ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]
মূলঃ আলবেয়ার কামু (উপন্যাসঃ দ্য প্লেগ)

দ্য প্লেগ (পর্ব ৪৩)  

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ২১:৪০, ২ অক্টোবর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৪৩)  
ছবিঃ অন্তর্জাল (দ্য প্লেগ মুভিতে ডাক্তার রিও এবং ত্যারু চরিত্র)

নভেম্বর যতই কাছে আসতে লাগল, সকালগুলো আরো ঠান্ডা হতে লাগল। অবিরাম বৃষ্টিতে রাস্তাগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আকাশে কোনো মেঘ থাকল না। সকালের মৃদু সূর্যালোক শহরকে ঠান্ডা ও চকচকে আলোতে ভরিয়ে দিলো। তবে রাত বাড়ার সাথে সাথে বাতাস ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠতে লাগল। এই রকম একরাতে ত্যারু ডাক্তার রিও’কে নিজের সম্পর্কে কিছু একটা বলার সিদ্ধান্ত নিলো।

একটা ক্লান্তিকর দিনের শেষে, রাত প্রায় দশটার দিকে ত্যারু ডাক্তারকে প্রস্তাব করল তার সাথে ডাক্তারের পুরোনো এজমা রোগীর সাথে দেখা করতে যাওয়ার জন্যে। পুরোনো শহরের বাসস্থানগুলোর ছাদের ওপরে হালকা আলো জমেছিল। রাস্তার ক্রসিং পার হবার সময়ে তাদের মুখের ওপরে মৃদু বাতাস বয়ে গেল। নির্জন রাস্তা হতে বাসস্থানে ঢুকতেই প্রথমেই লোকটির বাচালতা তাদের মধ্যে এক ধরণের বিরক্তির সৃষ্টি করল। সে লম্বা বক্তৃতা শুরু করল। বলতে লাগল যে, শহরের একই লোকেরা বারবার সুবিধা নিচ্ছে- এই অবস্থা অনির্দিষ্টকালের জন্যে চলতে পারে না, ইতিমধ্যেই অনেক লোকজনই এসব দেখে দেখে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে গেছে ইত্যাদি। এই বিষয়গুলোর ওপরেই  সে ব্যাখা-প্রতিব্যাখ্যা দিতে লাগল ডাক্তারের নিকটে।

এই সময়ে তারা ওপরের দিক থেকে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। ত্যারুকে ওপরের দিকে তাকাতে দেখে বৃদ্ধ লোকটির স্ত্রী জানালো যে, পাশের বাসার মেয়েরা সোপানের ওপরে হাঁটছে। সে আরো বলল যে, সেখান থেকে শহরের সুন্দর দৃশ্য দেখা যায় এবং যেহেতু এই এলাকার প্রত্যেকটা বাড়ির সোপান পাশের বাসার সোপানের সাথে সংযুক্ত, সেহেতু সে রাস্তা ব্যবহার না করে সোপান দিয়েই তার প্রতিবেশিদের বাসায় গমনাগমন করতে পারে।

Advertisement

“চলো না আমরাও ওপরে গিয়ে দেখে আসি?” বৃদ্ধ লোকটি প্রস্তাব করল। “তোমরা বুকভর্তি মুক্তবাতাস পাবে।”

