১
ওরা যখন জাহাজ থেকে সাগরের বেলাভূমিতে নেমে দাঁড়ালো, তখন সূর্য পশ্চিমদিকে অনেকটা হেলে পড়েছে। সবাই হতবাক হয়ে চারদিকে তাকালো। সেন্ট মার্টিনস এত সুন্দর! ওরা যেন ভাবতেই পারেনি। এখনও যেন বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে।
.png)
ওদের মধ্যে সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার জিনাত ওদেরকে তাড়া লাগালো, ‘এই চল, এখন দিন অনেক ছোট, আর বড়জোর দুই ঘণ্টার মধ্যে সূর্য অস্ত যাবে। আগে দরকারি কাজ শেষ করি, তারপর এনজয়মেন্ট।’
জিনাত ওদের আনঅফিশিয়াল দলনেত্রী। সবাই যার যার ব্যাকপ্যাক তুলে নিল। ‘রাজ, তুই টেন্ট ঠিকমতো বুকিং দিয়েছিলি তো? আমাদের কিন্তু তিনটা টেন্ট লাগবে।’ জিনাত আবার বললো।
‘কোনো চিন্তা নেই বন্ধু, টেন্টের মালিকের সঙ্গে সব কনফার্ম করা আছে। একদম বিচের পাশে। তবে গাছপালা একটু বেশি, হালকা জঙ্গলের মতো হবে। বাট নো চিন্তা, ডু ফুর্তি।’ রাজ হালকা গলায় বললো।
এবার রিয়াজকে বললো জিনাত, ‘তাহলে আমরা এখন অল্প কিছু নাস্তা খেয়ে নেব। এখানে কিন্তু সাড়ে সাতটার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে নিতে হয়। তাই রাতের জন্য আমাদের কিছু শুকনো খাবার, ফল, পানি লাগবে। টর্চ আছে, তবু কিছু মোমবাতি লাগবে। তুই এগুলোর ব্যবস্থা কর।’
‘ওকে।’ বলে রিয়াজ এগিয়ে গেল।
২
এটা ছিল ওদের দীর্ঘদিনের প্ল্যান, কিন্তু বাস্তবায়ন করা হয়ে উঠছিল না। পাঁচ বন্ধু-বান্ধবী মিলে সেন্ট মার্টিনস বেড়াতে আসবে। একদিন বিকেল নাগাদ পৌঁছাবে, মাঝখানে একদিন থাকবে, তৃতীয় দিন ঢাকায় ফিরবে। অবশেষে সম্ভব হয়েছে। প্ল্যান হচ্ছে ওরা কোনো হোটেলে উঠবে না, একদম বিচের পাশে তাঁবুতে রাত কাটাবে। জিনাত আর রেইনা একটাতে, রাজ আর রিয়াজ একটাতে আর সীমান্ত একা একটাতে। সে একটু নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করে, তাই। বিচের পাশে থাকলে ইচ্ছেমতো বিচে ঘোরাঘুরি ও আড্ডা দেওয়া যাবে। টয়লেট নিয়ে একটু চিন্তা ছিল, তবে তাঁবুর মালিকদের বিশেষ ব্যবস্থা থাকে। রেইনা ধনী পরিবারের মেয়ে, প্রথমে একটু খুঁতখুঁত করলেও পরে মেনে নিয়েছে।
ওদের মূল প্ল্যানটা হচ্ছে দ্বিতীয় দিনটি নিয়ে। সারাদিন পুরো সেন্ট মার্টিনস ঘোরা আর সারা রাত আড্ডা দেওয়া, হৈচৈ করা। এজন্য প্রথম দিন ওরা শুধু সৈকতে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করলো। তাঁবুতে যার যার জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে ওরা সন্ধ্যার মধ্যেই রাতের খাবার খেয়ে নিল। বেছে বেছে ওরা ট্যুর প্রোগ্রামকে পূর্ণিমার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে। সন্ধ্যার পরই তাই আকাশে পূর্ণ চাঁদ। কিন্তু আড্ডা দেবে কী, প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য দেখে ওরা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
জিনাত, রাজ আর রিয়াজ একটু বেশি হৈচৈপ্রবণ। রেইনাও হৈচৈ করতে ভালোবাসে, তবে অন্যদের তুলনায় সে অনেক শান্ত। অন্যদিকে সীমান্ত একটু বেশি আত্মসমাহিত। হাসি-ঠাট্টায় যোগ দেয়, কিন্তু সে কম কথার মানুষ। কিন্তু তাই বলে বন্ধুদের প্রতি তার টান কারও থেকে কম নয়। বাকিরাও ওকে সেভাবেই মেনে নিয়েছে।
রাত এগারটা বাজতেই ওরা ক্লান্ত হয়ে সৈকত থেকে উঠে তাঁবুর দিকে রওনা হলো। জিনাত সবাইকে সতর্ক করলো, ‘সবার তাঁবুতে মোমবাতি, টর্চ আর শুকনো খাবার আছে। নতুন জায়গায় ঘুমের সমস্যা হতে পারে। ঘুম না এলে বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে পারিস, কিন্তু তাঁবু থেকে বেশি দূরে যাবি না। আর যেকোনো সমস্যা হলে বাকিদেরকে ডেকে তুলবি।’
ওর এই সতর্কবাণী যে আসলেই সত্যি হয়ে যাবে, তা তখনও কেউ ভাবতে পারেনি!
