রাজউকের ঘুষের জালে ঝুঁকিপূর্ণ ঢাকা
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকের একজন ইমারত পরিদর্শক মাসে বেতন পান সরকারি স্কেল অনুযায়ী সামান্য কিছু টাকা। কিন্তু তার মালিকানায় খোদ রাজধানীতেই রয়েছে একাধিক বহুতল ফ্ল্যাট ও বিলাসবহুল গাড়ি। অন্যদিকে, ৫ তলার অনুমোদন নিয়ে ৮ তলা ভবন তুলে বুক ফুলিয়ে ব্যবসা করছেন এক প্রভাবশালী ভবন মালিক। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নোটিশ কিংবা বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আইনি কড়াকড়ি কোনো কিছুই স্পর্শ করতে পারছে না এসব বাড়ি মালিককে।
অনুসন্ধান বলছে, রাজধানীর বুকে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, জলাশয় ও খেলার মাঠ দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী ‘ত্রিপক্ষীয় সিন্ডিকেট’। রাজউকের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, ইউটিলিটি সেবা সংস্থাগুলোর অসাধু চক্র এবং প্রভাবশালী আবাসন ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক স্বার্থের এই ‘দুষ্টচক্রই’ আজ তিল তিল করে ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য এক মরণফাঁদে পরিণত করছে।
.png)
উত্তরা এলাকার রিয়াদ হোসেন নামের একজন ভুক্তভোগী ভবন মালিক বলেন, নকশা অনুমোদনের পর থেকে ছাদ ঢালাই পর্যন্ত রাজউকের পরিদর্শকেরা বারবার এসে টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। আর টাকা দিলে ৫ তলার জায়গায় ৮ তলা তুললেও তারা আর ভবনে আসেন না।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত অনুযায়ী, রাজউকের দুর্নীতি মূলত তিনটি নির্দিষ্ট পদে সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত। একটি ভবন যখন নকশা লঙ্ঘন করে নিয়মের বাইরে গিয়ে ওপরে উঠতে থাকে বা পাশে বাড়তে থাকে, তখন রাজউকের এই মাঠপর্যায়ের পরিদর্শকেরা রহস্যজনকভাবে নীরব থাকেন। ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর বিশেষ করে ছাদ ঢালাইয়ের পর হঠাৎ পাঠানো হয় ‘নকশা লঙ্ঘনের’ নোটিশ। আর এই নোটিশই মূলত বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম।
আর্থিক লেনদেনের দফারফা বা মাসোহা চুক্তি হলেই অবৈধ ভবন পরিদর্শকদের ফাইলে রাতারাতি ‘বৈধ’ বা ‘উপেক্ষণীয়’ হয়ে যায়। এমনকি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নকশা জালিয়াতি করে খোদ খেলার মাঠ বা পার্কের জায়গার ওপরেও বহুতল ভবনের লে-আউট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিগত দিনে ঘটে যাওয়া বড় বড় অগ্নিকাণ্ড বা ভবন ধসের ঘটনায় বরাবরই কেবল ভবন মালিকদের গ্রেপ্তার বা সাজা হতে দেখা গেছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে থেকে যে সরকারি কর্মকর্তারা ঘুষের বিনিময়ে এই মরণফাঁদগুলো তৈরি হতে দিলেন, তারা অধিকাংশ সময়ই থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। বড় কোনো দুর্ঘটনার পর রাজউকের তদন্ত কমিটি বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গণমাধ্যমে একটি চেনা বিবৃতি দিয়ে দায় সারেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহম্মেদ খান এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা শুধু ভবন মালিকদের ধরে জেলে পুরছি কিন্তু যে রাজউক ও বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরকারি পরিদর্শকদের চোখের সামনে ইমারত বিধিমালা অমান্য করে এই মরণফাঁদগুলো তৈরি হলো তারা কেন আসামি হবেন না? এই সরকারি কর্মকর্তাদের ফৌজদারি অপরাধের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি না দিলে ঢাকা কখনোই নিরাপদ হবে না।
এই সিন্ডিকেটের চূড়ান্ত চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে অন্যান্য ইউটিলিটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। আইন অনুযায়ী রাজউকের ব্যবহার সনদপত্র বা ছাড়পত্র জমা দেওয়া ছাড়া যেকোনো ভবনে স্থায়ী পানি, গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরো উল্টো। সেবা সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ের অসাধু কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ঠিকই অবৈধ ভবনগুলোতে বাণিজ্যিক সংযোগ বা ভুয়া মিটার দিয়ে দিচ্ছেন। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি পেয়ে যাওয়ার পর ভবন মালিকরা রাজউকের আইনকে আর কোনো তোয়াক্কাই করেন না। রাজউক কোনো ভবনকে ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেবা সংস্থাগুলোকে চিঠি পাঠালেও অনেক সময় মাঠপর্যায়ের টেকনিশিয়ান ও কর্মকর্তারা সেই নোটিশ ঝুলিয়ে রাখেন এবং সংযোগ কাটার নাটক করে ভবন মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ‘সমঝোতা’ করেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ঢাকা আজ যে চরম জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড এবং কৃত্রিম তাপপ্রবাহের শিকার তার প্রধান কারণ রাজউক এবং সেবা সংস্থাগুলোর সীমাহীন দুর্নীতি। রাজউক কোনো ভবনকে অবৈধ ঘোষণার পরও অন্যান্য সেবা সংস্থা কীভাবে সেখানে সংযোগ সচল রাখে? এই সমন্বিত অপরাধের কারণেই আজ ঢাকাবাসী কাঠামোগত মৃত্যুর ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে।
ঢাকার চারপাশের গ্রামীণ এলাকার চেয়ে শহরের ভেতরের তাপমাত্রা এখন প্রায় ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকছে। একটি শহরের ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা এবং ১০-১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা দরকার। কিন্তু নিয়ম লঙ্ঘন করে নিচু জমি ও বন্যা প্রবাহ অঞ্চল ভরাট করায় ঢাকার সবুজ এলাকা এখন ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এর সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে কৃত্রিম বন্যা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার মাধ্যমে। সামান্য ১-২ ঘণ্টার বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে কোটি মানুষের এই মেগাসিটি।
রাজউকের নিজস্ব পর্যালোচনা বলছে, ঢাকার প্রায় ৭৪ শতাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে নকশাবহির্ভূত বা অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে তৈরি। ভবনগুলোর মাঝখানে নিয়ম অনুযায়ী খালি জায়গা না রাখায়, মাঝারি মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলেই এখানে একটি ভবন পাশের ভবনের ওপর আছড়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে। এতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে হাজার হাজার ইমারত। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবনে জরুরি বের হওয়ার সিঁড়ি না রাখা এবং বাফার জোন না রাখায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি ও মই ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মানুষ ভেতরেই পুড়ে মারা যায়।
শুধু কাঠামোগত ঝুঁকিই নয়, রাজউকের এই অনিয়ম ঢাকাবাসীকে প্রতিদিন একটু একটু করে বিষাক্ত রোগে আক্রান্ত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে চার ধরনের মারাত্মক রোগবালাই ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রথমত, আবৃত না করে ভবন নির্মাণ এবং দূষণের কারণে বাতাসে ক্ষতিকর ধূলিকণার মাত্রা মারাত্মক রূপ নিয়েছে, যা শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে অ্যাজমা, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দূষিত বাতাসের অতিক্ষুদ্র কণা সরাসরি রক্তে মিশে গিয়ে রক্তনালি ব্লক করে দিচ্ছে, যার ফলে তরুণদের মধ্যেও স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের হার বাড়ছে।
বিশিষ্ট চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশকর্মী ড. লেনিন চৌধুরী বলেন, ঢাকার অপরিকল্পিত কংক্রিটাইজেশন ও পার্ক-জলাশয় ধ্বংসের কারণে নগরবাসীর ফুসফুস ও হৃদরোগের সমস্যা মহামারি আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার কারণে মানুষের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে, যা রাজধানীতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও অস্বাভাবিক স্থূলতার হার জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশ ও বুদ্ধিমত্তাও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সার্বিক অনিয়ম প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে পুরো সংস্থার ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে এটি সত্য। আমরা ইতিমধ্যেই পুরো ব্যবস্থাকে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপমুক্ত করতে এবং পরিদর্শকদের ফাইল বাণিজ্য বন্ধ করতে অনলাইন নকশা অনুমোদন ও ডিজিটাল তদারকি ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছি। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান রাজউকের ছাড়পত্র ছাড়া সংযোগ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।