চাই গাছ, পাখি ও মানুষের শহর
কথায় আছে- গাছ সব মানুষকে ছায়া দেয়, এমনকি কাঠুরেকেও। গাছের শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাস পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রেখেছে। নির্বিঘ্নে সেই জীবন সহায়ক গাছ কেটে পৃথিবীকে মরুময় করে তুলছি আমরাই।
দুঃখজনক হলেও সত্যি- আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনেও বৃক্ষ উৎপাটনের মহোৎসব চলে। খুব বলতে ইচ্ছা করে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যদি দলের সদস্য-কর্মীদের প্রতিবছর ৩টি করে গাছ লাগাতে বাধ্য করত তাহলে ভেবে দেখুন ৩০ বছরের একজন কর্মীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অন্ততপক্ষে ৯০টি গাছ লাগানো সম্ভব হতো। এভাবে লাখো লাখো কর্মী গাছ লাগালে সবুজে ভরে উঠত বাংলাদেশ।
গাছ মানে শুধু কাঠ নয় অন্য প্রাণীর জীবন
“আমি শুধু গাছটা বিক্রি করেছিলাম... আমি জানতাম না এত প্রাণ মরবে…”
ঝালকাঠির পূর্ব গুয়াটন গ্রামে একটা তালগাছ ছিল, যেটার প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি শাখায় নির্মাণ হয়েছিল শত শত বাবুই পাখির ঘর।
সেই ঘরে ছিল ডিম, ছিল ছানা, ছিল তাদের ছোট্ট সুখের জীবন।
সেই গাছটা—
মোবারক আলী ফকির নামের এক ব্যক্তি বিক্রি করে দেন।
মিজানুর রহমান ও ফারুক হোসেন নামের দুইজন শ্রমিক সেই গাছটা কেটে ফেলেন।
তারা জানতো না,
গাছ কাটার শব্দ মানেই— শত শত ছানার শেষ চিৎকার,
ডিমের ভাঙা খোলস আর মৃত মা পাখির উড়ালহীন কান্না।
কেউ বললো,
“একটা গাছ কেটেছে, এতো কিছু কেন বলছো?”
তাদের বলি— এই একটা গাছেই ছিল ১৫০+ বাবুই বাসা।
একেকটা বাসা মানে একেকটা ঘর।
যেখানে ছোট্ট মা পাখিটা প্রতিদিন তার ছানাগুলোকে ঠোঁটে করে খাবার এনে খাওয়াতো।
এখন সেই বাসা গুঁড়িয়ে পড়ে আছে মাটিতে।
ছানাগুলোর নিথর দেহ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
আর পাখিরা শুধু চক্কর দিয়ে যাচ্ছে…
শুধু খুঁজছে তার হারিয়ে যাওয়া ঘরটাকে।
আর আশেপাশে কিছু মানুষ দেখছিলো। কেউ দাঁড়িয়ে হেসে হেসে বলছিলো, “এইগুলা আবার পাখির ঘর?”
আমরা কি এতটাই অনুভূতিহীন হয়ে গেছি?
একটা গাছ মানেই শুধু কাঠ না। সেটা অনেকের জন্য জীবন।
প্রকৃতির আশ্রয়। জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ ঘর।
গাছ কাটা নিষিদ্ধ করা হোক
গাছ কাটা রোধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লড়াই চলছে সারা বিশ্বে। আমাদেরন দেশে ভ‚মি নিয়ে আন্দোলনের বহু সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকলেও গাছ বাঁচানো নিয়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলার মতো তেমন কোনো আন্দোলন এখনো দেখা যায়নি। নিজেরা বাঁচতে হলে, পরিবেশ বাঁচাতে হবে- আর পরিবেশ বাঁচাতে হলে সবার আগে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে।
গাছ কাটা নিষিদ্ধ করতে হবে। বৃক্ষ রক্ষার আন্দোলনে আরো সমস্বর দরকার, জোড়ালো আন্দোলন দরকার, পরিবেশবাদী সংগঠন, উদ্যোক্তা, পরিবেশ কর্মী, পরিবেশবিষয়ক লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, পরিবেশপ্রেমী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পেশাজীবীদের সমন্বয়ে বৃহৎ ফোরাম গঠন করা দরকার।
একইসঙ্গে দেশীয় এবং স্থান উপযোগী বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। গাছের পরিচর্যাও করতে হবে। সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। সিটি করপোরেশনকে পরিবেশ রক্ষায় আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। ‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান’; ‘একটি গাছ একটি প্রাণ’; ‘পরিবেশ সকলের, তাকে রক্ষা করার দায়িত্বও সকলের’
গাছ ও মানুষ একে অপরের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষের প্রাণ রক্ষায় গাছ বড় ভ‚মিকা পালন করে। মানব জীবনের জন্য গাছের নির্মল বাতাস খুব বেশি প্রয়োজন। সুতরাং কারণে-অকারণে, অজুহাতে গাছ কাটা যাবে না।