৩
হঠাৎ রেইনার চিৎকারে জিনাত ধড়ফড় করে জেগে উঠলো। আকাশে চাঁদ থাকায় তাঁবুর ভেতরে খুব ঝাপসা আলো। কিন্তু জিনাত প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলো না। তারপর খেয়াল করলো রেইনা তাঁবুতে নেই। টর্চটা বের করেই ও লাফ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। দেখলো, তাঁবুর একটু দূরে রেইনা দাঁড়িয়ে আছে। দৌড়ে গিয়ে জিনাত ওকে জড়িয়ে ধরলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘কী হয়েছে তোর?’
ততক্ষণে ছেলেরাও বের হয়ে এসেছে। ‘কী হয়েছে?’ রিয়াজ প্রশ্ন করলো। রেইনা ঠকঠক করে কাঁপছে। ও জবাব দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। জিনাত ওকে ধরে একটা পড়ে থাকা শুকনো গাছের গুঁড়ির ওপর বসালো। রাজ গিয়ে পানির বোতল নিয়ে এলো। পানি খাওয়ার পর রেইনা কিছুটা ধাতস্থ হলো। ‘কী হয়েছে তোর? ভয় পেয়েছিস কেন?’ জিনাত আবার জানতে চাইলো।
‘ঘুম আসছিল না, তবু জিনাতের ডিস্টার্ব হবে ভেবে চুপচাপ শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি একটা ছায়া আমাদের তাঁবুর পেছন দিক দিয়ে চলে গেল। প্রথমে ভেবেছিলাম তোরা কেউ, তাই বের হয়েছিলাম। কিন্তু আমার সাড়া পেয়েই লোকটা গাছের আড়ালে চলে গেল। তখন মনে হলো এটা বাইরের কেউ। নিশ্চয়ই ভালো কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। তাই ভয় পেয়েছিলাম।’ রেইনা থেমে থেমে বললো।
রাজ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ‘তোরা থাক, আমি একটু চারপাশটা দেখে আসি’ বলেই তাঁবুতে ঢুকে টর্চ হাতে বের হয়ে গেল।
‘রিয়াজ আর সীমান্ত রেইনার কাছে থাক। ফ্লাস্কে গরম পানি আছে, আমি সবার জন্য একটু কফি বানাই। কফি খেলে রেইনার একটু ভালো লাগবে।’ বলে জিনাতও উঠে গেল।
দুজন ফিরেও এলো প্রায় একসঙ্গে। জিনাত সবার হাতে কফি ধরিয়ে দিল। রাজ বললো, ‘অনেকখানি ঘুরে এলাম। কোনো মানুষের চিহ্নই নেই। রেইনা, তুই ভুল দেখিসনি তো?’
