ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-২)

ওমর শাহ
প্রকাশিত: ১৫:৩৪, ১৬ আগস্ট ২০২০
ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-২)
ফেতনার যুগে মিথ্যা কথা বলাকে হালাল মনে করা হবে। অর্থাৎ মিথ্যা বলতে পারাকে একটি দক্ষতা ও যোগ্যতা মনে করা হবে এবং উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ করা হবে।

গুম, হত্যা ও লুটতরাজ একটি ফেতনা:

এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ أَيَّامًا، يُرْفَعُ فِيهَا العِلْمُ، وَيَنْزِلُ فِيهَا الجَهْلُ، وَيَكْثُرُ فِيهَا الهَرْجُ وَالهَرْجُ, القَتْلُ

তোমাদের পরে এমন একটি যুগ আসবে যখন ইলম তুলে নেয়া হবে এবং হারায’র সংখ্যা অনেক বেশি হবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হারায কি জিনিস? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হত্যা ও লুটতরাজ। অর্থাৎ সেই যুগে গুম, হত্যা ও লুটতরাজ এত বেশি হবে যে, মানুষের জীবন মশা-মাছির চেয়েও মূল্যহীন হবে। (বুখারি)।

Advertisement

আরো পড়ুন >>> ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-১)

অন্য আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ يَوْمٌ لَا يَدْرِي الْقَاتِلُ فِيمَ قَتَلَ، وَلَا الْمَقْتُولُ فِيمَ قُتِلَ " فَقِيلَ, كَيْفَ يَكُونُ ذَلِكَ؟ قَالَ, ্রالْهَرْجُ، الْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِগ্ধ

‘একটি যুগ এরূপ আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না কেন সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তি জানবে না কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে। (মুসলিম)।

বর্তমান যুগের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে মনে হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুগের অবস্থা দেখে উপরিউক্ত কথাটি বলেছেন। আগের যুগে যেটা হত, হত্যাকারী কে, এটা জানা না গেলেও কেন হত্যা করা হয়েছে তা জানা যেত। উদাহরণত, শত্রুতার জেরে হত্যা করা হয়েছে কিংবা ডাকাতরা হত্যা করেছে কিংবা ধন-সম্পদ রক্ষা করতে যেয়ে নিহত হয়েছে; নিহত হওয়ার কারণ প্রকাশ হয়ে পড়ত। কিন্তু বর্তমান অবস্থা হলো, এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে; তার সঙ্গে কারো লেনদেন নেই, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই, কারো সঙ্গে বিবাদ নেই, ব্যস, শুধু শুধু মারা পড়ল।

মক্কা শরিফ সম্পর্কে একটি হাদিস:

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন মক্কা শরিফের উদর বিদীর্ণ করা হবে এবং তার মধ্য দিয়ে নদীর মতো প্রশস্ত রাস্তা তৈরি হবে আর নির্মিত ভবনগুলো মক্কা শহরের পাহাড়গুলোর চেয়ে উঁচু হবে তখন মনে কর ফেতনার সময় সন্নিকটে।

আজ থেকে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত এ হাদিসের সঠিক অর্থ মানুষের বুঝে আসেনি, এখন সবাই বুঝেছে।

মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ হওয়া:

আলোচ্য হাদিসটি চৌদ্দশ বছর যাবত হাদিসের কিতাবে সংকলিত হয়ে আসছে। হাদিসটির ব্যাখ্যা দানের সময় হাদিসের ব্যাখ্যাকারগণ বিস্মিত হতেন যে, মক্কা শহরের উদর কীভাবে বিদীর্ণ হবে? এবং নদীর মতো রাস্তা হওয়ার অর্থ কি? কিন্তু আজকের মক্কা শহরকে দেখলে মনে হবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজকের মক্কা শহরকে দেখে উপরিউক্ত কথা বলেছেন। 

আজকে মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ করে অসংখ্য সুরঙ্গ-পথ নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্বেকার হাদিসের ব্যাখ্যাকারগণ আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যা দানকালে বলতেন, এখন তো মক্কা শরিফ পাথুরে ভূমি এবং পাহাড়ি এলাকা তবে ভবিষ্যতে কোনো কালে আল্লাহ তায়ালা এ শহরে নদী এবং খাল-বিল সৃষ্টি করবেন কিন্তু আজকের সুরঙ্গ-পথগুলো দেখে বুঝা যাচ্ছে যে, কীভাবে মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ করা হয়েছে।

বিল্ডিংসমূহ পাহাড়ের চেয়ে উঁচু হওয়া:

আলোচ্য হাদিসের দ্বিতীয়াংশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন মক্কা শরিফের ভবনগুলো এর পাহাড়গুলোর চেয়ে উঁচু হবে...। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও কেউ ভাবতেই পারেনি যে, মক্কা শরিফে পাহাড়ের চেয়েও উঁচু কোনো ভবন নির্মিত হবে। কারণ পুরা মক্কা শরিফ পাহাড়ি এলাকার মাঝে অবস্থিত। কিন্তু আজকে গিয়ে দেখুন, পাহাড়ের চেয়ে উঁচু উঁচু কত ভবন নির্মিত হয়েছে।

উপরিউক্ত হাদিসগুলো থেকে বুঝা যায় যে, চৌদ্দশত বছর আগেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজকের অবস্থা স্বচক্ষে দেখে তা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহপ্রদত্ত ওহী ও ইলমের মাধ্যমে এসব অবস্থা দিবালোকের ন্যায় তাঁর কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তিনি প্রতিটি বিষয়ে খুলে খুলে আগত উম্মতের জন্য বলে গেছেন।

হাদিসের আলোকে বর্তমান যুগ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব হাদিসে আগত ফেতনাসমূহের কথা বর্ণিত হয়েছে সেগুলো মুসলমানদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখা উচিত। হজরত মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ লুধিয়ানবী রহ. হাদিসের দৃষ্টিতে বর্তমান যুগ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটিতে তিনি ফেতনার যুগ সম্পর্কিত প্রায় সব হাদিসগুলো একত্র করেছেন। তাতে তিনি এমন একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফেতনার যুগের বাহাত্তরটি আলামত বলেছেন। হাদিসটি পড়ুন এবং আজকের অবস্থা মিলিয়ে দেখুন। দেখবেন, আজকের অবস্থার সঙ্গে হাদিসের বক্তব্যের কি চমৎকার মিল,

ফেতনার বাহাত্তরটি নিদর্শন:

হজরত হুজায়ফা রাদি. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেয়ামতের পূর্বে বাহাত্তরটি বিষয় প্রকাশ পাবে। 

১. লোকেরা নামাজে ডাকাতি করবে। অর্থাৎ নামাজের প্রতি মানুষের একদম গুরুত্ব থাকবে না। এ কথাটি আজকের যুগে এতটা আশ্চর্যের নয়। কারণ এ যুগে অধিকাংশ মুসলমানের মাঝেই নামাজের গুরুত্ব নেই। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এ কথা বলেছিলেন তখন নামাজ ঈমান এবং কুফুঁরের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয় বলে পরিগণিত ছিল। সে যুগে একজন মুসলমান যত খারাপই ছিল না কেন, যত মারাত্মক বদকার ও ফাসেকই ছিল না কেন, তারা কিছুতেই নামাজ ছাড়তেন না। সে যুগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরিউক্ত কথাটি বলেছিলেন।

২. আমানতের খেয়ানত করবে। অর্থাৎ তাদের কাছে আমানতরূপে যা কিছু রাখা হবে তা তারা আত্মসাৎ করবে।

৩. সুদের লেনদেন করবে।

৪. মিথ্যা কথা বলাকে হালাল মনে করবে। অর্থাৎ মিথ্যা বলতে পারাকে একটি দক্ষতা ও যোগ্যতা মনে করা হবে।

৫. সামান্য বিষয়ে রক্তপাত করবে এবং অন্যের প্রাণ সঙ্ঘার করবে।

৬. উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ করবে।

৭. দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া উপার্জন করবে।

৮. আত্মীয়দের সঙ্গে বাজে আচরণ করবে।

৯. ইনসাফ উঠে যাবে।

১০. মিথ্যা সত্যতে পরিণত হবে।

১১. রেশমি পোশাক পরিধান করা হবে।

১২. জুলুম-অত্যাচার ব্যাপকরূপ লাভ করবে।

১৩. তালাকের আধিক্য হবে।

১৪. আকস্মিক মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে।

১৫. দুর্নীতিপরায়ণ লোকদেরকে সৎলোক মনে করা হবে।

১৬. সৎলোকদেরকে দুর্নীতিপরায়ণ মনে করা হবে।

১৭. মিথ্যাকে সত্য মনে করা হবে।

১৮. সত্যকে মিথ্যা বলা হবে।

১৯. অপবাদ আরোপের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

২০. বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও পরিবেশ উষ্ণ থাকবে।

২১. লোকেরা সন্তান লাভের পরিবর্তে সন্তান নেয়াকে অপছন্দ করবে। অর্থাৎ সন্তান লাভের জন্য মানুষ যেভাবে দোয়া করে তার পরিবর্তে সন্তান না হওয়ার জন্য দোয়া করবে এবং বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করবে। যেমন, আজকাল পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।’

২২. নীচ লোকেরা সম্পদশালী হবে এবং অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপন করবে।

২৩. ভদ্রলোকেরা নিগৃহিত হবে।

২৪. রাষ্ট্রপ্রধান, শাসকবর্গ ও মন্ত্রিপরিষদ এবং তাদের সমর্থক ও সহযোগীরা মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে এবং সকাল-বিকেল মিথ্যা কথা বলবে।

২৫. আমানতদার ব্যক্তি খেয়ানত করবে।

২৬. নেতৃবর্গ জালেম ও অত্যাচারী হবে।

২৭. আলেম এবং ক্বারী বদকার হবে। 

২৮. লোকেরা জীবজন্তুর চামড়া দ্বারা তৈরি উন্নতমানের পোশাক পরবে।

২৯. কিন্তু তাদের দিলগুলো মৃত জন্তুর চেয়ে বেশি দুর্গন্ধময় হবে।

৩০. এবং পাথরের চেয়ে বেশি কঠিন হবে।

৩১. স্বর্ণ সুলভ হবে।

৩২. রূপার মূল্য বেড়ে যাবে।

৩৩. গুনাহর পরিমাণ বেড়ে যাবে।

৩৪. জানমালের নিরাপত্তা কমে যাবে।

৩৫. কোরআন শরিফকে সজ্জিত করা হবে।

৩৬. মসজিদকে কারুকার্যময় করা হবে।

৩৭. উঁচু উঁচু সৌধ নির্মিত হবে।

৩৮. হৃদয়গুলো উজাড় হবে।

৩৯. ব্যাপকভাবে মদ পান করা হবে।

৪০. শরীয়তের দণ্ডবিধিকে অকার্যকর করা হবে।

৪১. দাসী স্বীয় মুনিবকে জন্ম দেবে। অর্থাৎ মেয়ে মায়ের ওপর কর্তৃত্ব করবে এবং এরূপ ব্যবহার করবে, যেরূপ মুনিব দাসীর সঙ্গে ব্যবহার করে।

৪২. এক সময় যারা খালি পায়ে ও উন্মুক্ত দেহে চলাফেরা করত এরূপ নীচ শ্রেণির লোকেরা দেশের শাসক বনে যাবে।

৪৩. পুরুষ ও নারী যৌথভাবে ব্যবসায় করবে। নারীরা জীবনের সব ক্ষেত্রে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।

৪৪. পুরুষরা নারীদের বেশভূষা ধারণ করবে।

৪৫. নারীরা পুরুষদের বেশভূষা ধারণ করবে। দূর থেকে দেখে বুঝা যাবে না, এটা পুরুষ না নারী।

৪৬. গায়রুল্লাহর নামে শপথ করা হবে। অর্থাৎ শপথ শুধু আল্লাহর নামে এবং কোরআনের ওপর বৈধ, অন্য কোনো কিছুর নামে শপথ করা হারাম। কিন্তু ফেতনার যুগে মানুষ আল্লাহ ভিন্ন অন্যান্য জিনিসের নামেও শপথ করবে।

৪৭. মুসলমানরাও বলা ছাড়াই মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত থাকবে।

৪৮. শুধু পরিচিত লোকদেরকে সালাম দেয়া হবে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা হলো,

السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ

‘তুমি যাকে চেন তাকেও সালাম কর এবং যাকে তুমি চেন না তাকেও সালাম কর।’

বিশেষ করে পথ চলার সময় পথে কারো সঙ্গে সাক্ষাত হলে তাদের সবাইকে সালাম করা উচিত। কিন্তু গমনাগমনকারী লোকদের সংখ্যা অনেক বেশি হলে এবং সালামের কারণে নিজের কাজে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তখন সালাম না দেয়ারও অবকাশ আছে। কিন্তু একটা সময় আসবে যখন গমনাগমনকারীদের সংখ্যা এক-দুজন হলেও সালাম দেয়া হবে না; সালামের রেওয়াজ একবারেই উঠে যাবে।

৪৯. দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে দ্বীনের ইলম শিক্ষা দেয়া হবে। শিক্ষা অর্জনকারীদের উদ্দেশ্য হবে এর মাধ্যমে আমাদের ডিগ্রী লাভ হবে, চাকরি পাওয়া যাবে, পয়সা উপার্জন করা যাবে এবং সম্মান ও খ্যাতি অর্জিত হবে।

৫০. আখেরাতের কাজের দ্বারা দুনিয়া উপার্জন করা হবে।

চলবে...

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!