মানুষের সামাজিক আচরণের পেছনে রয়েছে বিবর্তনীয় কারণ
মানুষ নিজেকে স্বাধীনচেতা মনে করে। তার নিজস্ব চিন্তা, বিশ্বাস, পছন্দ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তবু বাস্তবে আমরা অনেক সময় নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করি, নিজের মতামত প্রকাশ করি না, এমনকি যে বিষয়টিকে ভুল মনে করি, সেটিকেও সামাজিক চাপে মেনে নিই। কারণ, আমরা শুধু নিজের জন্য বাঁচি না; পরিবার, সমাজ ও অন্য মানুষের স্বীকৃতির মধ্যেও নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পাই।
মানুষের সামাজিক আচরণের পেছনে বিবর্তনীয় কারণ রয়েছে। আদিম সমাজে দলবদ্ধ থাকা ছিল বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। দল থেকে বিচ্ছিন্ন হলে খাদ্য সংগ্রহ, আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তা কঠিন হয়ে পড়ত।
তাই মানুষের মধ্যে গোষ্ঠীর সঙ্গে থাকার এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আজও সামাজিক প্রত্যাখ্যান আমাদের মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে। আমরা অনেক সময় নিজের ইচ্ছার চেয়ে সামাজিক সম্পর্ক ও গ্রহণযোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দিই।
মনোবিজ্ঞানী সলোমন অ্যাশের বিখ্যাত Conformity Experiment দেখিয়েছে, মানুষ অনেক সময় নিজের চোখে সঠিক উত্তর দেখার পরও সংখ্যাগরিষ্ঠের ভুল উত্তরের সঙ্গে একমত হয়।
এর কারণ, আমরা ভাবি অধিকাংশ মানুষ হয়তো সঠিক। আবার কখনো সঠিক উত্তর জানা সত্ত্বেও অন্যদের থেকে আলাদা হতে চাই না। অর্থাৎ, আমরা শুধু সত্য খুঁজি না; অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য থাকতেও চাই।
সমাজে নিজের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। সমাজবিজ্ঞানী এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যানের Spiral of Silence তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন মনে করে তার মতামত সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপরীত, তখন সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভয়ে সে নীরব হয়ে যায়।।ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনেক মানুষ ভিন্নমত পোষণ করলেও কেউ তা প্রকাশ করে না। তখন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত আরও শক্তিশালী বলে মনে হয়।
আমাদের পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, ধর্মীয় সম্প্রদায়, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গেও পরিচয় জড়িত।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানের Social Identity Theory অনুযায়ী, মানুষ নিজের পরিচয়ের একটি অংশ গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার মাধ্যমে তৈরি করে।
তাই নিজের গোষ্ঠীর প্রচলিত বিশ্বাসের বিরোধিতা করতে গেলে অনেক সময় মনে হয়, যেন নিজের পরিচয়কেই অস্বীকার করছি। এই আশঙ্কা আমাদের স্বাধীন মতপ্রকাশকে সীমিত করে।
মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঙ্গারের Cognitive Dissonance তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের বিশ্বাস ও আচরণের মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে মানসিক অস্বস্তি হয়।
ধরা যাক, একজন মানুষ কোনো সামাজিক প্রথাকে অন্যায় মনে করেন, কিন্তু সমাজের চাপে সেটিই মেনে চলেন। একসময় নিজের আচরণকে যুক্তিসংগত প্রমাণ করতে তিনি ভাবতে শুরু করেন, ''সমাজে থাকতে হলে এসব মেনে নিতেই হয়।"' এভাবে সামাজিক চাপ শুধু আমাদের আচরণ নয়, চিন্তাভাবনাকেও পরিবর্তন করতে পারে।

দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর On Liberty গ্রন্থে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতও ভুল হতে পারে। ভিন্নমতকে দমন করলে ব্যক্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সমাজও নতুন চিন্তা ও সত্য আবিষ্কারের সুযোগ হারায়।
ইতিহাসে দাসপ্রথার বিরোধিতা, নারীর ভোটাধিকার এবং নাগরিক অধিকারের সংগ্রাম দেখায়, একসময় যে ধারণাগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি হয়েছে। সুতরাং, কোনো মতামত জনপ্রিয় হলেই তা সত্য হয়ে যায় না।
আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে অনেক কিছু করি অথবা চেপে যাই, কারণ আমাদের মধ্যে সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন কাজ করে। কিন্তু সামাজিক জীব হওয়ার অর্থ নিজের চিন্তার স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া নয়।
সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরোধিতা করাই স্বাধীনতা নয়, আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে একমত হওয়াও পরাধীনতা নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো নিজের বিবেক, যুক্তি ও উপলব্ধির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারা। অন্যরা কী ভাবছে তা জানা সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, কিন্তু অন্যরা কী ভাবছে, তার বাইরে গিয়েও যুক্তি দিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারা বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা।
লেখক : আল মামুন রিটন, সম্পাদক বিজ্ঞান তথ্য অনলাইন ম্যাগাজিন