ঢাকা,  রোববার   ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩

[ মতামত ]

গণতন্ত্র কোনো সমাপ্ত আবিষ্কার নয়

রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১০:৫২, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
গণতন্ত্র কোনো সমাপ্ত আবিষ্কার নয়
জীবনে যে সৌন্দর্য, আনন্দ ও অভিজ্ঞতা আমরা অর্জন করি, তা শুধু নিজেদের মধ্যে আটকে না রেখে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও এক ধরনের মূল্য আছে

রোডসের নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আজকাল আমার মনে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। হাজার হাজার বছর আগে এই ভূখণ্ডের কাছাকাছি মানুষ রাষ্ট্র, নাগরিক, আইন ও শাসন নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তুলেছিল, সেগুলোর কতটা আমরা সত্যিই শিখেছি?

গণতন্ত্র নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। নির্বাচন, ভোটাধিকার, সংসদ, রাজনৈতিক দল, সংবিধান, আইনের শাসন। কিন্তু গণতন্ত্রের ভেতরের মানুষটির কথা কতটা বলি? একজন নাগরিক কি শুধু ভোট দেওয়ার মানুষ? 

নাকি তার সত্য বলার অধিকার আছে, প্রশ্ন করার অধিকার আছে, ভুল করার অধিকার আছে, ভিন্নমত পোষণ করার অধিকার আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রের কাছে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোর অধিকার আছে?

আমার মনে হয়, গণতন্ত্রকে বোঝার জন্য দুটি শব্দের দিকে নতুন করে তাকানো দরকার: সততা এবং মর্যাদা। সততা ছাড়া গণতন্ত্রের ওপর আস্থা থাকে না। আর মর্যাদা ছাড়া গণতন্ত্র মানুষের জন্য থাকে না।

প্রাচীন গ্রিসের কাছে ফিরে দেখা

  • আজ আমরা গ্রিসকে গণতন্ত্রের অন্যতম জন্মভূমি হিসেবে দেখি। কিন্তু প্রাচীন গ্রিসের গণতন্ত্রকে আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে এক করে দেখা ভুল হবে। এথেন্সে নাগরিকেরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অংশ নিতেন। Aristotle নাগরিককে এমন ব্যক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, যার deliberative বা বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু সেই নাগরিকত্ব ছিল সীমিত; নারী, দাস ও বিদেশিরা পূর্ণ নাগরিক অধিকারের বাইরে ছিলেন।

অর্থাৎ গণতন্ত্রের ধারণার জন্ম হয়েছিল, কিন্তু গণতন্ত্র তখনও অসম্পূর্ণ ছিল। এখানেই ইতিহাস আমাদের প্রথম শিক্ষা দেয়: কোনো সভ্যতা গণতন্ত্রের ধারণা আবিষ্কার করলেই গণতন্ত্রের পূর্ণ সত্য আবিষ্কার করে ফেলে না।

গণতন্ত্র একটি সমাপ্ত আবিষ্কার নয়। এটি একটি চলমান মানবিক পরীক্ষা। সম্ভবত সেই কারণেই কয়েক হাজার বছর পরেও আমরা একই প্রশ্নের কাছে ফিরে আসি: ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার হবে এবং ক্ষমতার কাছে থাকা মানুষটি কতটা সৎ থাকবে?

সুইডেনের সাম্প্রতিক ঘটনা: একজন মানুষ নয়, একটি প্রশ্ন
এই প্রশ্নটি আজ সুইডেনেও নতুন করে সামনে এসেছে।

২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে লেফটপার্টির(Vänsterpartiet) Mohamed Abdukardir Ali ব্যক্তিগত ভোটে অপ্রত্যাশিতভাবে রিক্সদাগে নির্বাচিত হন। তিনি ৬৪৮টি ব্যক্তিগত ভোট পান এবং দলীয় তালিকার ওপরের কয়েকজন প্রার্থীকে পেছনে ফেলে সংসদে জায়গা করে নেন। এরপর তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাকে ঘিরে সম্ভাব্য ভোট অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। 