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন দেয় এই গাছ। শুধু তাই নয়, মানুষ প্রশ্বাসের সঙ্গে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে গাছ তা গ্রহণ করে। এক বছরে একটি গাছ প্রায় ১৩ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে। প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষায় গাছের কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ গাছবিহীন আমাদের প্রাণিজগতের কোনো অস্তিত্বই নেই।
বিষয়টি আমাদের খুব ভালো করে জানা থাকলেও প্রতিনিয়ত আমরা গাছ কেটে যাচ্ছি। জনসংখ্যার অধিক চাপে ফসলি জমি উজাড় করে তৈরি করা হচ্ছে ঘরবাড়ি। হরদম কাটা হচ্ছে গাছপালা। মানছে না কেউ নিয়ম-নীতি। তাই পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। উন্নয়নের নামে গাছ কাটা বিবেকহীন কাজ।

পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া যাবে না। অথচ আমরা সে কাজ করেই চলেছি। গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে তাপমাত্রায় ঢাকা আজ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। জলাশয় ভরাট ও গাছ কেটে পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। গাছ কাটার কারণে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে শহর। গাছ রোপণের সময় বাজেট, আবার কাটার জন্য বাজেটÑ এ ধরনের টালবাহানা করে জনগণের করের টাকার অপব্যবহার করা যাবে না।
বনের গাছপালা বায়ুন্ডলে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে গ্রিন হাউস গ্যাস গ্রহণ করে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যেভাবে মানুষ বন উজাড় ও গাছ নিধন করছে এতে বর্তমানে সময়ে আমরা দেখতে পারছি আমাদের মৌসুমি জলবায়ুতে একটা প্রভাব ফেলছে। আমাদের দেশের অনেক জেলায় অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছে। গ্রিন হাউস গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
পৃথিবীর বুকে এমন একটি দেশ আছে, যেখানে গাছ কাটাকে ‘মানুষ হত্যা’র সমান মনে করা হয়। গাছ কাটার জন্য জরিমানা, এমনকি গ্রাম ত্যাগ করার নির্দেশও দেয়া হয়ে থাকে। সোমালিয়ার কামকাম তেমনই একটি গ্রাম। গাছ কাটার অভিযোগে ওই গ্রামের বাসিন্দা ক্যান্টার নামে এক যুবককে জরিমানা করেছেন সেখানকার প্রবীণরা।
ক্যান্টার স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, আমি হতবাক হয়েছি! আমি ভেবেছিলাম আমাকে অন্য কারণে জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু তারা আমাকে স্থানীয় নিয়ম ব্যাখ্যা করেছেন। স্থানীয় প্রবীণরা তাকে ১ হাজার ৫০০ ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে বলেন এবং তাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশও দেন।
এ ব্যাপারে ওই গ্রামের নেতা এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আলী ফারাহ ইসমাইল বলেন, সোমালিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব (ঝড়, বন্যা) মোকাবিলা করছে। আমরা সবাই আমাদের জনগণ এবং পরিবেশ রক্ষায় সাহায্য করতে সম্মত হয়েছি। ঠিক এমন উদ্যোগ ছাড়া গাছ কাটা বন্ধ করা যাবেনা। সরকার সচেতন না হলে জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে।
মনে রাখা দরকার, একটি প্রাচীন গাছ কাটার বিনিময়ে একশটি গাছ লাগালেও ওই ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। কেননা, আজ যে গাছটি লাগানো হবে, মানুষকে ছায়া ও পর্যাপ্ত অক্সিজেন দেয়ার উপযোগী হতে তার অন্তত ২০ বছর সময় লাগবে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ২১২ হেক্টরের একটি আরবান পার্ক প্রতিদিন ৪৮ পাউন্ড ধুলোবালি, ৯ পাউন্ড নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ৬ পাউন্ড সালফার ডাই-অক্সাইড, ২১ পাউন্ড কার্বন মনো-অক্সাইড এবং ১০০ পাউন্ড কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণে সহায়তা করে। অথচ আমরা এসব তথ্যকে উপেক্ষা করে কত তুচ্ছ কারণেই না বৃক্ষকে হত্যা করি।
আর বৃক্ষ হত্যার বিরুদ্ধে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। গাছ কেটেই কেন স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে? বিশ্বের বহু দেশে এখন প্রাণীর অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে গাছ না কেটে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তাহলে আমরা কেন তা করছি না?