ইতোমধ্যে রেইনা অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। ‘আমি ঠিকই দেখেছি। খেয়াল করে দেখ, চাঁদের আলো সরাসরি আমাদের তাঁবুতে পড়েছে। তাই তাঁবুর পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে তার ছায়া তাঁবুতে পড়বেই। আমার ভুল হয়নি।’
জিনাত ঘড়ি দেখলো। ‘আচ্ছা, যা হয়েছে তো হয়েছে। রাত প্রায় দুটো বাজে। এত রাতে আর কিছু করার নেই। সবাই শুতে যা।’ রিয়াজ বললো, ‘রাজ, তুই কাল এ বিষয়টা নিয়ে তাঁবুর মালিকের সঙ্গে কথা বলিস। এটা আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন, বিশেষ করে আমাদের সঙ্গে যখন মেয়েরা রয়েছে। আর আমার মনে হয়, জিনাত, তোরা তাঁবুর ভেতরে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখিস। তবে দেখিস আবার আগুন লাগিয়ে দিস না।’
জিনাত মুখ ভ্যাঙচালো। ‘আমরা তোদের মতো কেয়ারলেস না।’
সীমান্ত এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। এবার সে মুখ খুললো। ‘তোরা সবাই ঘুমাতে যা, আমি একটু পরে যাব। রাজ, তোর টর্চটা একটু দে তো আমাকে।’
‘কেন, কী করবি তুই?’ রাজ অবাক হলো। বাকি সবাইও।
‘সেটা কাল সকালে বলবো। আমি একটু পরে ঘুমাবো, তোরা যা।’ সীমান্ত জবাব দিল।
কেউ আর কিছু না বলে যার যার তাঁবুর দিকে চলে গেল। তাঁবুতে ঢোকার আগে জিনাত দেখলো, সীমান্ত টর্চ নিয়ে ওদের তাঁবুর পেছন দিকে যাচ্ছে।
৪
বাকি রাত কেউই ভালোভাবে ঘুমাতে পারলো না। ঘুম হলো ছাড়া ছাড়া। এজন্য পরদিন সবাই ঘুম থেকে উঠলো দেরি করে। তাঁবু থেকে বের হয়ে সবাই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, সীমান্ত আগেই উঠে বাকিদের জন্য অপেক্ষা করছে। ‘কিরে, তুই রাতে কী করলি? ঘুমিয়েছিলি তো?’ জিনাত প্রশ্ন করলো।
‘অল্প। দোস্ত, একটা সুসংবাদ আর একটা দুঃসংবাদ আছে। তবে আগে নাস্তা খাওয়া, তারপর সব বলছি।’ সীমান্ত জবাব দিল।
ঘুম না হওয়ার কারণেই হোক বা রাতের ঘটনার টেনশনেই হোক, সবাইকে একটু ক্লান্ত লাগছে। তবে সীমান্ত প্রায় না ঘুমিয়েও খুব উৎফুল্ল। রিয়াজ দোকান থেকে নাস্তার ব্যবস্থা করলো। রেইনা কফি বানিয়ে সবাইকে দিল। তারপর সবাই গাছের ছায়ায় গোল হয়ে বসলো। ‘এবার বল, কী তোর সুসংবাদ আর দুঃসংবাদ।’ জিনাত বললো।
সীমান্ত বললো, ‘আমি কাল রাতের ঘটনাটা বুঝতে পেরেছি, এটা হলো সুসংবাদ। আর দুঃসংবাদ হলো, আমি যদি পুরো ঘটনাটা ব্যাখ্যা করি তাহলে আমাদের ট্যুরের আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। এখন তোরা ভেবে দেখ, ঘটনাটা জানতে চাস কি না।’
সবাই অবাক হয়ে সীমান্তের দিকে তাকালো। রেইনা বললো, ‘আমরা অবশ্যই ঘটনা জানতে চাই। কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের ট্যুরের আনন্দ নষ্ট হওয়ার কী সম্পর্ক?’
রিয়াজও বললো, ‘হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই ঘটনা জানতে চাই। এটা মোটেই হালকা কোনো ঘটনা নয়। এখানে চোর বা গুন্ডা-বদমাশের ভয় থাকলে আমরা কোনো হোটেলে চলে যাব, ট্যুর নষ্ট হবে কেন? রাজ, জিনাত, তোরা কী বলিস?’
ওরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। জিনাত সীমান্তকে বললো, ‘তুই কীভাবে কী বুঝলি আমাদেরকে সব বল।’
সীমান্ত শুরু করলো, ‘তোরা ঘুমাতে যাওয়ার পর আমি টর্চ নিয়ে আমাদের তিনটা তাঁবুর চারপাশটা খুব ভালো করে দেখেছি, আমাদের তাঁবুর কাছাকাছি হালকা জঙ্গলের মতো জায়গাটা ঘুরে দেখেছি, এমনকি সন্ধ্যায় বিচের যেখানে আমরা আড্ডা দিয়েছি সেখানেও অনেকক্ষণ সময় কাটিয়েছি। দুঃখজনক হলো, ঘটনাটা বাইরের কেউ ঘটায়নি, কোনো চোর বা গুন্ডা-বদমাশ আসেনি, আমাদের মধ্যেই একজন এর জন্য দায়ী।’
সবাই হতভম্ব হয়ে গেল। অনেকক্ষণ লাগলো সম্বিত ফিরতে। সীমান্ত ওদেরকে স্বাভাবিক হওয়ার সময় দিল। জিনাত বললো, ‘কী বলছিস তুই, আমাদের মধ্যে কে আমাদেরকে ভয় দেখাতে চাইবে? কেনই বা চাইবে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘রাজ, তুই কিছু বলবি?’ সীমান্ত প্রশ্ন করলো।
রাজ এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি, কারও দিকে তাকায়ওনি। মুখ নিচু করে বললো, ‘আমি কী বলবো?’
‘যাহোক,’ সীমান্ত শুরু করলো, ‘তোরা ঘুমাতে যাওয়ার পর আমি প্রথমে জিনাত আর রেইনার তাঁবুর পেছনটা দেখতে যাই। তোরা তো দেখেছিস তাঁবুর মুখটা চাঁদের উল্টোদিকে, এ কারণেই মানুষটার ছায়া তাঁবুর গায়ে পড়েছে, আর সেটা দেখে রেইনা ভয় পেয়েছে। তোদের মনে আছে নিশ্চয়ই, আমরা সন্ধ্যায় বিচ থেকে ফিরে সোজা যার যার তাঁবুতে ঢুকে গেছি, কেউ তাঁবুর পেছনে যাইনি। তাই আমি প্রথমে তাঁবুর পেছনে বালির ওপর জুতোর ছাপ লক্ষ্য করলাম। বালিতে জুতোর ছাপ খুব স্পষ্টভাবে পড়েছে। টর্চের আলোয় আমি কয়েকটা ছবি তুললাম। আমার, রাজ আর রিয়াজের জুতোর সঙ্গে মেলালেই বোঝা যাবে ওটা কার জুতো।
‘তারপর খেয়াল করলাম, তাঁবুর পেছনে বালির ওপর দিয়ে মানুষটা ধীরে ধীরে হেঁটে গেছে। দ্রুত হাঁটলে সাধারণত পদক্ষেপ একটু বড় হয় আর ধীরে হাঁটলে ছোট হয়। অবশ্য মানুষটার উচ্চতার ওপরও বিষয়টা নির্ভর করে। তবে আমরা তিনজন ছেলেরই উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফিটের ওপরে। এ থেকে তার পদক্ষেপের স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য আন্দাজ করে বোঝা গেছে, লোকটা ধীরে ধীরে তাঁবুর পেছন দিক দিয়ে হেঁটে গেছে।
‘প্রশ্ন হলো, লোকটা ধীরে ধীরে হেঁটেছে কেন? চোর বা গুন্ডা-বদমাশ হলে এত রাতে একটু তাড়াহুড়া করে তার কাজ করবে। লোকটার ছায়া দেখেই রেইনা জেগে গেছে। ও বাইরে আসছে এটা টের পেয়ে লোকটা একটু ছায়াতে গিয়ে দাঁড়ায়। রেইনা আবছাভাবে তাকে দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলে লোকটা দ্রুত হেঁটে জঙ্গলের অন্ধকারে হারিয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, জঙ্গলের সবচেয়ে কাছের তাঁবুতে রাজ ও রিয়াজ ছিল, মাঝখানের তাঁবুতে আমি আর বিচের কাছের তাঁবুতে জিনাত ও রেইনা। আমি রিয়াজদের তাঁবু পর্যন্ত পায়ের ছাপ অনুসরণ করতে পেরেছি, এরপর জঙ্গলের ভেতরে আর ছাপ খুঁজে পাইনি।’