  • সুইডিশ টেলিভিশন চ্যানেল জানিয়েছে, তদন্তে তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যদিও তাঁদের কাউকেই তখন আনুষ্ঠানিকভাবে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি। Ali নিজে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, তিনি বিষয়টি শুনে হতবাক হয়েছেন। পরে লেফটপার্টি জানায় যে তিনি তদন্ত চলাকালে সংসদীয় দায়িত্ব থেকে বিরত থাকবেন।

এখানে থেমে কাউকে দোষী বলা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হবে। কারণ অভিযোগ আর অপরাধ এক জিনিস নয়। সন্দেহ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। তদন্ত আর রায় এক জিনিস নয়।

কিন্তু এখানেই গণতন্ত্রের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জন্ম নেয়। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির সততা কীভাবে বিচার করা হবে? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন: তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা কি তাঁর নাগরিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে সত্য অনুসন্ধান করতে পারি?

আমার মনে হয়, প্রকৃত গণতন্ত্রের পরীক্ষা এখানেই। একদিকে অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। অন্যদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে একজন মানুষকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করাও গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচার নয়। সততা চাই, কিন্তু বিচারবোধও চাই। জবাবদিহি চাই, কিন্তু অপমান নয়। আইনের কঠোরতা চাই, কিন্তু আইনের আগে রায় নয়।

সুইডেনের প্রতিষ্ঠান কী বলছে?

  • সুইডিশ রিক্সদাগের নিজস্ব Code of Conduct-এ সংসদ সদস্যদের দায়িত্বের সঙ্গে conflict of interest, আর্থিক স্বার্থ, ঘুষ ও উপহারের বিষয়ে স্পষ্ট নৈতিক নির্দেশনা রয়েছে। সংসদ সদস্যদের আর্থিক স্বার্থ ও বিভিন্ন অঙ্গীকারের একটি প্রকাশ্য রেজিস্টারও রয়েছে, যার উদ্দেশ্যই হলো স্বচ্ছতা তৈরি করা।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণতন্ত্র শুধু মানুষের সততার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। একটি ভালো রাষ্ট্র এমন প্রতিষ্ঠানও তৈরি করে, যেখানে সততা যাচাই করা যায়, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ করা যায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ধরা পড়তে পারে।

অর্থাৎ গণতন্ত্রের একটি মৌলিক শিক্ষা হতে পারে: ভালো মানুষ দরকার, কিন্তু শুধু ভালো মানুষের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র যথেষ্ট ভালো রাষ্ট্র নয়। প্রতিষ্ঠানকে এমন হতে হবে, যেখানে অসততার সুযোগ কমে এবং সত্য গোপন করা কঠিন হয়।

তবু সুইডেনও নিখুঁত নয়। OECD-এর ২০২৬ সালের Trust Survey অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইডেনে জাতীয় সরকারের ওপর উচ্চ বা মাঝারি মাত্রার আস্থা ছিল ৪২ শতাংশ, আর রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা ছিল মাত্র ৩১ শতাংশ। একই সময়ে পুলিশ ও আদালতের ওপর আস্থা ছিল যথাক্রমে ৬৯ ও ৬৫ শতাংশ।

এই পার্থক্যটি ভাবার মতো। মানুষ হয়তো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে, কিন্তু রাজনীতিককে সবসময় একইভাবে বিশ্বাস করে না। তাহলে প্রশ্ন আসে: গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান কি রাজনীতিকদের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে, নাকি রাজনীতিকদের আচরণই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ক্ষয় করছে?

বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে? এই প্রশ্ন বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে করা যায় না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রের জন্য মানুষের সংগ্রাম আছে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আছে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা মানুষ আছে, ভোটাধিকার ও স্বাধীনতার দাবি আছে। অর্থাৎ গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কখনো অনুপস্থিত ছিল না।

কিন্তু গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা আর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এক জিনিস নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি বিরোধী মতকে সম্মান করতে শিখেছি? ক্ষমতায় থাকলে কি বিরোধী মানুষটিরও নাগরিক মর্যাদা স্বীকার করি? 

আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কি কেবল প্রতিপক্ষ, নাকি একই রাষ্ট্রের নাগরিক? আইন কি ক্ষমতাবানের জন্য এক রকম এবং সাধারণ মানুষের জন্য আরেক রকম? আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন: ক্ষমতা হারানোর পরও কি একজন রাজনীতিক তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মর্যাদা রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকেন?

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাও গণতন্ত্রের এই প্রশ্নকে আরও কঠিন করে তোলে। সরকার পরিবর্তনের পরও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, ক্ষোভ ও প্রত্যাশা থেমে নেই। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিদিনের খবর, প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, মতামত এবং মানুষের বক্তব্যে দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহির অভাব, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে অসন্তোষ ও উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। 

রাস্তায় মানুষের প্রতিবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নানা বক্তব্য মিলিয়ে যে চিত্রটি সামনে আসে, তাতে বোঝা যায়, শুধু একটি সরকার পরিবর্তন করলেই মানুষের প্রত্যাশা শেষ হয়ে যায় না। বরং মানুষ জানতে চায়, নতুন ক্ষমতাসীনরা আগের ভুল থেকে কতটা শিক্ষা নেবে এবং ক্ষমতা পাওয়ার পর তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতির প্রতি কতটা সৎ থাকবে।

এখানে একটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও এখনও প্রশ্ন ও সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে মানুষ যা বলছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, মানুষ কি সবকিছু নির্ভয়ে বলতে পারছে? 

এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংবাদমাধ্যমে যে অসন্তোষ, প্রতিবাদ, প্রশ্ন ও সমালোচনা প্রকাশ পাচ্ছে, সেটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এগুলো হয়তো পুরো জনগণের মতামতের পরিসংখ্যান নয়, কিন্তু একটি সমাজের ভেতরের অস্বস্তি, প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। 

আর এখানেই গণতন্ত্রে সততা ও মর্যাদার প্রশ্নটি আবার সামনে আসে: সরকার পরিবর্তন করাই কি গণতন্ত্রের শেষ কথা, নাকি ক্ষমতায় আসার পর মানুষের কথা বলার অধিকার, প্রশ্ন করার অধিকার এবং রাষ্ট্রের কাছে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোর অধিকার নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য দায়িত্ব?

এই তথ্যগুলো কি আশার কথাও বলে? মানুষ গণতন্ত্র ছেড়ে দিতে চায় না। মানুষ বরং ভালো গণতন্ত্র চায়।

তাহলে সততা কী?
সততা শুধু মিথ্যা না বলা নয়।

  • একজন রাজনীতিকের সততা মানে নিজের স্বার্থকে জনস্বার্থের ওপরে না রাখা। নিজের দলের ভুল হলে সেটিও স্বীকার করা। প্রতিপক্ষ সত্য বললে সেটি স্বীকার করার সাহস রাখা। জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে নিজের সীমাবদ্ধতা জানা। আর ক্ষমতায় এসে সেই ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ বা প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করা।

আরও গভীরে গেলে সততা মানে নিজের কাছেও সত্য থাকা। কারণ একজন মানুষ জনসমক্ষে সৎ দেখাতে পারেন, অথচ নিজের সিদ্ধান্তের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিজের কাছেই গোপন রাখতে পারেন।

সেই কারণে গণতন্ত্রে সততার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় ক্ষমতার মুহূর্তে। ক্ষমতা না থাকলে সৎ থাকা সহজ। ক্ষমতা হাতে এসেও সৎ থাকা কঠিন। আর মর্যাদা? মর্যাদা আরও গভীর বিষয়।

একজন প্রধানমন্ত্রী এবং একজন সাধারণ নাগরিকের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সমান নয়। একজন সংসদ সদস্যের ক্ষমতা এবং একজন ভোটারের ক্ষমতা সমান নয়। কিন্তু আইনের সামনে তাদের মানবিক মর্যাদা সমান হওয়া উচিত।

এমনকি যে মানুষটি আমার মতের সম্পূর্ণ বিপরীত, তারও মর্যাদা আছে। যে মানুষটি আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, তারও মর্যাদা আছে। যে মানুষটি আমার দেশ, ধর্ম, ভাষা বা সংস্কৃতির বাইরে, তারও মর্যাদা আছে।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সম্ভবত তখনই হয়, যখন আমরা এমন একজন মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করি, যাকে আমরা পছন্দ করি না। সুইডেনে আলিকে ঘিরে যে অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়টি সামনে এসেছে, তা নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মধ্য দিয়ে সত্যতা যাচাই হওয়া উচিত। 

Ali নিজে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তিনি নিজে অপরাধের সন্দেহভাজন নন। সুইডেনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন SVT জানিয়েছে তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে, আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হোক এবং আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিক। আর যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মেলে, তাহলেও একইভাবে সংশ্লিষ্ট সবার মর্যাদা ও অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকুক।

কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই: আমরা কোনো ব্যক্তিকে পছন্দ করি কি না, সেটি আইনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্য কী, আইন কী বলে এবং বিচার কতটা নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়। এমন একটি ব্যবস্থা যখন নিজের পছন্দের মানুষকে যেমন জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে, তেমনি অপছন্দের মানুষকেও ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে, তখনই আমার মনে হয়, আমি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করছি।

যে গণতন্ত্র শুধু নিজের সমর্থকদের মর্যাদা দেয়, সেটি পূর্ণ গণতন্ত্র নয়। সোমালিয়া, সুইডেন এবং আরও একটি শিক্ষা

সুইডেনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় সোমালিয়াকে ঘিরেও আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। সুইডিশ পার্লামেন্টের সাংবিধানিক বিষয়ক কমিটি ২০২৫–২৬ সালে সোমালিয়ার সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা, অভিবাসন ও প্রত্যাবাসন-সম্পর্কিত অর্থায়ন এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তথ্যপ্রদানের প্রক্রিয়া পরীক্ষা করেছে। কমিটির নথিতে বিভিন্ন অভিযোগ ও সরকারের ব্যাখ্যা দুটোই বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত হয়েছে।

এখানেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো শুধু কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা নয়। প্রশ্ন হলো: কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? কে সিদ্ধান্ত নিয়েছে? 

কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? জনগণের অর্থ কোথায় গেছে? জনগণ কি জানতে পেরেছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: ক্ষমতাবানরা কি নিজেদেরও একই নিয়মের অধীন মনে করেছেন, যে নিয়ম সাধারণ নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য?

এটাই জবাবদিহি। পৃথিবী আমাদের এখন কী শেখাচ্ছে? আজকের পৃথিবীতে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো নির্বাচন নয়। সংকট হলো সত্য।

  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মিথ্যা দ্রুত ছড়ায়, সত্য ধীরে হাঁটে। রাজনৈতিক মেরুকরণ মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে নিজের পক্ষের ভুলও সঠিক বলে মনে হয় এবং প্রতিপক্ষের সত্য কথাও মিথ্যা বলে মনে হয়।

এখানে সততা শুধু ব্যক্তিগত নৈতিক গুণ নয়। এটি গণতন্ত্রের অবকাঠামো।

মানুষ যদি আর কোনো তথ্য বিশ্বাস না করে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস না করে, কোনো নির্বাচনের ফলকে বিশ্বাস না করে, কোনো রাজনীতিকের কথাকে বিশ্বাস না করে, তাহলে গণতন্ত্রের কাঠামো বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে ভেঙে যেতে পারে।

তাই ভবিষ্যতের গণতন্ত্রকে শুধু ভোটের গণতন্ত্রে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একে হতে হবে সত্যের গণতন্ত্র, মর্যাদার গণতন্ত্র এবং জবাবদিহির গণতন্ত্র।

গ্রিসে ফিরে আসা

  • রোডসের সমুদ্রের দিকে আবার তাকাই। সূর্য একইভাবে ওঠে। সমুদ্র একইভাবে ঢেউ তোলে। প্রাচীন পাথরগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সভ্যতা বদলেছে, সাম্রাজ্য বদলেছে, রাজা বদলেছে, সরকার বদলেছে, মানুষের পোশাক বদলেছে।

কিন্তু ক্ষমতার প্রশ্নটি বদলায়নি। কে শাসন করবে? কেন শাসন করবে? কীভাবে শাসন করবে? আর শাসকের কাছে নাগরিকের মূল্য কতটুকু?

হয়তো কয়েক হাজার বছর ধরে আমরা গণতন্ত্রকে আরও উন্নত করেছি। ভোটের অধিকার বিস্তৃত হয়েছে। নারী ভোটাধিকার পেয়েছেন। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। নাগরিকত্বের ধারণা প্রসারিত হয়েছে। সংবিধান তৈরি হয়েছে। আদালত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

তবু মানুষের সবচেয়ে পুরোনো দুর্বলতা রয়ে গেছে: ক্ষমতা পেলে মানুষ নিজেকে অন্য মানুষের চেয়ে বড় ভাবতে শুরু করে।

সেখানেই সততার প্রয়োজন। আর যখন কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিককে ছোট করে, অপমান করে, ভয় দেখায় অথবা তার ভিন্নমতকে তার মর্যাদার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, তখন মর্যাদার প্রয়োজন।

তাই হয়তো গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

  • গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়। গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষমতা পায়, কিন্তু সংখ্যালঘুর মর্যাদা হারায় না। যেখানে সরকার পরিবর্তিত হয়, কিন্তু ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পরিবর্তিত হয় না। 

যেখানে একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হয়, কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে অপরাধী বানানো হয় না। যেখানে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিও আইনের সুরক্ষা পায়, আবার একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তিও আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।

এখানেই সততা ও মর্যাদা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়।

সততা গণতন্ত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে। মর্যাদা গণতন্ত্রকে মানবিক করে। আর জবাবদিহি দুটোকেই টিকিয়ে রাখে।

হয়তো গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শিক্ষা গ্রিস থেকে আজকের পৃথিবীর জন্য এটিই: গণতন্ত্র কোনো সমাপ্ত অর্জন নয়। প্রতিটি প্রজন্মকে তাকে আবার অর্জন করতে হয়।

আর সেই অর্জনের শুরু হয় ভোটকেন্দ্র থেকে নয়, মানুষের বিবেক থেকে।

  • আমার এই গ্রিক ভ্রমণে সহধর্মিণীর সঙ্গে সমুদ্রসৈকতের অপূর্ব দিনগুলো উপভোগ করছি, নীল সমুদ্র, রোদ, বাতাস আর জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো ভিডিও করে আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি। এটি শুধু ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য নয়, আমার কাছে এটি ‘Share Value’-এরও একটি অংশ। 

জীবনে যে সৌন্দর্য, আনন্দ ও অভিজ্ঞতা আমরা অর্জন করি, তা শুধু নিজেদের মধ্যে আটকে না রেখে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও এক ধরনের মূল্য আছে। হয়তো আজকের এই ছোট ছোট দৃশ্য, দুজন মানুষের একসঙ্গে কাটানো আনন্দময় কিছু মুহূর্ত, আগামী প্রজন্মের কারও মনে একটি স্বপ্ন জাগাবে, তাকে মনে করিয়ে দেবে যে জীবন শুধু দায়িত্ব পালনের নাম নয়, জীবনকে অনুভব করাও জরুরি। 

তারা যেন অন্যের জীবন অনুকরণ না করে, নিজেদের স্বপ্ন, সামর্থ্য ও বিবেককে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের মতো করে জীবন গড়ে তুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত আমার এই ভাগ করে নেওয়ার আনন্দটুকু যদি কারও জীবনে সামান্য অনুপ্রেরণাও হয়ে থাকে, তাহলেই এই ‘Share Value’-এর অর্থ পূর্ণ হবে।

লেখক : রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!