উন্নয়নের নামে যখন একটি বড় গাছ কেটে ফেলা হয়, সেই গাছের ওপর নির্ভরশীল পাখিরা কোথায় যাবে—সেই ভাবনাটি বিবেচনায় রাখা দরকার। মানুষ শুধু নিজের জন্য বাঁচে। নিজের স্বার্থে অবকাঠামো গড়ে তোলে।
অথচ পৃথিবীটা যে পশু-পাখি ও কীটপতঙ্গেরও; একটা চড়–ই পাখিও এই পৃথিবীর জন্য জরুরি এবং এখানে তাঁর বেঁচে থাকার যে অধিকার আছে, আত্মঘাতী উন্নয়ন সেই বোধটুকুও মানুষের মন থেকে মুছে দিয়েছে!
গাছ মানুষের পরম বন্ধু। গাছ ছায়া দেয়, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয়, হাইড্রোজেন গ্রহণ করে। ফল দেয়, ফুল দেয়। জ্বালানি ও আসবাবপত্রের জোগান আসে গাছ থেকে। জলবায়ুর তীক্ষèতাকে উপশম, মাটি সংরক্ষণ, বৃষ্টি-বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ঝড়-ঝঞ্ঝা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ, শীত-গ্রীষ্মকে অনুক‚ল রাখা এবং বাতাস ও পানির বেগকে আটকে দিয়ে ভূমিক্ষয় রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে গাছ।
কাজেই বৃক্ষরোপণকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জীবনধারণের জন্য বিশুদ্ধ অক্সিজেন বাতাসে ছেড়ে গাছ আমাদের বেঁচে থাকতে সহায়তা করে।
আমরা অনেকেই জানি না, একটি গাছ বছরজুড়ে ১০টি এয়ার কন্ডিশনারের সমপরিমাণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে। ৬০ পাউন্ডের বেশি ক্ষতিকারক গ্যাস বাতাস থেকে শুষে নেয়। ৭৫০ গ্যালন বৃষ্টির পানি শোষণ করে। এক হেক্টর এলাকার গাছ তিন টন বায়ু গ্রহণ করে। দুই টন বিশুদ্ধ অক্সিজেন প্রদান করে।
আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে জেলা বা উপজেলার নার্সারি কিংবা বৃক্ষমেলা থেকে চারা সংগ্রহ করে ভেষজ-ফলদ-ঔষধি গাছ লাগাতে হবে।
সরকারের উদ্যোগে গাছ লাগানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি অফিস, খাস জমি, রাস্তার দু’পাশ, নদীর দু’পার, রেল সড়কের দু’পাশ এবং উপক‚লীয় এলাকায় প্রচুর গাছ লাগানোর সুযোগ আছে। হাওরে পানিসহিষ্ণু হিজল ও করচ গাছ লাগিয়ে বাগ বা জঙ্গল তৈরি করা যেতে পারে।
রাজধানী ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশন, পৌর শহর, উপজেলা বা থানা পর্যায়ে শহরের ভেতরে রাস্তার মাঝখানে ডালপালা কম হয়, উঁচু ও দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগালে পাঁচ বছরে আমাদের শহরগুলোও সবুজ হয়ে উঠবে।

জার্মানিতে শতকরা ১২ ভাগ ছাদ সবুজ এবং টোকিও আইনে সব নতুন ছাদের অন্তত ২০ ভাগ সবুজ রাখার কথা বলা হয়েছে। টোকিও সরকারের গবেষণা ও বিশ্লেষণ তথ্যে উল্লেখ করা হয়, যদি তাদের অর্ধেক ছাদ সবুজ হয় তাহলে প্রতিদিন এয়ার কন্ডিশনে ব্যবহৃত জ্বালানি বাবদ এক মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে।
সিঙ্গাপুরে রুফটপ গার্ডেনিংবিষয়ক এক গবেষণা তথ্যে দেখা গেছে, পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে একটি বাগান বছরে জ্বালানি খরচের ০.৬ থেকে ১৪.৫ ভাগ সাশ্রয় হতে পারে। অনেক উন্নত দেশে ভবন গরম ও শীতলকরণে ৩০ ভাগ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয়ে থাকে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বিষিয়ে উঠছে ঢাকার পরিবেশ। এ কারণে শহরের তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা, বায়ুদূষণ, নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, বিষমুক্ত সবজি, ফল প্রাপ্তিতে ছাদে বাগান তৈরির জন্য উৎসাহব্যঞ্জক কার্যকরী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