সবাই নিশ্চুপ হয়ে শুনছে। সীমান্ত বলে চললো, ‘এরপর আমি গেলাম বিচের দিকে। সন্ধ্যায় আমরা যেখানে আড্ডা দিয়েছিলাম তারও অনেকখানি দূর থেকে শুরু করে আমাদের তাঁবু পর্যন্ত পুরো এলাকাটা তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। তোরা জানিস, সরকার থেকে কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিচে এখন লোকজন আবর্জনা কম ফেলে। অনেক কষ্ট হয়েছে, তবু আমি খুঁজে পেয়েছি।’
‘কী?’ জিনাত আর রেইনা একসঙ্গে জানতে চাইলো।
‘কয়েকটা সিগারেটের টুকরো। তোরা জানিস, আমাদের মধ্যে শুধু একজনই সিগারেট খায়। তার ব্র্যান্ডটাও আমাদের জানা।’ সীমান্ত থামলো।
সবাই হতবাক হয়ে রাজের দিকে তাকালো। রাজ মাথা তুললো না, কিছু বললোও না। সবার মধ্যে আশ্চর্য নীরবতা নেমে এলো। শেষ পর্যন্ত জিনাতই মুখ খুললো, ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না, রাজ কেন আমাদেরকে ভয় দেখাবে?’
‘রাজ আসলে ভয় দেখায়নি।’ সীমান্তের গলাটা একটু অন্যরকম শোনালো। ‘বিষয়টা রাজ ব্যাখ্যা করলে ভালো হতো, আমি শুধু আন্দাজ করতে পারি। রাজ অনেকদিন থেকেই রেইনাকে ভালোবাসে। রেইনার প্রতি ওর বাড়তি মনোযোগটা আমি আগেই খেয়াল করেছি। কিন্তু রেইনা ধনী পরিবারের মেয়ে, ভালোবাসার কথা বলার সাহস নেই। তাছাড়া, এতদিন সুযোগও ছিল না খুব একটা। এখানে আমরা ছাড়া পরিচিত আর কেউ নেই, পরিবেশটাও রোমান্টিক, রাজ ভাবলো এটাই সবচেয়ে ভালো সময়। রিয়াজ ঘুমিয়ে পড়লে রাজ উঠে চলে গেল বিচে। আমরা বাকিরা ঘুমিয়েছি কি না ও জানে না, জানতে গেলেও ধরা পড়ার সম্ভাবনা। তাই ও বিচে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। কীভাবে জিনাতের অজান্তে রেইনাকে বাইরে আনবে, কীভাবে ওকে প্রপোজ করবে, প্রপোজ করলে ওর রিঅ্যাকশন কী হবে এসব নিয়ে ভাবতে লাগলো, আর একটার পর একটা সিগারেট পোড়াতে লাগলো। শেষে সিদ্ধান্ত নিল রেইনাদের তাঁবুর পেছনে হাঁটাহাঁটি করবে। যদি জিনাত টের পেয়ে যায়, তাহলে বলবে ঘুম আসছে না, তাই হাঁটাহাঁটি করছে। আর কপাল ভালো হলে যদি রেইনা বের হয়ে আসে তাহলে তো কথাই নেই। রেইনাই বের হলো, কিন্তু ও যে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠবে রাজ তা ভাবতে পারেনি। ও চিৎকার করে উঠলে রাজ কী করবে বুঝতে না পেরে দ্রুত তাঁবুতে ঢুকে যায়, আর অন্ধকারে রেইনা ভেবেছে লোকটা জঙ্গলে ঢুকে গেছে। এজন্যই আমি ওদের তাঁবু পর্যন্ত পায়ের ছাপ দেখেছি, কিন্তু জঙ্গলের ভেতর পায়ের ছাপ ছিল না। এদিকে রেইনার চিৎকার শুনে ততক্ষণে আমরা সবাই বের হয়ে এসেছি। আমার ব্যাখ্যা কি ঠিক আছে রাজ?’
