স্বীকৃতির আনন্দ ও আত্মকথন
মানুষের জীবনে কিছু প্রাপ্তি আসে অপ্রত্যাশিতভাবে। আমার জীবনেও তেমন একটি ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় সিলেট বিভাগীয় পর্যায়ে আমি ‘গুণী শিক্ষক’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। সত্যি বলতে, নিজের মধ্যে তেমন কোনো বিশেষ গুণ খুঁজে পাই না।
তবু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে এই স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এ জন্য আমি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার কাছে এই প্রাপ্তি আনন্দের, একই সঙ্গে এটি বিনয়ী থাকার এবং নিজের দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার একটি উপলক্ষ।
বিভাগীয় পর্যায়ের স্বীকৃতির পর জাতীয় পর্যায়ের মূল্যায়নে অংশ নিতে ঢাকায় অধিদপ্তরে যেতে হয়েছিল। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে যাঁরা আমার কাজের মধ্যে বিশেষত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন, জাতীয় পর্যায়ের মূল্যায়নে আমি তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। তবে এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।
আমার যোগ্যতার তুলনায় প্রাপ্তিটুকুকে আমি অনেক বড় করে দেখি। স্বীকৃতির চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাতে না পারলেও শিক্ষকতা জীবনের এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, একটি মূল্যায়নের ফল দিয়ে একজন শিক্ষকের পুরো অবদান বিচার করা যায় না।
আমার কাছে এই প্রাপ্তির সবচেয়ে আনন্দের দিক হলো সহকর্মীদের ভালোবাসা। তাঁরা আমার সামান্য অর্জনকে যেভাবে আপন করে নিয়েছেন, তাতে আমি সত্যিই আপ্লুত। বন্ধুবান্ধব ও স্বজনেরাও বারবার উৎসাহ দিচ্ছেন। তাঁদের আন্তরিকতা আমাকে আনন্দিত করে, আবার নিজের প্রতি আরও সচেতনও করে তোলে। কারণ, আমি জানি, অহংকার মানুষের পতনের কারণ হতে পারে।
মানুষের প্রশংসা যেন আমাকে আত্মতুষ্টিতে আটকে না রাখে। বরং এই ভালোবাসা আমাকে আরও দায়িত্বশীল হতে এবং নিজের কাজের প্রতি আরও যত্নবান থাকতে অনুপ্রাণিত করুক।
এই স্বীকৃতির পর আমার পরিচিতির পরিধি কিছুটা বেড়েছে। আগে যেসব অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকা হতো না, এখন সেখান থেকেও আমন্ত্রণ আসছে। ব্যক্তিগতভাবে এসব আয়োজনের কেন্দ্রে থাকতে আমি খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বা নির্দেশনা থাকলে সেখানে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করি। আমার চাওয়া খুব সাধারণ। ভবিষ্যতে যদি আমাকে এসব আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত না করা হয়, তাহলে আমি স্বস্তি পাব। আমি আমার মতো থাকতে চাই। আমার প্রিয় বিদ্যালয়, কোমলমতি শিক্ষার্থী এবং কয়েকজন সহকর্মীর সান্নিধ্যেই আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ খুঁজে পাই।
আমার বাবা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। মা ছিলেন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক। শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে আমার পরিচয় পারিবারিকভাবেই। শিক্ষকতা করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, এই পেশার প্রকৃত সৌন্দর্য পদমর্যাদা বা স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়।
একজন শিক্ষক প্রতিদিন অসংখ্য শিশুর সঙ্গে সময় কাটান। তাদের শেখান, ভুল শুধরে দেন, সাহস জোগান এবং স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করেন। এই কাজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর তৃপ্তি। আমি এমন একটি বিদ্যালয় গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিশুরা শুধু পড়তে ও লিখতে শিখবে না। তারা শিখবে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, আত্মমর্যাদা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা।
