ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]
মূল: ওলগা তোকারচুক

অনুবাদ গল্প | | মারেক মারেক (৪র্থ পর্ব)

অনুবাদ: ফজল হাসান
প্রকাশিত: ১৭:৪৪, ১২ আগস্ট ২০২২
অনুবাদ গল্প | | মারেক মারেক (৪র্থ পর্ব)
ছবিঃ অন্তর্জাল (প্রতীকী)

একবার সে নিজের জন্য সামান্য পরিমানে সুরা তৈরি করার চেষ্টা করেছিল । একসময় ভীষণ রেগে সে কালোজামের ঝোপঝাড় দুমড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল । বাগান ভর্তি ছিল কালোজাম গাছ । সে কম্পিত হাতে তৈরি করা সুরা ডোমিজনের৩ মধ্যে রেখেছিল । সে নগদ অর্থ খরচ করে চিনি কিনেছিল এবং তারপর চিলেকোঠার উষ্ণ পরিবেশে বিভিন্ন উপাদান সংমিশ্রণ করার ব্যবস্থা স্থাপন করেছিল । সে খুশি হয়েছিল ।

কেননা সে তার নিজের জন্য সুরা তৈরি করেছে । যখনই সে তৃষ্ণার্ত বোধ করতে শুরু করবে, তখন সে সেখানে যাবে এবং একটি নল ঢুকিয়ে ডেমিজোন থেকে সরাসরি পান করবে । সে হয়তো না জেনে সঠিকভাবে প্রস্তুত হবার আগেই সবটুকু সুরা সাবাড় করবে, এমনকি চাহিদার চেয়েও বেশি পরিমানে পান করবে । সে অনেক আগে থেকেই টেলিভিশন, রেডিও এবং টেপ রেকর্ডার বিক্রি করেছে । তবে যাহোক না কেন, সে কোনো কিছুই শুনতে পেত না—তার কানে সব সময় ডানা ঝাপটানোর শব্দ হত । সে আয়না লাগানো আলমারি, গালিচা, সাইকেল, স্যুট, রেফ্রিজারেটর, কাঁটার মুকুট পরা যিশু ও ভার্জিন মেরির ছবি, পানি রাখার পাত্র, হুইলব্যরো, শুকনো খড় কাঁটার যন্ত্র, রাবারের চাকার ঠেলাগাড়ি, থালা-বাসন, জিনিসপত্র রাখার পাত্র এবং খড়কুটা বিক্রি করে দিয়েছিল, এমনকি জৈব সার বিক্রি করার জন্য একজন ক্রেতাও খুঁজে পেয়েছিল । তারপর সে জার্মানদের পরিত্যক্ত বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য ঘুরে বেড়ায় এবং ঘাসের মধ্যে লুকানো কিছু পাথর আবিষ্কার করে । সে পাথরগুলো এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে এবং লোকটি সেগুলো জার্মানিতে নিয়ে যায় । সে আনন্দের সঙ্গে জীর্ণ বাড়িটি শয়তানের কাছে বিক্রি করে দিতে পারত, কিন্তু আসলে সে তা করতে পারত না । কেননা বাড়িটি তার বাবার মালিকানাধীন ছিল ।  

তার সেরা দিনগুলো ছিল যখন কোনো অলৌকিক কারণে যদি সে সকাল পর্যন্ত খানিকটা সুরা বাঁচিয়ে রাখতে পারত, তাহলে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই বিছানা থেকে না উঠে তা পান করত। বিষয়টি তাকে আনন্দময় করে তোলে । সে ঘুমানোর চেষ্টা করবে না এবং মনের সেই অবস্থাটি হারাবে না । একসময় সে ঝিমঝিম মাথা নিয়ে বিছানা থেকে উঠত এবং বাড়ির সম্মুখে একটি বেঞ্চে বসত । আগে বা পরে তার প্রতিবেশি নওয়া রুদার দিকে যাওয়ার পথে সবসময় সাইকেল নিয়ে আসত। ‘তুমি বোকা বুড়ো ভবঘুরে,’ মারেক মারেক অভিবাদনের ভঙ্গিতে কম্পিত হাত তুলে বলত । বিনিময়ে তার প্রতিবেশি তাকে দাঁতহীন মুখে হাসি উপহার দিত । মোজাগুলো পাওয়া গেছে । বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে ঘাসের ওপর ফেলে দিয়েছিল ।

