ঢাকা,  শনিবার   ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

মানুষের মস্তিষ্ক, গঠন ও কার্যপ্রণালি

রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১২:২২, ৭ নভেম্বর ২০২৬
মানুষের মস্তিষ্ক, গঠন ও কার্যপ্রণালি
মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের কাজ সমন্বয় করে, ইন্দ্রিয়ের তথ্য বুঝতে সাহায্য করে, স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং চিন্তা ও অনুভূতির ভিত্তি গড়ে তোলে

মানবজীবনের ভেতরের জগৎ: দ্বিতীয় অধ্যায়

আপনি যখন এই লেখাটি পড়ছেন, তখন আপনার চোখের সামনে থাকা অক্ষরগুলো শুধু দেখা হচ্ছে না। চোখ থেকে স্নায়ুর মাধ্যমে সংকেত যাচ্ছে মস্তিষ্কে। মস্তিষ্ক সেই সংকেতের অর্থ বুঝতে সাহায্য করছে, শব্দগুলোকে পরিচিত ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছে, আর আগের জানা তথ্যের সঙ্গে নতুন কথার সম্পর্ক তৈরি করছে।

এই কাজগুলো এত দ্রুত ঘটে যে আমরা সচরাচর খেয়ালই করি না। অথচ এর পেছনে কাজ করছে শরীরের অন্যতম জটিল অঙ্গ, মস্তিষ্ক।

প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, মানুষ শুধু শরীর নয়; তার চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি ও চেতনার সঙ্গেও মস্তিষ্কের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এবার একটু কাছ থেকে দেখা যাক, মস্তিষ্কের গঠন কেমন, এর বিভিন্ন অংশ কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে তারা একসঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় ভূমিকা রাখে।

মস্তিষ্ক একা কাজ করে না

মস্তিষ্ক, মেরুরজ্জু এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকা স্নায়ু নিয়ে গঠিত স্নায়ুতন্ত্র। মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। শরীরের বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত স্নায়ুগুলোকে বলা হয় প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শরীরের তথ্য মস্তিষ্কে পৌঁছায়, আবার মস্তিষ্ক থেকেও শরীরের বিভিন্ন অংশে নির্দেশ যায়।

ধরা যাক, আপনি গরম চায়ের কাপ ধরেছেন। ত্বকের সংবেদনগ্রাহী অংশ তাপের তথ্য স্নায়ুর মাধ্যমে মেরুরজ্জু ও মস্তিষ্কে পাঠায়। গরম কিছু স্পর্শ করলে হাত সরিয়ে নেওয়ার দ্রুত প্রতিক্রিয়া মেরুরজ্জুর মাধ্যমে শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে মস্তিষ্ক সেই তাপের অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ, মস্তিষ্ক শুধু নির্দেশ দেয় না; শরীরের কাছ থেকেও ক্রমাগত তথ্য গ্রহণ করে। এই আদান-প্রদান ছাড়া স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা, অনুভব করা কিংবা শরীরের অভ্যন্তরীণ কাজগুলো সমন্বয় করা সম্ভব হতো না।

মানুষের মস্তিষ্ক সৃষ্টির সবচেয়ে রহস্যময় বিষয়বস্তু। কারণ যতো দিন যাচ্ছে  ততোই মস্তিষ্ক সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার হচ্ছে যার ...

মস্তিষ্কের প্রধান অংশ

মস্তিষ্কের গঠন বোঝার সুবিধার জন্য একে কয়েকটি বড় অংশে ভাগ করে দেখা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, এই ভাগগুলো শেখার সুবিধার জন্য। বাস্তবে মস্তিষ্কের অংশগুলো আলাদা আলাদা দ্বীপের মতো কাজ করে না; তারা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করে।

বৃহৎ মস্তিষ্ক বা সেরিব্রাম: মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ। এর বাইরের স্তরকে বলা হয় সেরিব্রাল কর্টেক্স। চিন্তা, ভাষা, স্মৃতি, সংবেদন বুঝতে পারা, পরিকল্পনা ও স্বেচ্ছায় নড়াচড়ার মতো বহু কাজে এর ভূমিকা রয়েছে।

