ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

ওহীর সূচনা... 

রাসূল (সা.) এর যুগের বিরল ঘটনাবলী
প্রিয়ম হাসান
প্রকাশিত: ২১:২৯, ১৫ আগস্ট ২০২০
ওহীর সূচনা... 
মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

ওহী বা ওয়াহী (আরবি: وحي‎‎) শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, এমন সূক্ষ্ম ও গোপন ইশারা, যা ইশারাকারী ও ইশারা গ্রহণকারী ছাড়া তৃতীয় কেউ টের পায় না।

এ সম্পর্কের ভিত্তিতে এ শব্দটি ইলকা বা মনের মধ্যে কোনো কথা নিক্ষেপ করা ও ইলহাম বা গোপনে শিক্ষা ও উপদেশ দান করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। ব্যবহারিক ভাবে ওহী দ্বারা ইসলামে আল্লাহ কর্তৃক রাসূলদের প্রতি প্রেরিত বার্তা বোঝানো হয়। কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে,

إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِن بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإْسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالأَسْبَاطِ وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَارُونَ وَسُلَيْمَانَ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا

‘আমি আপনার প্রতি ওহী পাঠিয়েছি, যেমন করে ওহী পাঠিয়েছিলাম নূহের প্রতি এবং সে সমস্ত নবী-রাসূলের প্রতি যারা তাঁর পরে প্রেরিত হয়েছেন। আর ওহী পাঠিয়েছি, ইসমাঈল, ইব্রাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব, ও তাঁর সন্তাবর্গের প্রতি এবং ঈসা, আইয়ুব, ইউনূস, হারুন ও সুলায়মানের প্রতি। আর আমি দাউদকে দান করেছি যবুর গ্রন্থ। (সূরা: আন নিসা, আয়াত: ১৬৩)।

Advertisement

অন্য আয়াতে বলা হয়,

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَاء حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاء إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ

‘কোনো মানুষের জন্য এমন হওয়ার নয় যে, আল্লাহ তার সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা পর্দার অন্তরাল থেকে অথবা তিনি কোনো দূত প্রেরণ করবেন, অতঃপর আল্লাহ যা চান, সে তা তাঁর অনুমতিক্রমে পৌঁছে দেবে। নিশ্চয় তিনি সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাময়। (সূরা: আশ-শুরা, আয়াত: ৫১)।

প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ওপর ওহীর সূচনা-

মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ৩৯ পেরিয়ে গেলে একাকীত্বের প্রতি তাঁর অনুরাগ বেড়ে যায়। তাঁর মহিয়ষী স্ত্রী উম্মুল মু‘মিনীন হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন বিরাট ঐশ্বর্যশালী নারী। তদুপরি স্বয়ং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিশ্বস্ততা, নিষ্ঠা, সততা ও ব্যবসায়ের মাধ্যমে তার সম্পদে বিপুল সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ঐশ্বর্য দেখে খুশি হওয়ার পরিবর্তে মাহাবুবে হাকীকী তথা প্রকৃত প্রেমাস্পদের অন্বেষায় উদ্বিগ্ন থাকতে থাকেন। 

তিনি অবসরকে সাধনা আর ঐশ্বর্যকে এবাদতে পরিণত করে নেন। সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। এ ব্যাকুলতা তাকে নির্জনতার প্রতি আকর্ষণ করতে থাকে। তাঁর ব্যাকুল হৃদয় নির্জনবাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়ে। যেখানে কেউ থাকবে না। কাজেই তিনি মক্কা থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে পূর্ব দিক অবস্থিত হেরা গুহাকে এ নির্জনবাসের জন্য নির্ধারিত করেন। সেখানেই তিনি চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যানে মগ্ন থাকতে শুরু করেন। অনেক সময় এ গুহায় ক্রমাগত কয়েক দিন কেটে যেত। পানি কিংবা খাবার শেষ হয়ে গেলে অল্প সময়ের জন্য বাড়ি আসতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ব্যাকুলতা ও উৎকন্ঠাও বেড়ে যেতে থাকেন।

আত্নার নৈসর্গিক ও পূতপবিত্র ব্যাকুলতা প্রকৃত প্রেমাস্পদের কাছে পৌঁছার জন্য অনুরাগের ওপর বিপুল চাপ প্রয়োগ করতেন আর আত্না ডেকে ডেকে বলতো:

হে আমার মাবুদ তুমি কোথায়?

কেন চেহারার পর্দা উন্মোচন করছো না?

কেন নিজের ভূবন মোহন রুপচ্ছটায় এই তমসার অবসান ঘটাচ্ছো না; যার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে আছি।

তারপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সিাল্লামের বয়স যখন উনচল্লিশ বছর তিন মাস ষোল দিন অতিক্রম করে, তখন ৯ই রবিউল আউয়াল সোমবার মোতাবেক ১৩ই ফেব্রুয়ারি ৬১০ খ্রীষ্টাব্দের রাতে তিনি হেরার গুহায় ধ্যানমগ্ন, তখন প্রথম জিবরাঈল আমিন (আ.) এসে উপস্থিত হন। তিনি তাকে দেখে বিস্মিত হয়ে উঠেন। হজরত জিবরাঈল (আ.) বলেন,

‘হে মুহাম্মাদ, সুসংবাদ গ্রহণ করুন; আপনি আল্লাহর রাসূল আর আমি হলাম জিবরাঈল।

(কোনো কোনো রেওয়াত অনুযায়ী  এ ঘটনাটি দিনের বেলায় ঘটেছিলো বলে উল্লেখ করা হয়েছে)।

জিবরাঈল আমিন এ সুসংবাদ দিয়ে চলে গেলেন বটে কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কঠিন উৎকন্ঠা ছেয়ে গেল। অথচ এটাই ছিলো তাঁর হৃদয়বিদারক অপেক্ষার সমাপ্তি। সমগ্র আসমান-জমিন সৃষ্টিলগ্ন থেকে অধিক আগ্রহে এরই অপেক্ষা করছিলো।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ব্যাকুলতা ছিলো সেই অপার্থিব ও পূত পবিত্র ব্যাকুলতা, যা নাহলে একজন নবীর পক্ষে নবী হওয়ার কোনো প্রমানই থাকে না। এ ব্যাকুলতা সম্পর্কেই আল্লামা শিবলি নু‘মানী (রা.) বলেছেন, ‘এ উৎকন্ঠা আর ব্যাকুলতা আসলে আল্লাহর পরাক্রমের প্রভাব এবং নবুওতের গুরুদায়িত্বের মহত্ব চিন্তার কারণেই ছিলো।’

তিনি কি দেখলেন? হজরত জিবরাঈল (আ.)) কি বললেন? কি কি প্রতক্ষণ হলো? এসব বিষয় ভাষায় ব্যক্ত কার অসম্ভব।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত উদ্বেগাকুল অবস্থায় বাড়ি ফিরে এলেন। মহিয়ষী স্ত্রী খাদিজা (রা.)-কে হেরার গুহায় ফেরেশতার আগমন এবং সুসংবাদ দানের ঘটনা শুনিয়ে বলেন: 

‘খাদিজাহ, আমি এমন ঘটনা দেখেছি যাতে আমার প্রাণের ভয় দেখা দিয়েছে।’ (সীরাতুন নবী, ১ম খণ্ড, ১৮৯ পৃ:)।

একজন স্বামীকে স্ত্রী অপেক্ষা অধিক আর কে জানতে পারে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের এমন কোন দিনটি থাকতে পারে যা হজরত খাদিজা (রা.)-এর কাছে গোপন থাকতে পারতো। তিনি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষা কোনো উত্তম ব্যক্তি কখনো দেখেনি।

তিনি তাঁর আশা-আকাঙ্খা সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন। তাই তিনি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে এসব ঘটনা শোনা মাত্র নিজের অজান্তেই বলে উঠলেন:

(১) ‘কক্ষণো নয়, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনো কষ্ট দেবেন না।

(২) আপনি -আপনজনদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেন।

(৩) আপনি অনাথ-অসহায় ও গরিব-দুঃখী মানুষের দায় বহন করেন।

(৪) যার কাছে কিছু থাকে না তাকে দান করেন।

(৫) মেহমানদের মেহমানদারী করেন।

(৬) বিপদকালে ন্যায়ের সহায়তা করেন।

(৭) আপনি সত্যবাদি।’

এ বিবরণটি হলো হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওতপূর্ব জীবনের একটি পরিচ্ছন্ন চিত্র। এ থেকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূতচরিত্রের সঠিক চিত্র নির্ণয় করা যেতে পারে। এ ছিলো তাঁর জীবন-সঙ্গিনীর অবচেতন মনের ঘোষণা যা নিষ্ঠা ও সত্যবাদিতার জলজ্যান্ত ছবি।

সূত্র: রাসূল (সা.) এর যুগের বিরল ঘটনাবলী

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএজে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!