ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]
মূল: Albert Camus

দ্য প্লেগ (পর্ব ৩৯)  

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১৭:০৯, ১ জুন ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৩৯)  
দ্য প্লেগ বই

ধর্মোপদেশের কয়েকদিন পর। ফাদার পেনেলাক্সকে নিজের বসবাসের রুম ছেড়ে দিতে বলা হলো। প্লেগ সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতির কারণে অনেক লোকজনকেই বাসস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছিল। ত্যারুর হোটেলটি কর্তৃপক্ষ দখল নেয়ার কারণে তাকেও সেখান থেকে চলে আসতে হয়েছে। এখন সে রিও’র সঙ্গে বাস করছে।

পেনেলাক্সকে চার্চ প্রদত্ত বাসস্থান ছেড়ে এক ধার্মিক মহিলার বাড়িতে অবস্থান নিতে হলো। এই মহিলা এখনো মহামারি দ্বারা আক্রান্ত হননি। বাসস্থান পরিবর্তনের সময়ে পেনেলাক্স আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেন। বিষয়টি মহিলা সহজভাবে নিলেন না। একদিন বিকেলে পেনেলাক্সের রুমে গিয়ে তিনি প্রবল আগ্রহ সহকারে সেইন্ট ওডিলিয়া’র বাণীর মাহাত্ম বর্ণনা করছিলেন।

ক্লান্তির কারণে ফাদার পেনেলাক্স একটু অধৈর্যভাব প্রদর্শন করলে মহিলা মনে মনে খুবই বিরক্ত হলেন। তার সম্পর্কে উত্তরোত্তর খারাপ ধারণা পোষণ করতে লাগলেন। এটা তার আচরণেও প্রকাশিত হতে লাগল। প্রতিদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে কর্কশ কণ্ঠে তিনি ফাদারকে ‘শুভ রাত্রি, ফাদার’ বলা শুরু করলেন। এরমধ্যে একদিন বিকেলে ফাদারের প্রবল জ্বর এলো। 

Advertisement

মহিলার বর্ণনা অনুসারে তিনি সকালে ঘুম থেকে জাগার ঘণ্টাখানেক পর ফাদারকে ঘুম থেকে উঠতে না দেখে বিচলিত হলেন। তারপর কোনোরূপ ইতস্তত না করে তার দরজায় করাঘাত করলেন। দেখতে পেলেন ফাদার  বিছানায় শুয়ে আছেন। সারারাত ঘুমাননি। তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং তার মুখ রক্তিম দেখাচ্ছে। তিনি ভদ্রভাবে ফাদারকে বললেন ডাক্তার ডাকবেন কিনা। কিন্তু ফাদার তার এই প্রস্তাবকে অভদ্রভাবে নাকচ করে দিলেন। সুতরাং তিনি ফাদারের রুম ছেড়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।

এর কিছুক্ষণ পর ফাদার নিজেই তাকে রিং করে নিজের পূর্ব আচরণের জন্যে মাফ চাইলেন এবং মহিলাকে তার রুমে আসতে অনুরোধ করলেন। তাকে এটাও জানালেন যে, তার শরীরে প্লেগের কোনো লক্ষণ নেই। মহিলা তাকে জানালেন, নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে ডাক্তার ডাকার বিষয়ে বলেননি। ফাদারের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে তিনি তা বলেছেন, যেহেতু তারা দুজনেই একই ছাদের নীচে বাস করছেন। এরপর পাদ্রী আর কোনো কথা না বলাতে মহিলা আবার ডাক্তার আনতে চাইলেন। কিন্তু ফাদার পেনেলাক্স তাকে বললেন, এই ধরনের কোনো ঝামেলার ভেতরে যাওয়ার দরকার নেই। বিষয়টি আরো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বৃদ্ধা অসংলগ্ন কিছু কথাবার্তা বললেন। তবে যে বিষয়টা তিনি সঠিকভাবে বলতে সক্ষম হলেন তা হল, ফাদার ডাক্তার ডাকতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন একারণে যে, সেটি তার নীতিবিরুদ্ধ ছিল।

পাদ্রী সম্পর্কে মহিলার ধারণা হল যে, জ্বর তাকে কাবু করতে পারেনি। সেকারণে তিনি তাকে এককাপ চা এনে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে তিনি প্রতি দুই ঘণ্টায় একবার করে দেখে যেতেন। পাদ্রী সম্পর্কে যে বিষয়টা তাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করল, তা হল তার অস্থিরতা, যা সারাদিন ধরে চলল।

তিনি একবার কম্বল গায়ে দিতেন, পরক্ষণেই তা ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। সারাক্ষণ নিজের কপালে হাত বুলাতে থাকতেন, যা ঘামের কারণে চকচক করত। একটু পর পর তিনি বিছানায় উঠে বসতেন; ঘন কফের থুথু ফেলে নিজের গলাকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করতেন। এই সময়গুলোতে মনে হতো তিনি তার ফুসফুস থেকে প্রায় কঠিন কিছু জিনিস বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছিল। এই প্রতিটা ব্যর্থ চেষ্টার পর তিনি ক্লান্ত হয়ে বালিশের ওপরে নুইয়ে পড়তেন। এরপর তিনি নিজেকে আবার কিছুটা ওপরে তুলতেন এবং আক্রমণাত্মক দৃষ্টি নিয়ে স্থিরভাবে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সম্ভবত সেটা জ্বর ছাড়া কিছুই ছিল না, যদিও এর লক্ষণগুলোর প্রকাশ খুবই অদ্ভুত ধরনের ছিল।