সোপানের ওপরে তিনটি খালি চেয়ার ছাড়া তারা আর কাউকে দেখতে পেল না। একদিকে যতদূর দৃষ্টি যায়, এক সারি সোপান ছিল। শেষ সোপানটি অন্ধকার, উঁচুনিচু ভূমির সাথে মিশে গিয়েছিল। সেটিকে তারা শহরের সবচেয়ে কাছে পাহাড় বলে শনাক্ত করল। অন্যদিকে কয়েকটা রাস্তা ও অদৃশ্য পোতাশ্রয় পেরিয়ে তাদের দৃষ্টি দিগন্তের ওপরে স্থির হলো। সেখানে সাগর ও আকাশ মিলে আবছায়া ধূসর রঙ সৃষ্টি করেছিল। একখন্ড কালো জমির পেছনে তারা খাঁড়া পাহাড়গুলোকে দেখতে পেল, যেগুলোর উৎস সেখান থেকে দেখা যাচ্ছিল না। তবে সেগুলো পরস্পর থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নৌপথের প্রবেশমুখের বাতিঘরটি তখনো ব্যবহারের উপযুক্ত ছিল এবং  যে জাহাজগুলো ওরানের অব্যবহৃত বন্দরকে অতিক্রম করে উপকুল দিয়ে অন্য বন্দরগুলোতে যেত, সেগুলো এই বাতিঘরকে ব্যবহার করতে পারত। রাতের বাতাসে স্ফটিক-স্বচ্ছ আকাশে তারাগুলোকে মনে হচ্ছিল রূপার টুকরা।  সেগুলো ঘূর্ণায়মান হলুদ আলোতে একবার আলোকিত এবং একবার ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। মশলা ও ঊষ্ণ নূড়ির গন্ধ বাতাসে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছিল। সবকিছুই ছিল খুবই স্থির ও নিশ্চল।

“আনন্দময় জায়গা, “চেয়ারে বসতে বসতে রিও বলল। “তুমি ভাবতে পারো যে, প্লেগ এখন পর্যন্ত এই জায়গাটি খুঁজে পায়নি।”

ত্যারু সাগরের দিকে তাকিয়েছিল ডাক্তারকে পেছনে রেখে। 
“হ্যা,” মুহূর্তের নীরবতার পর সে উত্তর দিলো, “এখানে থাকা আসলেই ভালো।”

তারপর রিও’র পাশের চেয়ারে বসে সে তার চোখের ওপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। তিনবার আকাশে আলোর আভা ছড়িয়ে গিয়ে আবার নিভে গেল। নীচে রাস্তার পাশের রুমটি হতে বাসন-কোসনের শব্দ শোনা গেল। বাড়ির কোনো একটি দরজা শব্দ করে ধাক্কা দিলো কোথাও।

“রিও,” ত্যারু স্বাভাবিক স্বরে বলল,” তুমি কি বুঝতে পারো যে, তুমি কখনোই আমার সম্পর্কে কিছুই জানতে চাওনি, কেমন মানুষ আমি?” আমি কি তোমাকে বন্ধু হিসেবে মনে করতে পারি?” 

‘হ্যা, অবশ্যই আমরা বন্ধু; তবে এখন পর্যন্ত আমাদের সময় হয়নি সেটি দেখানোর।”

“ভালো। তোমার কথা আমাকে আস্থা দিলো। তাহলে আমরা কি এক ঘন্টার জন্যে আমাদের কাজ থেকে বিরতি নিতে পারি, বন্ধুত্বের জন্যে?”

রিও হাসি দিয়ে তার কথার উত্তর দিলো। 
“তাহলে চলো!” 

রাস্তার দিক হতে লম্বা ও অস্পষ্ট একটা হিসহিস শব্দ ভেসে এলো। ভেজা ফুটপাথের ওপরে কারের দ্রুতগতিতে চলে যাওয়ার শব্দ। সেটি থেমে যেতেই দূরে কোথাও অস্পষ্ট চিৎকারের শব্দ শোনা গেল। তারপর, তারার আকাশ থেকে ঘন পর্দা পড়ার মতো করে তাদের দুজনের ওপরে নির্জনতা নেমে এলো। ত্যারু তার জায়গা থেকে সরে গিয়ে  দেয়ালের ওপরে বসল। রিও’র মুখোমুখি, যে চেয়ারে সে হেলান দিয়ে ছিল। তাকে দেখতে মৃদুভাবে আলোকিত আকাশের পটভূমিতে একটি কালো ও মোটা অবয়ব বলে মনে হচ্ছিল। ত্যারুর অনেক কথা বলার ছিল রিও’কে।  নীচে যা বর্ণনা করা হয়েছে সেটিকে আমরা তার নিজের কথা হিসেবে মনে করতে পারি।
চলবে……

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!