Advertisement

নভেম্বরে তার প্রতিবেশি তাকে একটি কালো কুকুরছানা কিনে দিয়েছে । প্রতিবেশি বলেছে, ‘এই নিন, আপনার জন্য এনেছি । ঘোড়ার জন্য আপনার দুঃখ করার দরকার নেই, যদিও ঘোড়াটি সুন্দর ছিল । প্রথমে মারেক মারেক কুকুর ছানাটি ঘরের মধ্যে থাকার ব্যবস্থা করেছিল, কিন্তু মেঝেতে প্রস্রাব করে তাকে পাগল করে তোলে । তাই সে বাড়ির বাইরে একটি পুরনো বাথটব উল্টিয়ে দুটি পাথরের উপর স্থাপন করেছিল । সে মাটিতে একটি আংটা স্থাপন করে এবং তার সঙ্গে শেকল দিয়ে কুকুর ছানাটি বেঁধে রেখেছিল । এটি ছিল তার উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে তৈরি কুকুর রাখার অস্থায়ী ঘর । প্রথম দিকে কুকুর ছানাটি কান্নাকাটি এবং চিৎকার করতে থাকে, তবে একসময় সে অভ্যস্ত হয়ে যায় । যখনই মারেক মারেক কিছু খাবার নিয়ে কুকুর ছানাটির কাছে যায়, তখন সে তার লেজ নাড়ায় । মারেক মারেক তার আশেপাশে কুকুর ছানার উপস্থিতির জন্য আরও ভাল বোধ করে এবং তার অভ্যন্তরের পাখিটি কিছুটা শান্ত হয় । কিন্তু তারপর ডিসেম্বরে বরফ পড়ে এবং এক রাতে এত খারাপ তুষারপাত হয়েছিল যে, ভীষণ ঠান্ডায় কুকুর ছানাটি মারা যায় । সে সকলবেলা বরফের মধ্যে চাপা পড়া অবস্থায় খুঁজে পায় । মৃত কুকুর ছানাটি ছেঁড়া ছালার পুঁটলির মতো দেখতে ছিল । সে মৃত দেহটি পা দিয়ে ধাক্কা দিয়েছিল । কুকুর ছানার মরদেহ পুরোপুরি শক্ত ছিল ।

মারেক মারেকের বোন তাকে বড়দিনের আগের রাতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, কিন্তু সে শুরুতেই বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে । কারণ তার বোন রাতের খাবারের সঙ্গে ভদকা পরিবেশন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল । ‘ভদকা ছাড়া কী ধরনের বড়দিন উদযাপন?’ মারেক মারেক তার ভগ্নিপতিকে বলেছিল । তারপর সে পুনরায় গায়ে কোট চাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায় । মধ্যরাতের অনুষ্ঠানে ভালো আসন পাওয়ার জন্য লোকজন ইতোমধ্যে রওনা হয়ে গেছে । সে গির্জার কাছে অপেক্ষা করছিল এবং অন্ধকারে পরিচিত মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল । সে তার প্রতিবেশির সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল, এমনকি সে জমাট বাঁধা বরফের রাস্তা পেরিয়ে গ্রামে যাওয়ার সময় হোঁচট খেয়েছিল । ‘কী শীত, তাই না?’ প্রতিবেশি প্রশস্ত হাসি মুখে মারেক মারেকের কাঁধে হালকা চাপড় দিয়ে বলেছিল । ‘দূর হও, বুড়ো হাঁদারাম,’ মারেক মারেক উত্তর দিয়েছিল । ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বেশ,’ প্রতিবেশি মাথা নেড়ে বলেছিল এবং বলেই সে গির্জার ভেতর প্রবেশ করে । লোকজন মারেক মারেকের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যায় এবং তারা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মাথা নোয়ায় । তারা প্রবেশ দ্বারের সম্মুখে তাদের জুতা থেকে বরফ সরিয়ে ভেতরে ঢোকে । মারেক মারেক সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে এবং ভাঙা ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পায় । অবশেষে ঘণ্টা বাজতে শুরু করে, উপস্থিত লোকজন নীরব হয়ে যায় এবং যাজকের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, যা মাইক্রোফোনের কারণে বিকৃত শোনা যায় । প্রবেশ পথে মারেক মারেক তার আঙুলকে হিমশীতল পবিত্র পানি স্পর্শ করার সুযোগ করে দেয়, কিন্তু সে নিজের সীমানা অতিক্রম করেনি । কিছুক্ষণ পরে পশমী ওভারকোটের গন্ধে, ঈশ্বরই ভালো জানে কিসের, সে অসুস্থ বোধ করে । তারপর তার মাথায় একটা ধারণা এসে উপস্থিত হয় । সে প্রবেশ দ্বার পেরিয়ে বাইরে চলে যায় । বরফ জোরে পড়ছিল, যেন বরফ সমস্ত পথ ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করছিল । মারেক মারেক দোকানের অভিমুখে হাঁটতে থাকে । পথে সে তার বোনের ছাউনি ঘরে থামে এবং একটা গাঁইতি তুলে নেয় । সে গাঁইতি দিয়ে দোকানের দরজা ভাঙে এবং ভদকার বোতল দিয়ে পকেট ভর্তি করে, এমনকি হাতের মুঠোয় কয়েক বোতল নেয় । তার মনে হলো সে যেন হাসছে । ‘তারা কখনও আমাকে ধরতে পারবে না,’ সে নিজেকে বলল এবং পানির ট্যাঙ্কে ভদকা ঢেলে সারা রাত কাটিয়ে দেয় । তারপর সে খালি বোতলগুলো কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয় ।

সেদিন ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ছুটির দিন । যখনই সে মনের ভেতর সামান্যতম স্থিরতা অনুভব করে, তখন সে ট্যাঙ্কের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে কল খুলে তার নিচে মুখ নিয়ে হা করে এবং স্বর্গ থেকে এসে ভদকা সরাসরি তার গলা দিয়ে নিচে নেমে যায় ।

প্রথম পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/326640

দ্বিতীয় পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/328156

তৃতীয় পর্ব: https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/329561

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!