যাই হোক, সেদিন বিকেলের দিকে তিনি পাদ্রীর সঙ্গে আবার কথা বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তার মুখ থেকে কিছু অসংলগ্ন কথাবার্তা ছাড়া কিছুই বের করতে পারলেন না। তিনি নতুন করে ডাক্তার আনার প্রস্তাব দিলেন। তখন পেনেলাক্স বিছানায় উঠে বসলেন এবং কঠিন স্বরে ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করলেন। এই পরিস্থিতিতে মহিলা পরেরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয় বলে মনে করলেন। ভাবলেন যে, ফাদারের পরিস্থিতির কোনো  উন্নতি না হলে তিনি ইনফরমেশন ব্যুরো কর্তৃক রেডিওতে দিনে দশবার ঘোষিত টেলিফোন নম্বরে রিং করবেন।

এর বাইরে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে রাতের বিভিন্ন প্রহরে ফাদারকে দেখতে গেলেন। তাকে গরম হারবাল চা পান করালেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিলেন কিছুক্ষণ ঘুমানোর। পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই তিনি পাদ্রীর রুমে ছুটে গেলেন। ফাদার পেনেলাক্স তখন স্থির হয়ে বিছানার ওপরে শুয়েছিলেন। তার মুখে গতদিনের রক্তিম ভাব ছিল না। যদিও তা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল, তথাপি তাকে আরো আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। তিনি ছাদ থেকে ঝুলে থাকা একটা বাতির দিকে তাকালেন। বৃদ্ধা মহিলা রুমে এলে তিনি তার দিকে মুখ ফিরালেন। তাকে দেখে মহিলার মনে হলো বিগত রাতে তার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। তাকে এখন মৃত বলেই মনে হচ্ছে।

তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন যে তিনি কেমন বোধ করছেন, কিন্তু পাদ্রীর কণ্ঠের উদাসীনতা দেখে কষ্ট পেলেন। পাদ্রী তাকে কঠিনভাবে বললেন যে, তার কোনো ডাক্তারের দরকার নেই। তিনি যা চান তা হলো তাকে যেন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় কর্তৃপক্ষের নিয়ম রক্ষার্থে। আতঙ্কিত হয়ে মহিলা তখন টেলিফোনের কাছে ছুটে গেলেন।

দুপুরে রিও এলো। বৃদ্ধা মহিলার কথা শোনার পর বলল যে পেনেলাক্স ঠিকই বলেছেন। কিন্তু স্থানান্তর করাটা আসলেই দেরি হয়ে গেছে। ফাদার পেনেলাক্স রিওকে স্বাগত জানালেন। আগের মতো। রিও পরীক্ষা করে ফুসফুসের জমাটবাঁধা ছাড়া তার শরীরে বিউবোনিক প্লেগের আর কোনো লক্ষণ খুঁজে না পেয়ে অবাক হল। কিন্তু দেখতে পেল যে, এরই মধ্যেই  তার নাড়ির কম্পন এতোটাই কমে গেছে। এখন তাকে বাঁচানো খুবই কঠিন হবে। 

“ফাদার, তোমার শরীরে রোগের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণই নেই,” রিও তাকে বলল। “কিন্তু আমরা যেহেতু নিশ্চিত হতে পারছি না, সেহেতু তোমাকে আমাদের আলাদা করতে হবে।”

ফাদার অদ্ভুতভাবে হাসলেন। কিছুই বললেন না। রিও রুম ছেড়ে টেলিফোনের কাছে গেল। একটু পরে ফিরে এসে পাদ্রীর মুখের দিকে তাকাল। “আমি তোমার সাথে থাকব,” সে ভদ্রভাবে বলল।  

পেনেলাক্স কিছুটা সজীবতা প্রদর্শন করলেন। তার চোখে একধরনের উষ্ণতা ফিরে এলো। তিনি ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে খুব কষ্টের সঙ্গে বললেন: “ধন্যবাদ। তবে পাদ্রীদের কোনো বন্ধু থাকতে নেই। তারা তাদের সবকিছুই ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করেছে।” তারপর বিছানার মাথার ওপরে ঝুলিয়ে রাখা ক্রুশটিকে দিতে বললেন। সেটি তার হাতে দিতেই তিনি মাথা ঘুরিয়ে সেটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

হাসপাতলে আসার পর পেনেলাক্স একটা কথাও বললেন না। উদাসীনভাবে প্রদত্ত চিকিৎসার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলেন। তবে ক্রুশটিকে কখনোই হাতছাড়া করলেন না। যাই হোক, তার রোগের বিষয়টি সন্দেহজনকই রয়ে গেল। রিও নিশ্চিতভাবে সেটিকে নির্ণয় করতে পারল না। তার শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেল। সারাদিনে তার কাশি বেড়ে গেল। তার কাহিল হয়ে যাওয়া শরীর আরো কাহিল হয়ে গেল। অবশেষে রাতের শুরুতে তার গলার জমাটবাঁধা বস্তুটি বের হয়ে এলো, যা তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসকে বন্ধ করে দিচ্ছিল। সেটি ছিল লাল রঙের। প্রচণ্ড জ্বরের ভেতরেও পেনেলাক্সের চোখগুলো নির্মলতা বহন করছিল। পরেরদিন সকালে পেনেলাক্সকে মৃত হিসেবে পাওয়া গেল। তার শরীর বিছানার প্রান্তের দিকে ঝুঁকে ছিল। আর কোনো অসামঞ্জস্যতাই সেখানে ছিল না। তার ইনডেক্স কার্ডের ওপরে লেখা ছিল: “সন্দেহজনক  কেইস”। 

পূর্ববর্তী পর্বের লিংক পেতে এখানে ক্লিক করুন।     

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!