আরেকটি খবর হলো- ছাদের সবুজ স্তর বিভিন্ন ট্রান্সমিটিং স্টেশন থেকে নিঃসরিত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রতিহত করে। এক্ষেত্রে চীনের উদ্যোগটি অনুসরণীয় হতে পারে।
গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য অনুধাবনের জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চংকিং শহর কর্তৃপক্ষ শহরের শিক্ষার্থীদের গ্রামে পাঠায়। গ্রামে অবস্থানের সময় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককেই ১০০টি করে চারা গাছ রোপণ করতে হয়। তাদের ধারণা- এসব শিক্ষার্থীর জীবনবোধ হবে মানবীয়, প্রজন্মগত ও ভৌগোলিক দূরত্ব কমানো সম্ভব হবে।

মানব জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত গাছ আমাদের পরম সহযোগী ও সঙ্গী। ইসলামের দৃষ্টিতে বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সব সময়ই বৃক্ষরোপণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও গাছের সঠিক পরিচর্যা করার উপদেশ দিতেন।
এক ভিক্ষুকের বৃক্ষরোপণের গল্প শুনুন- নওগাঁ জেলার ভিমপুর ইউনিয়নের শিকারপুর গ্রামের শতোর্ধ্ব বয়সি বৃদ্ধ গহের আলী। ফলদ বা দামি বনজ গাছের চারা কেনার সামর্থ্য না থাকায় চাল-ডালের সঙ্গে তালের আঁটি ভিক্ষের ঝুলিতে করে বয়ে এনে পুঁতে দেন সরকারি রাস্তার দু’পাশে। পরিচর্যা করেন।
এমনি করেই ১৮ হাজারেরও বেশি তালের গাছ লাগিয়ে বিরল বৃক্ষপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে প্রথমবারের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জাতীয় পরিবেশ পদক-২০০৯ গ্রহণ করেন গহের আলী। ২৭ ডিসেম্বর ২০১০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আরেক বৃক্ষপ্রেমিক চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় মনাকুশাই ইউনিয়নের তারারামপুর গ্রামের বাসিন্দা কার্তিক প্রামাণিক। বৃক্ষই তার ধ্যান-জ্ঞান, সাধ ও সাধনা। তার এই বৃক্ষপ্রেমের প্রতিফলন নিজ গ্রামে সবুজের সমারোহের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কার্তিক প্রামাণিকের বৃক্ষপ্রেমের এই গল্পের বয়সও প্রায় ৬০ বছর। জীবনের এ দীর্ঘ সময় তিনি নিভৃতে আপন সন্তানের মতো গাছ লাগিয়ে, পরিচর্যা করে বড় করে তুলেছেন। বৃক্ষপ্রেমে তারও মিলেছে স্বীকৃতি।
আরেক ফলদ বৃক্ষপ্রেমিকের নাম আবদুল আজিজ কোম্পানি। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শালিয়াবহ গ্রামে ১৯৮৩ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলা চাষের মাধ্যমে ফল চাষের যাত্রা শুরু করে নিজের ছয় একর জমিতে বিশাল ফলের বাগান করেছেন তিনি। আজিজ কোম্পানির বাগানে প্রায় পাঁচ হাজার রকমের ফলের ও ঔষধি গাছ রয়েছে।
টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেল বাড়িয়া ইউনিয়নের পশ্চিমা গ্রামের মফিজুর রহমান মফিজ কোটি টাকার মালিক। এবার শুনুন ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের বৃক্ষপ্রেমিক আলাউল হক অলির সবুজ ভুবনের গল্প।
এই বৃক্ষপ্রেমিকের নেশা-পেশায় জড়িয়ে আছে গাছ। অলি দেশ ও বিদেশ থেকে নানা প্রজাতির ফলদ, বনজ আর ঔষধি বৃক্ষ সংগ্রহ করে প্রায় ৬০ বিঘা জায়গাজুড়ে গড়ে তুলেছেন তার বৃক্ষ উদ্যান। গহের আলী, কার্তিক প্রামাণিক, আজিজ কোম্পানি, মফিজ আর অলির মতো আরও অনেক বৃক্ষপ্রেমিক আছেন যাদের একান্ত চেষ্টায় গড়ে ওঠা উদ্যান হতে পারে আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।
লেখক : পরিবেশবাদী লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক