকারী মৌসুমী ভৌমিককে (Moushumi Bhowmik) একটি গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে যে গানটি ‘যশোর রোড’ নামে প্রভূত জনপ্রিয়তা পাবে।
গিনসবার্গের কবিতা ‘যশোর রোড’ হয়ে ওঠে একটি পরিপূর্ণ গান; মৌসুমী ভৌমিকের কণ্ঠে-ভাবানুবাদে। কেতকী কুশারি ডাইসন লন্ডনের এক মহিলা মিউজিশিয়ানের সঙ্গে তাঁর আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। মৌসুমী ভৌমিকের নির্দেশ মতো সুর বেঁধে দেন সেই মিউজিশিয়ান। ‘জন উইলসন’ স্টুডিওতে ভায়োলিন ও পিয়ানোর সুরে রেকর্ড করা হয় যশোর রোড। শুধু দুই বাংলা নয়, সারা বিশ্বে এখনও অসম্ভব জয়প্রিয় এই গান।
প্রথমে কবিতার শিরোনাম রেখেছিলেন ‘যশোর রোড’। এরপর ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর, সেইন্ট জর্জ চার্চে ‘বাংলাদেশের জন্য মার্কিনিরা’ শীর্ষক কবিতা পাঠের আসরে তা আবৃত্তি করেন। অগণিত দর্শকের মধ্যে সেখানে বব ডিলানও (Bob Dylan) উপস্থিত ছিলেন। ডিলান গায়ক, একজন কবিও। নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অগাস্টের ১ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ (The Concert for Bangladesh)। গান হয়ে গেল ‘যশোর রোড’—‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’।
গানে কণ্ঠও দেন গিনসবার্গ আর গিটারে ডিলান। জন লেননের পরামর্শে ১৯৮৩ সালে গানটি রেকর্ড আকারে প্রকাশ পায়। কবিতাটি তারও আগে, প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ‘যশোর রোড’ নামে। যদিও ১৫২ লাইনের সুদীর্ঘ কবিতাটির অর্ধেক ছাপা হয়েছিল। ছবি এঁকেছিলেন ড্যানিশ ব্যঙ্গচিত্র আঁকিয়ে ক্লাউস অ্যালব্রেকস্টেন। পুরো কবিতাটি গ্রন্থভুক্ত হয় গিনসবার্গের ‘দ্য ফল অব আমেরিকা’ কাব্যগ্রন্থে (১৯৭২ সালের ১ জুন প্রকাশিত)। কবিতার জন্য বইটি আমেরিকার ‘ন্যাশনাল বুক’ অ্যাওয়ার্ড পায়।
অনুবাদ: খান মোহাম্মদ ফারাবী। সংগ্রহ : হারুন-অর-রশীদ খান। সংকলন ও সম্পাদনা : এস এম মুকুল