সম্প্রতি নবীন শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজের শিক্ষকতা জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। তাঁদের দেখে মনে হয়েছে, শিক্ষকতার নতুন যাত্রা শুরু করার মুহূর্তটি যেমন আনন্দের, তেমনি দায়িত্বেরও।
আমি তাঁদের বলতে চেয়েছি, শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়। এটি একটি অঙ্গীকার। আমাদের হাতে গড়ে ওঠে আগামী দিনের মানুষ। একজন শিক্ষক কখনো কখনো একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে পারেন। তাই পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি শিশুদের ভালোবাসতে হবে, তাদের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে এবং তাদের স্বপ্ন দেখাতে হবে।
নবীন সহকর্মীদের প্রতি আমার আন্তরিক প্রত্যাশা, তাঁরা যেন নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতাকে শিক্ষকতার প্রধান শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশু আলাদা। তাদের চিন্তা, আগ্রহ, সক্ষমতা এবং শেখার গতি এক নয়। সবাইকে একই পদ্ধতিতে শেখানোর চেষ্টা করলে অনেক শিশু পিছিয়ে পড়তে পারে।
তাই শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বুঝে পাঠদান করতে হবে। তাদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে। ভুল করলে অপমান না করে বুঝিয়ে বলতে হবে। শিশুর মনে শেখার আনন্দ তৈরি করতে পারলেই শিক্ষকের শ্রম সার্থক হবে।
আমার শ্রেণিকক্ষে আমি একটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই। সেটি হলো প্রতিটি শিশুর শেখা নিশ্চিত করা। কেউ দ্রুত অক্ষর ও শব্দ চিনতে পারে, কেউ আবার একই কাজের জন্য বেশি সময় নেয়। কারও বাক্য পড়তে সুবিধা হয়, কেউ গণিতের সমস্যা সমাধানে পিছিয়ে থাকে।
তাই পাঠ শেষ করাকেই সাফল্য মনে করি না। বরং কে শিখল, কে শিখতে পারল না এবং কেন পারল না, তা বোঝার চেষ্টা করি। শিক্ষার্থীর সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ দেওয়া, ছোট দলে শেখানো, জোড়ায় কাজের সুযোগ তৈরি এবং উপকরণ ব্যবহার করা এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব শিশু শেখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে, তাদের প্রতি আমাদের বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। তাদের আলাদা করে দেওয়া কিংবা ‘দুর্বল’ বলে চিহ্নিত করা কোনো সমাধান নয়। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হতে পারে। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সময়, সহজ অনুশীলন এবং ব্যক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। আমি চাই, প্রতিটি শিশু অনুভব করুক যে তার পাশে একজন শিক্ষক আছেন। তাকে বলতে চাই, ‘তুমি পারবে, আমরা তোমার পাশে আছি।’ আমার বিশ্বাস, আন্তরিক উৎসাহ ও নিয়মিত সহযোগিতা পেলে অনেক শিশুই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যেতে পারবে।
সম্প্রতি আমার বিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাকে বিশেষভাবে আনন্দিত করেছে। বিভাগীয় পর্যায়ে আমার স্বীকৃতির খবর পেয়ে সদর উপজেলার প্রধান শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধিরা এবং একঝাঁক সম্মানিত শিক্ষক আমার বিদ্যালয়ে এসেছিলেন। তাঁরা ফুল দিয়ে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং কেক কেটে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন।
তাঁদের এই আন্তরিকতা আমার কাছে নিছক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। মনে হয়েছে, শিক্ষকতার পথে আমার যে চেষ্টা, দায়িত্ববোধ ও নীরব শ্রম রয়েছে, তার কিছুটা হলেও সহকর্মীদের কাছে পৌঁছেছে। এই অনুভূতি আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছে।
কিছু সম্মান কাগজে লেখা থাকে, কিছু সম্মান মঞ্চে পাওয়া যায়। আবার কিছু সম্মান মানুষের হৃদয় থেকে আসে। সহকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসাকে আমি তেমনই একটি প্রাপ্তি মনে করি। ফুল একদিন শুকিয়ে যাবে, কেকের স্বাদও ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু এই আন্তরিকতার স্মৃতি আমার মনে দীর্ঘদিন থাকবে।
