ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

ম্যানুয়াল নয়্যার: জার্মান দেয়াল, বায়ার্নের প্রাণ

মাহমুদুল হাসান বাপ্পী
প্রকাশিত: ১৬:২৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
ম্যানুয়াল নয়্যার: জার্মান দেয়াল, বায়ার্নের প্রাণ
ম্যানুয়াল নয়্যার

ম্যানুয়াল নয়্যারের বাম পায়ে আটকে গেল বলটা, সঙ্গে হয়তো নেইমার জুনিয়রের স্বপ্নও। তিনি তখনো ঘোরে ঢুকে যাননি, তৃপ্তির ঢেকুর তুলেননি নয়্যারও। নেইমার ফের বল পেয়ে ক্রস করতে চেয়েছিলেন ডি মারিয়ার উদ্দেশে, বলটা পৌঁছাতে পারলে জালের ঠিকানাটা খুঁজে পাওয়া সহজ হয়ে যেত তার। নয়্যার তা হতে দেবেন কেন? কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার আটকে দিলেন নেইমারের প্রচেষ্টা। 

এর মাধ্যমে যেন ৩৪ বছর বয়সী নয়্যার আরেকবার দাবি জানিয়ে গেলেন, এখনো সবচেয়ে ভালোভাবে গোলপোস্ট সামলান তিনি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখ অধিনায়ক ম্যানুয়েল নয়্যারের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর আবারো কথা উঠেছে, তিনিই এখনকার সেরা গোলকিপার কিনা। অবশ্য নেইমার-এমবাপ্পেদের স্বপ্নের সমাধি দেয়ার পর সে দাবি অনেকে করতেই পারেন।

জার্মানির হয়ে জিতেছেন বিশ্বকাপ। মাত্র তৃতীয় গোলরক্ষক অধিনায়ক হিসেবে তিনি রোববার উঁচিয়ে ধরলেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। এসবে অবশ্য নয়্যারের কৃতিত্ব প্রকাশ পায় না খুব একটা। কিন্তু অফসাইডে গিয়েও এমবাপ্পে যখন নয়্যারকে পরাস্ত করতে পারেন না, বুক চিতিয়ে সামনে এসে শটটা তিনি ঠেকিয়ে দেন, তখন তার কৃতিত্ব স্বীকার করতে বাধ্য যে কেউ।

Advertisement

নয়্যারকে একা পেয়েও ব্যর্থ এমবাপ্পেনয়্যার এই প্রজন্মের সেরা গোলরক্ষক হোন বা না হোন, তিনি যে একটা নব যুগের সূচনা করে দিয়ে গেছেন এটা নির্দ্বিধায় বলাই যায়। নতুন এই ধারার কেতাবি নাম 'সোয়াইপার কিপার'। এ ধরণের গোলরক্ষকরা কেবল বল ডিস্ট্রিবিউট কিংবা লং পাস দিয়েই ক্ষান্ত হন না, বল না থাকা অবস্থাতেও এগিয়ে আসেন পঞ্চম ডিফেন্ডার হিসেবে। 

পাড়ার ফুটবলে সাধারণত এমন একজনকে গোলকিপারের দায়িত্ব দেয়া হয় যে একটু অলস প্রকৃতির, মাঠে নড়াচড়া কম করে। কেবল পাড়ার ক্ষেত্রেই না, আন্তর্জাতিক ফুটবলেও এমন রীতিটা ছিল প্রায় কাছাকাছি। গ্লাভস হাতে গোল ঠেকানোই ছিল গোলকিপারদের কাজ। 

অবশ্য এখানে ব্যতিক্রমও ছিল। কলম্বিয়ান গোলকিপার রেনে হিগুইতা প্রায়ই বল পায়ে মাঝ মাঠে চলে আসতেন। এর খেসারত দিতে গিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পরেছিল তার দল। এছাড়া গোলকিপার হলেও রোজারিও চেনি, জোসে লুইস চিলাভার্টরা ছিলেন ফ্রি কিক বা পেনাল্টি থেকে গোল করতে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু ওপেন প্লে-তে তাদের ভূমিকা ছিল শুধুমাত্র একটা ৫০-৫০ লং বল বা ভলি, আর কিছু নয়।

