নারীর রূপ, প্রেম ও জীবনযাপনের অনন্য বন্দনা
নারীর চুল খুলে দিলেই রাজা-বাদশার ঘুম ভাঙে, হৃদয় দুলে ওঠে এমনই মায়াময় রূপ নিয়ে একসময় উত্তরবঙ্গের উঠোনে উঠোনে বাজত মেয়েলি গীত।
“যখনই ব্যাপারির বেটি খুলিয়া দেয় চুল,
তখনই মাস্টোরের ব্যাটা ছাড়িলো জাতকূল।
মাইয়া দুলালী, রাজা পাগল করলু তুই,
মাইয়া দুলালী, বাদশা পাগল করলু তুই।
একে তো ব্যাপারির বেটি দেখিতে সুন্দর,
তার উপর ব্যাপারির বেটির মান্জা পাতল।
মাইয়া দুলালী, রাজা পাগল করলু তুই,
মাইয়া দুলালী, বাদশা পাগল করলু তুই।”
মাটির মানুষ, মাটির ভাষা, মাটির সুর আর তারই মাঝে নারীর রূপ, প্রেম ও জীবনযাপনের অনন্য বন্দনা।
সময়-কাল বদলেছে। বদলেছে জীবনযাপন, উৎসবের ধরন, বিয়ের আয়োজন। সেই বদলের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের মাটির গন্ধ, মাঠের সুর, লোকজ সংস্কৃতির কত অমূল্য অধ্যায়। ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি, জারি-সারি, মুর্শিদী-কবিগান, ভাট কবিতা, বৈষ্ণব পদাবলীর পাশেই যে আসর ছিল নারীর নিজস্ব, তার নাম মেয়েলি গীত বিশেষত উত্তরবঙ্গের বিয়ের ঘরকে ঘিরে এ ছিল এক প্রাণের উৎসব।
এক সময় বিয়ে মানেই ছিল না পৃথক কোনো হেনা সেরিমনি বা মেহেদি নাইট। বিয়ে ছিল গোটা পাড়া-প্রতিবেশী-আত্মীয়তার এক সম্মিলিত মহোৎসব নিমন্ত্রণের অপেক্ষা নয়, আপনজনের মতো সবাই ছুটে আসতেন। কেউ কুটনা-বাটনায়, কেউ রান্নাঘরে, কেউ কনের সাজসজ্জায় আর সন্ধ্যা নামলেই জমে উঠত মেয়েলি গীতের আসর।
কখনো কনে বিদায়ের আবেগ, কখনো শ্বশুরবাড়ির রসকথা, কখনো প্রেম, কখনো জীবনের সুখ-দুঃখের গাথা সুরের ভেলায় ভেসে যেত সব। সেই বউ-সাজও ছিল এক আশ্চর্য সরলতা।
আলতায় রাঙা পা, নূপুরের মর্মর ধ্বনি, লাল শাড়ি, সিঁদুর, ফুল আর তার ওপরে আন্তরিকতার এক অপূর্ব আলপনা। চাকচিক্য নয়, সেখানে ছিল হৃদয়ের উষ্ণতা। আজকের প্রজন্মের চোখে হয়তো সাদামাটা, কিন্তু সেই সাদামাটার ভেতরেই ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের নিবিড় বাঁধন একটি বিয়ে ছিল শুধু একটি পরিবারের অনুষ্ঠান নয়, গোটা পাড়ার উৎসব।
সময়ের স্রোতে আজ সেই আসর প্রায় নীরব। হারিয়ে গেছে গান, হারিয়ে গেছে গায়িকা, হারিয়ে গেছে সেই উঠোনের উৎসব। বাকি আছে কেবল স্মৃতি, কোনো পুরোনো রেকর্ডিং, কিংবা লোকসংস্কৃতির আর্কাইভের ধুলো-মাখা পাতা।