ঢাকা,  বুধবার   ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]
মানুষের নিঃশ্বাসে

বায়ুমণ্ডলে মিশে ২০৫ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড !

মানুষের নিঃশ্বাসে বছরে প্রায় ২০৫ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশে!
মুস্তাকিম গিয়াস
প্রকাশিত: ১৩:৪৮, ৪ নভেম্বর ২০২৬
বায়ুমণ্ডলে মিশে ২০৫ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড !
কার্বনের পরিমাণ বড় হলেই তার জলবায়ুগত প্রভাব সমান বড় হবে, এমন নয়; কার্বন কোথা থেকে এসেছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলে ফিরছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ

আমরা যখনই নিঃশ্বাস ছাড়ি, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করি। ব্যক্তিগতভাবে এই পরিমাণ খুব সামান্য মনে হলেও, পৃথিবীর সব মানুষের নিঃশ্বাস একসঙ্গে হিসেব করলে তা বছরে প্রায় ২০৫ কোটি মেট্রিক টনে দাঁড়ায়! সম্প্রতি এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মানুষের এই নিঃশ্বাস ও বিপাকক্রিয়া নিয়ে এমনই হিসেব তুলে ধরেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৫ সালে মানুষের শরীর থেকে বিপাকক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন কার্বন-ডাই-অক্সাইড-এর পরিমাণ ছিল বছরে প্রায় ১১৮ কোটি মেট্রিক টন। ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০৫ কোটি মেট্রিক টনে, অর্থাৎ মাত্র ৩০ বছরে এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭৪ শতাংশ।

নিঃশ্বাসের কার্বনের উৎস কী?
এই বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডের মূল উৎস হলো মানুষের শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া (metabolism)। আমরা যে খাবার খাই, শরীর তা থেকে শক্তি সংগ্রহ করে আমাদের হাঁটাচলা, চিন্তাভাবনা, শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্রম সচল রাখে।

এই শক্তি উৎপাদনের সময় কোষে খাদ্যজাত অণু ভেঙে অক্সিজেনের সহায়তায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও পানি উৎপন্ন হয়। এরপর রক্তে মিশে ফুসফুসের মাধ্যমে তা শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। এটি জীবনেরই একটি স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী অংশ।

জীবাশ্ম জ্বালানি বনাম প্রাকৃতিক কার্বন চক্র
নিঃশ্বাসের এই কার্বন-ডাই-অক্সাইড আর কয়লা, তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে এক করে দেখা যাবে না। কারণ, দুটি ক্ষেত্রে একই গ্যাস উৎপন্ন হলেও তাদের উৎস ভিন্ন:

প্রাকৃতিক কার্বন চক্র: উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে খাদ্য তৈরি করে। মানুষ সেই উদ্ভিদজাত বা প্রাণিজ খাবার খাওয়ার পর বিপাকক্রিয়ায় সেই কার্বনের কিছু অংশ আবার কার্বন-ডাই-অক্সাইড হিসেবে বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে দেয়। এটি পৃথিবীর দ্রুত কার্বন চক্রেরই একটি অংশ।

জীবাশ্ম জ্বালানি: অন্যদিকে, কয়লা, তেল ও গ্যাসের কার্বন ভূগর্ভে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সঞ্চিত ছিল। এসব জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে সেই দীর্ঘদিনের জমানো কার্বন নতুন করে বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায়। তাই মানুষের নিঃশ্বাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে জীবাশ্ম কার্বনের মতো ক্ষতিকর হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

গবেষকেরা কীভাবে এই হিসেব করলেন?
সারা পৃথিবীর মানুষের নিঃশ্বাস সরাসরি সংগ্রহ করে এই পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তাই গবেষকেরা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) একটি ডেটাবেজ ব্যবহার করেছেন, যেখানে ৬,৭৫৬ জন মানুষের (শৈশব থেকে ১০১ বছর বয়সী) দৈনন্দিন শক্তি ব্যয়ের পরিমাপ সংরক্ষিত ছিল।

এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তারা বয়স, লিঙ্গ ও শরীরের ওজনের সঙ্গে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদনের গাণিতিক মডেল তৈরি করেন। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা ও দৈহিক ওজনের উপাত্তের সঙ্গে এই মডেল মিলিয়ে ১৯৮৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মানুষের বিপাকক্রিয়ায় উৎপন্ন কার্বন-ডাই-অক্সাইড-এর বৈশ্বিক পরিমাণ অনুমান করা হয়।

হিসেব বলছে, এই বৃদ্ধির ৬০ শতাংশেরও বেশি এসেছে বিশ্ব জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে। অর্থাৎ, মানুষ আগের তুলনায় ব্যক্তিগতভাবে অনেক বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি করছে তা নয়, বরং পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়ায় সম্মিলিত উৎপাদন বেড়েছে।

গবেষণার মূল বার্তা
এই গবেষণার উদ্দেশ্য মানুষকে বা তাদের নিঃশ্বাসকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে দায়ী করা নয়। বরং পৃথিবীর কার্বন কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কতটা কার্বন চলাচল করছে, তার আরও নির্ভুল হিসেব তৈরি করা।

বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর কার্বন প্রবাহ বিশ্লেষণ এবং বৈশ্বিক কার্বন চক্রের মডেল উন্নত করতে এই হিসাব অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

মনে রাখতে হবে, গবেষণাটি ২০১৫ সাল পর্যন্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মডেলভিত্তিক অনুমান। এর মূল শিক্ষা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন বুঝতে শুধু শিল্পকারখানা, যানবাহন কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে তাকালেই চলবে না; জীবজগতের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়াও বিপুল পরিমাণ কার্বনের চলাচলের অংশ। 

তবে কার্বনের পরিমাণ বড় হলেই তার জলবায়ুগত প্রভাব সমান বড় হবে, এমন নয়; কার্বন কোথা থেকে এসেছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলে ফিরছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : মুস্তাকিম গিয়াস, গবেষক 
Journal Reference: Javier T Gonzalez et al.
Accounting for global carbon dioxide production from human metabolism between 1985 and 2015: a modelling study.
The Lancet Planetary Health (2026). 
DOI: 10.1016/j.lanplh.2026.10154

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!