সেরিব্রামের দুটি অর্ধগোলার্ধ আছে, বাম ও ডান। এদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য স্নায়ুতন্তুর একটি বড় সেতু রয়েছে। অনেক কাজেই দুই অর্ধগোলার্ধ একসঙ্গে অংশ নেয়। তাই “বাম মস্তিষ্ক শুধু যুক্তির জন্য, আর ডান মস্তিষ্ক শুধু সৃজনশীলতার জন্য” এ ধরনের সরল বিভাজন সঠিক নয়।

লঘুমস্তিষ্ক বা সেরিবেলাম: মস্তিষ্কের পেছনের দিকে অবস্থিত এই অংশ শরীরের ভারসাম্য, ভঙ্গি এবং নড়াচড়ার সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আপনি যখন হাঁটেন, সিঁড়ি ভাঙেন, বল ছোড়েন কিংবা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখেন, তখন সেরিবেলামসহ মস্তিষ্কের একাধিক অংশ কাজ করে।

ব্রেনস্টেম বা মস্তিষ্ককাণ্ড: এটি মস্তিষ্কের নিচের অংশ এবং মেরুরজ্জুর সঙ্গে সংযুক্ত। শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদ্‌স্পন্দন, রক্তচাপ, গিলতে পারা এবং ঘুম-জাগরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা রয়েছে। এসব কাজের অনেকগুলোই আমাদের সচেতন নির্দেশ ছাড়াই চলে।

মস্তিষ্কের ভেতরে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে। যেমন, হিপোক্যাম্পাস নতুন স্মৃতি গঠনে ভূমিকা রাখে; অ্যামিগডালা আবেগ-সম্পর্কিত তথ্য প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়; হাইপোথ্যালামাস শরীরের তাপমাত্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও হরমোনের সঙ্গে যুক্ত নানা কাজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কোনো একটি অংশের কাজ বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মস্তিষ্কের সামগ্রিক কার্যক্রম বুঝতে হলে অংশগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগও বুঝতে হবে।

শিক্ষক বাতায়ন

মস্তিষ্কের ভেতরে বার্তা আদান-প্রদান

মস্তিষ্কের প্রধান কার্যকরী কোষগুলোর একটি হলো স্নায়ুকোষ, বা নিউরন। নিউরনের কোষদেহ, শাখার মতো ডেনড্রাইট এবং দীর্ঘ অ্যাক্সন থাকে। ডেনড্রাইট সাধারণত অন্য কোষ থেকে সংকেত গ্রহণ করে, আর অ্যাক্সন সংকেতকে কোষের অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।

একটি নিউরন থেকে আরেকটি নিউরনে বার্তা পৌঁছানোর সময় বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে। নিউরনের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো বৈদ্যুতিক সংকেত রাসায়নিক বার্তাবাহক, অর্থাৎ নিউরোট্রান্সমিটার, নিঃসরণে সাহায্য করে। এগুলো পরের কোষের ওপর প্রভাব ফেলে। নিউরনগুলোর সংযোগস্থলকে বলা হয় সিন্যাপ্স।

এই যোগাযোগের ধরন একরকম নয়। কোনো সংকেত পরের কোষকে সক্রিয় করতে পারে, আবার কোনো সংকেত তার কার্যক্রম কমিয়ে দিতে পারে। নিউরনগুলোর মধ্যে অসংখ্য সংযোগের মাধ্যমে তৈরি হয় জটিল নেটওয়ার্ক। আমাদের অনুভব, শেখা, স্মৃতি, চিন্তা ও আচরণের পেছনে এই নেটওয়ার্কগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম রয়েছে।

মস্তিষ্কে শুধু নিউরনই নেই। গ্লিয়া নামের অন্য ধরনের কোষও আছে। তারা নিউরনকে সহায়তা করে, সুরক্ষা দেয়, স্নায়ুতন্তুর চারপাশে আবরণ তৈরি করে এবং মস্তিষ্কের পরিবেশ ঠিক রাখতে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের কার্যক্রম বুঝতে হলে শুধু স্নায়ুকোষ নয়, তাদের সহায়তাকারী কোষগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হয়।