নয়্যার মানেই এক ভরসার নামএই ধারা থেকে সবসময় ব্যতিক্রম থাকতে চেয়েছে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। কোচ ও খেলোয়াড় দুই ভূমিকাতেই কাতালান কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফের একটি উক্তি দেখলেই বুঝা যাবে ব্যাপারটা, 'আমার দলে গোলকিপার হলো প্রথম অ্যাটাকার, আর ফরোয়ার্ড হলো প্রথম ডিফেন্ডার।' মূলত এই কারণেই নানা সমালোচনার পরও অনেকদিন বার্সার গোলপোস্ট সামলেছেন ভিক্টর ভালদেস।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে পেপ গার্দিওয়ালার অধীনে গোলকিপিংকে অন্য ধাপে নিয়ে গেছেন ম্যানুয়েল নয়্যার। পেপ বায়ার্ন মিউনিখের কোচ থাকাকালীন গোলকিপার ও ডিফেন্ডারদের মাঝে প্রায়ই দুরত্ব থাকতো ৩০-৪০ মিটার। সে দুরত্ব কমাতেই নয়্যারের ওপরে উঠা শুরু, যেখান থেকে জন্ম 'সোয়াইপ কিপার' টার্মের। 

যেসব গোলকিপার বর্তমানে ওয়ান টু ওয়ান সিচুয়েশনে এগিয়ে আসেন, অ্যাটাক বিল্ড আপে সহযোগিতা ও অ্যাটাকারকে ট্যাকল করেন তাদেরই বলা হয় 'সোয়াইপ কিপার'। নতুন ধারার এই গোলকিপিংয়ের প্রথম উদাহরণ নয়্যারই। 

সোয়াইপ কিপারের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে বুদ্ধিমত্তা। যখন ডিফেন্স পেরিয়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় চলে আসবেন তখন এগিয়ে যাবেন কি না, অ্যাটাকার কত গতিতে আসবেন ও কীভাবে গতি কমিয়ে ট্যাকেল করবেন এসব সিদ্ধান্ত নিতে খুবই অল্প সময় পান গোলকিপাররা। এর মধ্যেই তাকে দিতে হয় বিচক্ষণতার পরিচয়, যেটা নয়্যার খুব ভালো পারেন।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা হাতে নয়্যারএসব কারণে টেকনিক্যালি সেরা না হলেও অনেকে এখনকার নয়্যারকে সেরা গোলকিপার মনে করেন। তার পথ ধরেই পরবর্তীতে স্বদেশি মার্ক আন্দ্রে টের স্টেগানসহ আরো বেশ কয়েকজন 'প্রো এক্টিভ' গোল কিপারের তকমা পেয়েছেন। তবে নয়্যার গোলকিপিং বাদে অন্য কাজে তাদের চেয়েও এগিয়ে।

ম্যানুয়েল নয়্যারকে মনে রাখার অসংখ্য কারণ আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন, পৌঁছে গিয়েছিলেন ব্যালন ডি-অর জয়ের খুব কাছে। মাত্র তৃতীয় গোলরক্ষক অধিনায়ক হিসেবে এবার এই জার্মান জিতলেন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, বায়ার্নের হয়ে জিতেছেন ট্রেবলও। 

নয়্যারকে মনে থাকবে নেইমারদের দুঃস্বপ্ন হওয়ার জন্য, ২০১৪ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রতিরোধের দেয়াল হওয়ায়। তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন জার্মানদের দেয়াল আর বায়ার্নের প্রাণ হওয়ার কারণে। তাকে মনে থাকবে 'সোয়াইপ কিপিং'য়ের জন্য, বক্সের বাইরে এসে ট্যাকেলের জন্য। নয়্যারকে মনে থাকবে প্রজন্মের সেরা হিসেবে, তিনি থাকবেন সর্বকালের সেরা গোল রক্ষকের ছোট তালিকাতেও।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!