ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে: জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত কীভাবে বদলায়

আল মামুন রিটন
প্রকাশিত: ১১:৫৩, ৮ অক্টোবর ২০২৬
মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে: জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত কীভাবে বদলায়
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা আরও নির্ভুলভাবে ট্র্যাক করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্যাটার্নগুলো কেমন ভিন্ন হয়, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

এক সময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, বড় হওয়ার পর মানুষের মস্তিষ্ক আর বিশেষ বদলায় না। শৈশবেই মস্তিষ্কের গঠন আর সংযোগ তৈরি হয়ে যায়, এরপর সেটা প্রায় একই রকম থাকে। কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ক্ষতি ফিরিয়ে আনার সুযোগও খুব কম। নিউরোসায়েন্সে এই ধারণা অনেক দিন ধরে টিকে ছিল।

কিন্তু পরের গবেষণাগুলো দেখাল, বিষয়টা আসলে তেমন নয়। মস্তিষ্ক এতটা অনড় নয়। নতুন অভিজ্ঞতা, শেখা, পরিবেশ এমনকি আঘাতের পরও মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগ ও কার্যক্রম বদলাতে পারে। এই ক্ষমতার নামই নিউরোপ্লাস্টিসিটি।

  • এর ইতিহাস একদিনে লেখা হয়নি। উনিশ শতকের শেষ দিকে সান্তিয়াগো রামোন ই কাহাল স্নায়ুকোষ নিয়ে কাজ করে বলেছিলেন, স্নায়ুতন্ত্রের সংযোগ পুরোপুরি স্থির নয়, অভিজ্ঞতার সঙ্গে বদলাতে পারে। তবে তখন হাতে যথেষ্ট পরীক্ষামূলক প্রমাণ ছিল না।
  • বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হতে শুরু করে। 

১৯৪৯ সালে কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হেব একটা ধারণা দেন। তিনি বলেন, যে নিউরনগুলো বারবার একসঙ্গে সক্রিয় হয়, তাদের মধ্যেকার সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁর এই কথাটি পরে পরিচিতি পায় এভাবে, “neurons that fire together, wire together.” নিউরোপ্লাস্টিসিটির তত্ত্বের একটা বড় ভিত্তি ছিল এটিই। পরে প্রাণীদের নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, পরিবেশ আর অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের গঠনেও ছাপ ফেলে। 

১৯৬০-এর দশকে মার্ক রোজেনজভেইগ ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেন, সমৃদ্ধ পরিবেশে থাকা ইঁদুরের মস্তিষ্কে স্নায়বিক পরিবর্তন ঘটে। আবার আঘাতের পর কিছু প্রাণীর মস্তিষ্কের অন্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত জায়গার কিছু কাজ নিজে থেকে নিয়ে নিতে পারে।

মানুষের স্মৃতিশক্তি কীভাবে কাজ করে এবং তা বাড়ানো সম্ভব কি?

মানুষের ক্ষেত্রেও প্রমাণ জমতে থাকে। স্ট্রোকের পর পুনর্বাসন নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষতির পর মস্তিষ্কের অবশিষ্ট অংশ নতুন করে কাজ গুছিয়ে নিতে পারে। বাদ্যযন্ত্রশিল্পী বা দক্ষতাভিত্তিক কাজ করা মানুষদের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণাতেও দীর্ঘ অনুশীলনের সঙ্গে নির্দিষ্ট অঞ্চলের কার্যকরী, কখনও কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

আজ আমরা জানি, নিউরোপ্লাস্টিসিটি মানে মস্তিষ্ক ইচ্ছেমতো নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে ফেলে, তা নয়। এরও সীমা আছে। বয়স, আঘাতের ধরন, সময় আর পরিবেশের ওপর এর মাত্রা নির্ভর করে। তবু শেখা, স্মৃতি, অভ্যাস, দক্ষতা অর্জন এবং কিছু ক্ষেত্রে আঘাত থেকে সেরে ওঠার পথে নিউরোপ্লাস্টিসিটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

মস্তিষ্ক কোনো অপরিবর্তনীয় যন্ত্র নয়। আমরা যা শিখি, যেভাবে অনুশীলন করি, যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই, সেসব মস্তিষ্কের স্নায়বিক নেটওয়ার্ক বদলে দিতে পারে। নিউরোপ্লাস্টিসিটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই, মস্তিষ্ক শুধু অভিজ্ঞতা ধরে রাখে না, অভিজ্ঞতাও মস্তিষ্ককে কিছুটা বদলে দেয়।

মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ বা ‘চ্যাটার’। এবার বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এই মস্তিষ্কীয় যোগাযোগের নির্দিষ্ট ধরণগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাটলাস বা ম্যাপ তৈরি করেছেন এবং দেখিয়েছেন, জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত এই ধরণগুলো কীভাবে বদলায়।

এই গবেষণায় প্রায় ৩,৬০০ জন মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান ব্যবহার করা হয়েছে, যাদের বয়স ১৬ দিনের নবজাতক থেকে ১০০ বছরের প্রবীণ পর্যন্ত। এতে ‘ফাংশনাল কানেক্টিভিটি’ নামে একটি বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সমন্বয়ের মাত্রা বোঝায়। গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ বয়সে এই সংযোগের নির্দিষ্ট কিছু ধরণ বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

  • পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী জ্যাকব সাইডলিটজ (যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ন) বলেন এই ধরনের গাইড ভবিষ্যতে বিকাশজনিত সমস্যা বা স্নায়ুর ক্ষয়জনিত রোগ কখন শুরু হয় তা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। গবেষণাটি গত ২৫ মার্চ, ২০২৬ Nature জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

প্যানসাইকিজম: পরমাণু থেকে মস্তিষ্কের বিবর্তনে চেতনার চিরন্তন আলো |  বিজ্ঞানচিন্তা

মস্তিষ্কের ভেতরের সংযোগ বোঝা
মস্তিষ্ক সবসময় সক্রিয় থাকে। অনেক সময় দূরের দুটি অঞ্চল একসঙ্গে সক্রিয় হয়, যা ইঙ্গিত দেয় তারা একই কাজ সম্পন্ন করতে একসঙ্গে কাজ করছে। এদের বলা হয় ‘ফাংশনালি কানেক্টেড’, যদিও তারা শারীরিকভাবে কাছাকাছি নাও থাকতে পারে।

এই সংযোগগুলো কীভাবে সংগঠিত তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের অঞ্চলগুলোকে বিভিন্ন স্কেল বা অক্ষ বরাবর সাজান। এই গবেষণায় তিনটি প্রধান ফাংশনাল অক্ষ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর একটি হলো ‘সেন্সরি-টু-অ্যাসোসিয়েশন’ অক্ষ, যা এমন একটি ধারাবাহিকতা দেখায় যেখানে এক প্রান্তে রয়েছে সংবেদন প্রক্রিয়াজাতকারী অঞ্চল, আর অন্য প্রান্তে রয়েছে জটিল চিন্তা ও তথ্য বিশ্লেষণে যুক্ত অঞ্চল।

এই অক্ষের মাঝামাঝি অংশে থাকা অঞ্চলগুলো সংবেদন ও জটিল চিন্তার মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে। ফলে তারা উভয় ধরনের নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।

মস্তিষ্কের গভীরে চেতনা!** আমরা যখন কোনও কিছু দেখি, শুনি, অনুভব করি বা  চিন্তা করি—তখন সেই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে কিছু কিছু আমাদের মনে থাকে, আর ...

বয়সের সঙ্গে পরিবর্তন
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জানতে চেয়েছেন, মস্তিষ্কের এই সংগঠন কীভাবে গড়ে ওঠে। ২০২২ সালে মস্তিষ্কের টিস্যুর একটি গ্রোথ চার্ট তৈরি হলেও ফাংশনাল কানেক্টিভিটির এমন পূর্ণাঙ্গ গাইড আগে তৈরি করা যায়নি।

  • এই গবেষণায় ৩,৫৫৬ জন মানুষের ফাংশনাল এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, তিনটি ফাংশনাল অক্ষই শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন পথে বিকশিত হয়।

উদাহরণ হিসেবে, সেন্সরি-টু-অ্যাসোসিয়েশন অক্ষের দুই প্রান্তের সংযোগের পার্থক্য শিশু ও কিশোর বয়সে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় এবং প্রায় ১৯ বছর বয়সে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই পরিবর্তন তরুণ মস্তিষ্ককে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সংগঠনের দিকে নিয়ে যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, যেসব তরুণের মস্তিষ্কের সংযোগের ধরন গড় মানের সঙ্গে বেশি মিল, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পারফরম্যান্স, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ গতি এবং স্মৃতিশক্তি তুলনামূলকভাবে ভালো।

অন্য একটি অক্ষ, যা মানসিক নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যের মানসিক উপস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত, তা প্রাথমিক মোটর দক্ষতা বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। এর মানে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন সংযোগ প্যাটার্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

Human Brain Storage: মানুষের মস্তিষ্ক কত GB-র? বিজ্ঞানীরা যা জানাচ্ছেন... -  how much gb data can store in human brain know what scientists statement  mdv - Aaj Tak Bangla

ভবিষ্যৎ গবেষণার দিক
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল এলিয়ট বলেন, এই অ্যাটলাস পুরো জীবনের জন্য মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ। তবে এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট সংগঠন পুরোপুরি দেখাতে পারে না।

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা আরও নির্ভুলভাবে ট্র্যাক করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্যাটার্নগুলো কেমন ভিন্ন হয়, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!