রাজ এবারও কিছু বললো না।
‘কিন্তু রাজ তাঁবু থেকে বের হলো, আবার ঢুকলো, রিয়াজ কিছুই টের পেলো না?’ জিনাত জানতে চাইলো।
সীমান্ত হাসলো। ‘রিয়াজের ঘুম যে কী ভীষণ গভীর তুই কি জানিস না বন্ধু? তার ওপর জার্নি করে ও ছিল ক্লান্ত।’
রিয়াজ একটু হাসলো। ‘ঠিকই, আমি শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে গেছি। কিন্তু সীমান্ত, রেইনা তো আবছাভাবে হলেও রাজকে দেখেছে, তবু চিনতে পারলো না কেন?’
‘রাজের গায়ের টি-শার্টের রংটা দেখ, গাঢ় খয়েরি। পরনে কালো ট্রাউজার। চাঁদের আলোয় গাঢ় খয়েরি রং কালচে দেখায়। এজন্যই গাছের নিচের আবছা আলোয় রেইনা ওকে চিনতে পারেনি।’ সীমান্ত জবাব দিল। ‘তাছাড়া, তোরা কেউ খেয়াল করিসনি, কিন্তু আমি ঠিকই লক্ষ্য করেছি, রেইনার চিৎকার শুনে আমরা সবাই যখন তাঁবু থেকে বাইরে আসি তখন সবার পরনে ছিল স্লিপিং ড্রেস, একমাত্র রাজের পরনে ছিল ও এখন যে খয়েরি টি-শার্ট ও কালো ট্রাউজার পরে আছে সেটা। রাতে ও তো ঘুমানোর জন্য তাঁবুতে ঢোকেনি, ওর প্ল্যান ছিল রিয়াজ ঘুমালে উঠে আসবে, সেজন্যই স্লিপিং ড্রেস পরেনি। রেইনা চিৎকার করার পর দ্রুত তাঁবুতে ঢুকেছে, কিন্তু রিয়াজ ঘুম থেকে উঠে যাওয়ায় ড্রেস চেঞ্জ করার আর সময় পায়নি।
‘আরেকটা ব্যাপারও আছে। রেইনা যখন বললো ও একটা লোককে জঙ্গলের দিকে যেতে দেখেছে তখন সবার আগে রাজ টর্চ নিয়ে লোকটাকে খুঁজতে গেছে। কেন বলতো? ও খুঁজে এসে যদি বলে ওদিকে কেউ নেই, তাহলে আমরা আর কেউ ওদিকটা দেখতে যাবো না, তাই। আমি যে আবার ওদিকে যাবো এটা ও ভাবতে পারেনি। তাছাড়া, আমার ক্যামেরায় যে জুতোর ছাপ আছে আমি নিশ্চিত সেটা রাজের জুতোর ছাপের সঙ্গে মিলে যাবে, এরকম বুট জুতো শুধু ও-ই পরে এসেছে।’
সীমান্তের কথা শেষ হলে সবার মধ্যে নেমে এলো এক অসহ্য নীরবতা। কেউ যেন কারও মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। কী হয়ে গেল হঠাৎ করে! রাতের ঘটনাটার এরকম পরিসমাপ্তি ঘটবে এটা কেউ ভাবতেই পারেনি।
৫
সীমান্ত উঠে রাজের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর হাত ধরে বললো, ‘সরি বন্ধু, আমাকে সত্যটা প্রকাশ করতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব যেন নষ্ট না হয়।’
রাজ উঠে দাঁড়ালো। কারও দিকে না তাকিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে বিচের দিকে চলে গেল। কেউ কিছু বললো না, ওকে বাধাও দিল না। রিয়াজ কী বলবে, কী করবে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। রেইনা অনেকক্ষণ থেকেই চুপ করে মাথা নিচু করে বসে আছে, এখনও চুপ করেই থাকলো। মেয়েদের একটা সিক্সথ সেন্স আছে, যেটা দিয়ে ও অনেক আগে থেকেই জানে যে রাজ ওকে পছন্দ করে, জানে সীমান্তের কথাগুলো সত্যি। জিনাতেরও মনে হলো, সীমান্ত সত্যি কথাই বলেছে, এত কষ্ট করে আয়োজন করা ট্যুরের পুরো আনন্দটা নষ্ট হয়ে গেল। এরচেয়ে ট্যুরটা আয়োজন না করলেই বোধহয় ভালো ছিল।
আর রাজের মনে কী চলছে কে জানে!
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।