ডান-বাম মস্তিষ্কের' কাজ বলে কিছু নেই | কালবেলা

একটি কাজের পেছনে অনেক অংশ

আপনি যখন কোনো পরিচিত মানুষের মুখ দেখেন, তখন শুধু চোখ দিয়ে দেখা সম্পন্ন হয় না। চোখ থেকে আসা সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায়; মস্তিষ্কের বিভিন্ন ব্যবস্থা মুখের আকৃতি, পরিচিত স্মৃতি, পরিস্থিতি ও আবেগের তথ্য মিলিয়ে মানুষটিকে চিনতে সাহায্য করে।

একইভাবে, কথা বলার সময় ভাষা, স্মৃতি, মনোযোগ, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং মুখ ও জিহ্বার পেশির সমন্বয় দরকার হয়। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও শুধু যুক্তি নয়; পূর্ব অভিজ্ঞতা, আবেগ, সম্ভাব্য ফলাফল এবং পরিস্থিতির তথ্য একসঙ্গে বিবেচনায় আসে।

তাই মস্তিষ্ককে এমন একটি যন্ত্র ভাবা ঠিক হবে না, যেখানে প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা একটি বোতাম আছে। বরং এটি একটি জটিল যোগাযোগব্যবস্থা, যেখানে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক প্রয়োজন অনুযায়ী একসঙ্গে সক্রিয় হয়।

মস্তিষ্ক কি বদলাতে পারে?

একসময় মনে করা হতো, বড় হওয়ার পর মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রম খুব বেশি বদলায় না। এখন আমরা জানি, অভিজ্ঞতা, শেখা ও অনুশীলনের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ ও কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই পরিবর্তনশীল ক্ষমতাকে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি।

নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, কোনো খেলায় দক্ষতা অর্জন কিংবা নতুন অভ্যাস গড়ে তোলার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন নেটওয়ার্কে পরিবর্তন হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি নতুন তথ্য শেখার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য নতুন নিউরন তৈরি হয়। শেখার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিউরনের সংযোগ ও কার্যক্রমের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।

এই ধারণাটি আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। কারণ শেখা ও মানসিক বিকাশ শুধু শৈশবের বিষয় নয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

মস্তিষ্কের সংকেতেই চলবে প্রযুক্তি, পক্ষাঘাতগ্রস্তদের নতুন আশার নাম  'সিঙ্ক্রন' | সারাক্ষণ

মস্তিষ্ককে বোঝা কেন জরুরি?

মস্তিষ্কের কাজ সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকলে আমরা নিজেদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে বুঝতে পারি। মনোযোগ কেন ভেঙে যায়, ঘুম কম হলে কেন চিন্তা ও স্মৃতিতে প্রভাব পড়ে, অনুশীলনে কীভাবে দক্ষতা বাড়ে কিংবা আবেগের সময় শরীরে কেন পরিবর্তন আসে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি আমাদের সাহায্য করে।

তবে মস্তিষ্কের প্রতিটি কাজের পূর্ণ ব্যাখ্যা বিজ্ঞান এখনো জানে না। গবেষণা এগোচ্ছে, নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, আর পুরোনো ধারণারও সংশোধন হচ্ছে। মস্তিষ্ক সম্পর্কে জানা মানে তাই শুধু কিছু অংশের নাম মুখস্থ করা নয়; বরং কীভাবে একটি জটিল জীবন্ত ব্যবস্থা কাজ করে, তা বোঝার চেষ্টা করা।

মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের কাজ সমন্বয় করে, ইন্দ্রিয়ের তথ্য বুঝতে সাহায্য করে, স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং চিন্তা ও অনুভূতির ভিত্তি গড়ে তোলে। কিন্তু মস্তিষ্কের গঠন জানলেই মানুষের ভেতরের জগতের সব রহস্য মিটে যায় না। কারণ এই জটিল ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই আমরা অনুভব করি, মনে রাখি, কল্পনা করি এবং নিজেদের সম্পর্কে ভাবি।

পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা আরও গভীর একটি প্রশ্ন নিয়ে এগোব: মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও “মন” বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? চেতনা ও আত্মসচেতনতার সঙ্গে মনের সম্পর্ক কোথায়?

** পরবর্তী অধ্যায়: মন, চেতনা ও আত্মসচেতনতা।

লেখক : রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!