যাঁরা আমার শিক্ষকতা জীবনে নীরবে উৎসাহ জুগিয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। এই ভালোবাসা আমাকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। আমি চাই, মানুষের এই আস্থার মর্যাদা আমার কাজের মধ্য দিয়ে ধরে রাখতে।
গিয়াসনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিবছর একজন শিক্ষককে তাঁর নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়। এ বছর সেই সম্মাননা পেয়েছেন আমার প্রিয় সহকর্মী সহমিনা আক্তার। তাঁর আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি মমতা এই স্বীকৃতির যথার্থ কারণ। তাঁর সম্মাননা আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ভালো কাজের স্বীকৃতি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
একজন শিক্ষকের অবদান সব সময় দৃশ্যমান হয় না। তবু তাঁর প্রতিদিনের শ্রম অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। তাই শিক্ষককে সম্মান জানানো মানে শিক্ষার মর্যাদাকেই সম্মান জানানো।
শিক্ষক দিবসে নিজের প্রাপ্তি ও অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকিয়ে একটি কথাই বারবার মনে হয়েছে। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি কোনো পদক, উপাধি কিংবা তালিকায় নাম ওঠা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো শিক্ষার্থীদের সাফল্য, ভালোবাসা এবং তাদের ভালো মানুষ হয়ে ওঠা। সিলেট বিভাগের গুণী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়া আমার জন্য আনন্দের ও স্মরণীয় ঘটনা।
জাতীয় পর্যায়ে এগিয়ে যেতে না পারলেও মানুষের ভালোবাসা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। আমি প্রাপ্তির আনন্দকে গ্রহণ করতে চাই, অপূর্ণতাকে মেনে নিতে চাই এবং নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে আরও ভালোভাবে কাজ করে যেতে চাই।
সারাদেশে চৌদ্দ হাজারের বেশি নবনিযুক্ত সহকারী শিক্ষক প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব নিয়ে নতুন পথচলা শুরু করছেন। তাঁদের মধ্যে একজনও যদি আমার অভিজ্ঞতা থেকে সামান্য অনুপ্রেরণা পান, তাহলে এই লেখা সার্থক হবে। আমি তাঁদের বলতে চাই, স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় নয়, শিশুদের শেখানোর আনন্দে কাজ করুন। নিজের দায়িত্বকে ভালোবাসুন।
প্রতিটি শিশুর সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিন। সহকর্মীদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলুন। ভুল থেকে শিখুন এবং প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন, আজ আমার কারণে কোনো শিশু নতুন কিছু শিখতে পেরেছে কি না। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই একজন শিক্ষকের প্রতিদিনের অগ্রযাত্রা।
আমি জানি, আমার পথচলায় সীমাবদ্ধতা আছে। নিজেকে নিখুঁত শিক্ষক বলার কোনো কারণ দেখি না। বরং প্রতিদিন শেখার চেষ্টা করাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি আমাকে আনন্দ দিয়েছে, সহকর্মীদের ভালোবাসা আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে এবং জাতীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা আমাকে নিজের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করেছে। এসবের মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি মূল্য দিই আমার বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের জীবনকে।
শিশুদের মুখের হাসি, তাদের ছোট ছোট সাফল্য এবং সহকর্মীদের আন্তরিকতাই আমার শক্তি। আমি আমার এই ছোট্ট জগৎ নিয়েই ভালো থাকতে চাই। আমার শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হোক, আমার শিক্ষার্থীরা মানুষ হয়ে উঠুক।
লেখক : লতিফা নিলুফার পাপড়ি, প্রধান শিক্ষক (চ.দা), গিয়াসনগর সরকারি প্রাথমিকবিদ্যালয়, মৌলভীবাজার সদর। লেখালেখির সাথে যুক্ত।